Home » বিশেষ নিবন্ধ » বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(প্রথম পর্ব)

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(প্রথম পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষনের প্রয়োজন নেই আহমদ  ছফা’র । তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই । তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির  বক্তা  অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, কবি ও লেখক আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বক্তৃতামালায় বক্তৃতা করার জন্য আমাকে যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সেজন্য আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। এর আয়োজকদের প্রতি প্রকাশ করছি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। এই স্মারক বক্তৃতামালার সঙ্গে যাঁর নাম জড়িত রয়েছে তিনি একজন মহৎ ব্যক্তি। কি চিন্তায়, কি লেখায় তিনি অত্যন্ত বড় মাপের মানুষ। উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী রচনা-বৈচিত্রে ভরপুর তাঁর রচনাসম্ভার। ফাউস্টের প্রথম খন্ডের যে অনুবাদ তিনি করেছেন আমার বিবেচনায় তা বাংলা ভাষায় অনূদিত (আমার পড়া ও জানামতে) অন্যান্য রচনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সঙ্গে যে ভূমিকাটি লিখেছেন তা অসাধারণ পান্ডিত্যপূর্ণ ও সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। তিনি ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ নামে যে অসাধারণ রচনাটি নির্মাণ করেছেন তা বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয়। আমি জানি না বিশ্বসাহিত্যে এরকম রচনা আছে কিনা, কারণ বিশ্বসাহিত্যের সব তো আমার পড়া নেই।

একথা বলতে আমায় ভালো লাগছে এবং গর্ববোধ হচ্ছে যে তাঁর জীবনকালে তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেটা স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে। তিনি প্রায়শ নতুন কিছু লিখলে আমাকে জানাতেন, কখনও কখনও কোন কবিতা বা গদ্যলেখা পড়ে শোনাতেন। এসব কথা স্মরণ করে আমি সত্যিই আনন্দ ও গর্ববোধ করছি। আজকের বক্তৃতার শুরুতেই এই অসামান্য পুরুষের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

আহমদ ছফার গোটা সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করার যোগ্যতা আমার নাই। তিনি বিভিন্ন রচনার মধ্য দিয়ে যে সামাজিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তার তাৎপর্য বিশাল। কিন্তু এক বক্তৃতায় তাঁর সামগ্রিক চিন্তা নিয়ে আলোচনাও সম্ভব নয়। আমি আমার আজকের আলোচনার সূত্রপাত করার প্রয়োজনে তাঁর একটি মাত্র প্রবন্ধ বেছে নিচ্ছি। আজকের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় একটি বিষয় নিয়েই আমি বক্তব্য রাখব বলে ভেবে এসেছি। আমাদের দেশে হঠাৎ করে যে ধর্মীয় মৌলবাদ ও ইসলামী জঙ্গীবাদ বা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তার উৎস সন্ধানে কয়েকটি কথা বলার চেষ্টা করব। এর উৎসের দুইটি দিক আছে-একটি আন্তর্জাতিক, অন্যটি জাতীয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমার আজকের বক্তৃতায় আমি সেই দিকটি আনছি না। কারণ তাহলে আলোচনা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়বে। মৌলবাদের অভ্যন্তরীণ উৎস কোথায় এবং আদৌ কোন উৎস আছে কিনা সেই আলোচনার মধ্যেই আমার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখব। সেই প্রসঙ্গেই আমি শুরু করতে চাই আহমদ ছফার ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ শীর্ষক এক অসাধারণ রচনা সামনে রেখে। (আহমদ ছফা, বাঙালী মুসলমানের মন (ঢাকা: খান ব্রাদার্স)।

অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের এক রচনা থেকে জানতে পারলাম যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বিংশ শতাব্দীর বাংলা ভাষায় লেখা শ্রেষ্ঠ দশটি চিন্তার বইয়ের মধ্যে আহমদ ছফার ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ পুস্তিকাটির নাম উল্লেখ করেছেন। সলিমুল্লাহ খান লিখেছেন, ‘জনধন্য বাংলা মুলুকে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে দ্বিমত করার মানুষ কখনো টান পড়বে বলে মনে হয় না। … এই মহান অধ্যাপকের সঙ্গে একমত পোষণ করি।’ (সলিমুল্লাহ খান, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী)।

আমিও এই রচনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা বলে মনে করি। লেখক বাঙ্গালি মুসলমানের সামাজিক বিকাশ ও তার দুর্বলতার দিক তুলে ধরেছেন। কিন্তু প্রথমেই বলে রাখি, এই রচনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য মেনে নিয়েও ছফার সকল বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। তিনি একটা দিক তুলে ধরেছেন এবং তা যথার্থ। আজকে আমাদের সমাজে যে ধর্মীয় মৌলবাদের উৎপাত এবং ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সৃষ্টি-তা সংখ্যায় যত সামান্যই হোক-তার কারণ অনুসন্ধান করতে হলে ছফার রচনা নিশ্চিতভাবে প্রাসঙ্গিক, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আমার বিবেচনায় আহমদ ছফার বিশ্লেষণ বেশ একপেশে।

তিনি যথার্থই বলেছেন, বাঙ্গালি মুসলমান তারাই যাদের পূর্বপুরুষ নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। লক্ষণ সেনের সময় কিভাবে দলে দলে নিম্নবর্ণের হিন্দু (যারা আবার শ্রমজীবী এবং গরিবও বটে) মুসলমান হল তার এক অনবদ্য চিত্র অঙ্কন করেছেন শওকত আলী, তাঁর বিখ্যাত ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে। ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা বাঙ্গালি মুসলমানের মনকে কতটা আচ্ছন্ন করতে  পারে-অথবা পারে না, তা বুঝতে হলে এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা দরকার। আহমদ ছফা আরও যথার্থ বলেছেন, ‘মূলত বাঙ্গালি মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি মানবগোষ্ঠী। এই অঞ্চলে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হল, এদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। … একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার মৃত্তিকার সাক্ষাৎ সন্তানদের এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল।’ (আহমদ ছফা, ঐ।)

তিনি যে বাঙ্গালি মুসলমানের মধ্যে উচ্চশ্রেণী ও নিম্নশ্রেণী দুইটি সুস্পষ্ট বিভাজন দেখতে পেয়েছেন সেটাও সত্য। আমিও মনে করি তথাকথিত অভিজাত বাঙ্গালি মুসলমান এবং কৃষক বা শ্রমজীবী বাঙ্গালি মুসলমানকে আলাদাভাবে বিচার করতে হবে। আমি আজকের আলোচনায় দেখানোর চেষ্টা করব, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক বা শ্রমজীবী মুসলমান, যাদের পূর্বপুরুষ ধর্মান্তরিত হয়েছিল, তাদের মানসিক গড়ন অসাম্প্রদায়িক, উদারপন্থী ও মানবিক। তাদের সাধারণত ‘আতরাফ’ বলা হয়। অন্যদিকে ‘আশরাফ’ বলে পরিচিত তথাকথিত অভিজাত মুসলমানদের মধ্যেই প্রতিক্রিয়াশীলতার চিহ্ন অধিক পরিমাণে লক্ষণীয়। আশরাফরা মোগল আমলে ছিল শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তারা উচ্চবিত্ত এবং সম্ভ্রান্ত বলে পরিচিত। তারা একদা আরব, তুরস্ক, ইরান, মধ্য এশিয়া থেকে এদেশে এসেছিল। তবে পশ্চিম থেকে আসা সুফি মতবাদী ধর্ম-প্রচারকরা চরিত্রগতভাবে ভিন্ন ছিলেন। আশরাফ বলে পরিচিত তথাকথিত সম্ভ্রান্ত মুসলমানরা এক সময় ঘরে ফার্সি বলতেন। পরবর্তীতে বৃটিশ আমলে বলতেন উর্দু।

আশরাফ-আতরাফ বিভাজনটি বেশ পুরানো। তা মোগল আমল থেকে চলে আসছে। মুকুন্দরামের ‘কবিকঙ্কনচন্ডী’ মঙ্গলকাব্যে বিবৃত নগরবাসী বহিরাগত মুসলমান ও গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ধর্মান্তরিত মুসলমানের মাধ্যমে ব্যাপক আর্থিক ও সামাজিক পার্থক্যটির নিপুণ বর্ণনা পাওয়া যায়। আবার ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী নবাব আবদুল লতিফের মতো যাঁরা সাধারণ পরিবার থেকে এসেও অভিজাত শ্রেণীতে উত্তরণের আকাঙ্খা পোষণ করতেন তাঁরাও বাংলাভাষাকে তাচ্ছিল্য করেছেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেও উর্দুকে আভিজাত্যের লক্ষণ মনে করা হত। সেই আভিজাত্যের গর্ব ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল যারা তারা কিন্তু মুসলমান কৃষক এবং সদ্যগঠিত মুসলমান মধ্যবিত্ত। তারাই ভাষা আন্দোলন করেছিলেন (ছাত্ররা ছিলেন কৃষকের সন্তান), একথা ভুললে চলবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবনে গোলাম সামাদ ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধটির সমালোচনা করেছেন সম্পূর্ণ ভুল জায়গা থেকে। তিনি মনে করেছেন, বাঙ্গালি মুসলমানকে নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে আসা বললে বুঝি ছোট করা হল।          (এবনে গোলাম সামাদ, ‘বাঙালী মুসলমানের মন’, সমকাল, ১৮ বর্ষ ৪ সংখ্যা, (বৈশাখ ১৩৮৩), পুনর্মুদ্রণ: আহমদ ছফা বিদ্যালয়, ১ বর্ষ ২ সংখ্যা (অক্টোবর-নবেম্বর ২০১৪)। তাই তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আসলে নিম্নবর্ণ বা শ্রমজীবী হওয়ার মধ্যে সামান্যতম অসম্মানের কিছুই নেই। যাই হোক এই প্রসঙ্গ আপাতত বাদ। তবে আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে আহমদ ছফার একপেশে বিশ্লেষণের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘শুরু থেকেই বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে কোনভাবে সম্পর্কিত ছিল না বলেই তার মনের ধরণ-ধারণটি অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মতো থেকে গেছে। মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাই তার জাগতিক অগ্রগতির উৎস। বাঙ্গালি মুসলমান চিন্তাই করতে শেখেনি। তার কারণ, এখনো সে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করার অধিকার পায়নি।’ (‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’, উত্তর ভূমিকা, পৃ. ১৬।) যদি চিন্তাই না করতে পারে তাহলে ভাষা আন্দোলন করল কিভাবে? আহমদ ছফা নিজেই লিখেছেন, ‘বাঙ্গালি মুসলমানের উল্লেখ করার মতো কোন কীর্তি ছিল না। কিন্তু বাঙ্গালি মুসলমান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি বাঙ্গালি জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। এটাই তার সবচেয়ে বড় কীর্তি।’ (ঐ, পৃ. ১৬।) কথাটা কি স্ববিরোধী হয়ে গেল না?

ইউরোপের ইতিহাসে বুর্জোয়া বিপ্লবের আগেই যে সকল অতি বড়মাপের লেখক, শিল্পী, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবীর সাক্ষাৎ আমরা পাই তাঁদের অধিকাংশই ব্যক্তি হিশাবে ও শ্রেণী হিশাবে-উভয় দিক দিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করেছে নিপীড়িত শ্রেণী-শ্রমিক শ্রেণী। তাদের দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতাদের অধিকাংশ এসেছিলেন বুদ্ধিজীবী শ্রেণী থেকে, কিন্তু তাঁরাও রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিলেন। অতএব ক্ষমতার আবহাওয়ার মধ্যে না থাকলে চিন্তার জন্ম হয় না বা প্রসার ঘটে না, এমন সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়। অধিকাংশ বাঙ্গালি মুসলমান, যারা শ্রমজীবী ও নিপীড়িত, তারা চিন্তা করতে পারেন না, তারা ইতিহাস রচনা করতে পারেন না, এমন ধারণাও সঠিক নয়। ইতিহাসও সে কথা বলে না। (চলবে)