Home » শিল্প-সংস্কৃতি » যুদ্ধের নামে অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে : চলচ্চিত্র ‘ওয়ার ডগস্’

যুদ্ধের নামে অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে : চলচ্চিত্র ‘ওয়ার ডগস্’

ফ্লোরা সরকার ::

‘উলফ অফ দ্য ওয়ালস্ট্রিট’ যেমন পুঁজিবাদ বিরোধী ছবি, ‘ওয়ার ডগস্’ তেমনি যুদ্ধ বিরোধী এক ছবি।  টড ফিলিপ পরিচালিত সাম্প্রতিক ছবি, ‘ওয়ার ডগস্’ মুক্তি পেতে না পেতেই আলোচনার টেবিলে চলে এসেছে। টড ফিলিপ ১৯৯৩ সালে, যখন তার বয়স মাত্র ২২ এবং তখনও যিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে সিনেমার ছাত্র হিসেবে অধ্যয়নরত, সেই সময়ে পাঙ্ক সিঙ্গার নামে খ্যাত জিজি অ্যালিনকে নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে  সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। নির্মাণ করেছেন ‘ওল্ড স্কুল’, ‘স্টারস্কি অ্যান্ড হাচ’ এর মতো কমেডি এবং ইতোমধ্যেই কমেডি নির্মাতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই তার কোনো ছবি এখন মুক্তি পেলে দর্শক বেশ আগ্রহ সহকারেই তার ছবি দেখতে যান। তার উপর ‘ওয়ার ডগস্’ নির্মিত হয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে বুশ প্রশাসনের কাছে  দুজন অস্ত্র সরবরহকারীর কর্মকান্ডকে ঘিরে।  ছবির দুই প্রধান চরিত্রের (ইফরাইম ডিভরোলি ও ডেভিড পাকোজ) বাস্তব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয়েছে ছবিটি। যারা ২০০৭ এ এই অস্ত্র বিক্রি বাবদ তারা ৩০০ কোটি ডলার উপার্জন করে। যাদেরকে পেন্টাগন খুব কৌশলে নিয়োজিত করেছিলো।

ছবির এক ধারাভাষ্যে জানানো হয় যে, যুদ্ধ একটি বেশ বড় ধরণের লাভজনক ব্যবসা। ছবির হিসেব অনুযায়ী আমেরিকায় একেক জন সেনা নিয়োগে খরচ পড়ে ১৭,৫০০ ডলার এবং ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে কম করে হলেও দুই লাখ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিলো। গ্রীষ্মপ্রধান সেসব দেশের সেনাবাহিনীকে এয়াকন্ডিশনার সরবরাহ করতে হয়েছে তার জন্যেই প্রতি বছর আমেরিকাসহ যুদ্ধে লিপ্ত সরকারগুলোর খরচ করেছে সাড়ে ৪শ কোটি ডলার। ছবির ভিডিও ফুটেজে বুশ প্রশাসনের নানা কর্মতৎপরতা দেখানো হয় এবং কর্মরত একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধ হচ্ছে একটা অর্থনীতি। যারা এর ভিন্ন কিছু বলে, তারা বড় ধরণের একটা স্টুপিড’।

দুটো চরিত্র ইফরাইম এবং ডেভিডকে নিয়ে ছবির গতি এগিয়ে যায়। অস্ত্র ব্যবসার মধ্যে দিয়ে তাদের দিন বেশ এগিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু এর মাঝে বাঁধ সাজে ডেভিডের অন্তঃসত্তা বান্ধবী লিজকে নিয়ে। কারণ লিজ খুব কড়াভাবেই ইরাক যুদ্ধবিরোধী একজন নারী। ফলে ডেভিডকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয় লিজের কাছে। সে জানায় কিছু চাদর বিক্রির কনট্রাক্ট নিয়েছে সে, সরকারের সঙ্গে। যদিও ছবির নায়ক ডেভিডকে, ছবির শুরুতেই দেখা যায়, সে-ও একজন যুদ্ধবিরোধী মানুষ, কিন্তু তাকে অস্ত্র বানিজ্যে জড়িয়ে পরিচালক যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, ডেভিড মূলত যুদ্ধ বিরোধী হলেও, অর্থ বিরোধী নয়। আসলে, ছবিটি ২০০৭-২০০৮ সালের দিকে, বুশ প্রশাসনের সেই সময়কে নির্দেশ করে- যে সময়ে, ইরাক-আফগানিস্তানে যুদ্ধের সুযোগে অনেকে ভূঁইফোড় ধনী হবার চেষ্টায় অস্ত্র ব্যবসায় নিজেদের নিয়োজিত করেছিলো।

স্যাটায়ার ধারায় নির্মিত হলেও, ছবির পরিচালক অনেক সত্য প্রকাশ করে দেন ছবির গল্পের মধ্যে দিয়ে। আরো একটা বিষয় হলো, ছবিতে ইফরাইম আর ডেভিড, অস্ত্র ব্যবসার মাধ্যমে শুধু যে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলে তা নয়, দুজন ট্যাক্সও ফাঁকি দিয়ে চলে। বিশেষ করে, ডেভিড তার বান্ধবীকে খুশি রাখার জন্য যতটা বিলাসী হওয়া যায় তার জন্যে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে চলে। যাইহোক ছবিতে, যত বিনোদনের মাধ্যমেই তাদের কাহিনী দেখানো হোক না কেনো, বাস্তবে, ট্যাক্স ফাঁকিসহ নানা কারণে ইফরাইমের চার বছরের জেল হয় এবং ডেভিডকে সাত মাসের জন্য গৃহবন্দী হতে হয়। ছবিতে সেসব দেখানোর প্রয়োজন পড়েনি। কারণ, পরিচালক টড ফিলিপের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, যুদ্ধের প্রকৃত কারণটা দেখানো। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর, ‘যুদ্ধ’ নামক বিষয়টি নতুন ভাবে আবির্ভূত হয়েছে। এসব যুদ্ধ এখন, শুধু যুদ্ধের জন্য যুদ্ধ হিসেবে সংগঠিত হচ্ছেনা, এসব যুদ্ধের পেছনে ‘অস্ত্র বানিজ্য’ নামে ভয়ানক এক বানিজ্যের খেলা শুরু হয়েছে। যে বানিজ্য পুঁজিবাদের অগ্রগামী ভয়ংকর এক অধ্যায়।