Home » বিশেষ নিবন্ধ » বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(দ্বিতীয় পর্ব)

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(দ্বিতীয় পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষনের প্রয়োজন নেই আহমদ  ছফা’র । তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই । তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির  বক্তা  অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

দার্শনিক হেগেল ভারতবর্ষ সম্পর্কে বলেছিলেন যে ভারতবর্ষের কোন ইতিহাস নেই। একথা দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন যে, সমাজ নিশ্চল ছিল, সময়ের সঙ্গে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ‘এশীয় স্বৈরতন্ত্র’ সম্পর্কিত মার্কসের বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝতে না পারার কারণে অনেক ভারতীয় মার্কসবাদীও অনেকটা হেগেলের মতই অনুধাবনযোগ্য মনে করতেন। ভারতের বিখ্যাত মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ, গণিতজ্ঞ ও পন্ডিত দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী এই মতের কড়া সমালোচনা করে দেখিয়েছেন যে ভারতের সমাজের মধ্যেও তীব্র শ্রেণীসংগ্রাম ছিল। হয়তো তা ইউরোপের মতো নয়। কিন্তু সমাজ একেবারে নিশ্চল, অপরিবর্তনীয় ছিল এমনটা মনে করা হবে খুবই বড়  ভুল ও অনৈতিহাসিক। ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়ার ভূমিকা’ (An Introduction to the Study of Indian History) গ্রন্থটির একেবারে প্রথম প্যারাতেই কোসাম্বী এই রকম ভুল ধারণা খন্ডন করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষের বৃত্তান্তে কিছু ঘটনা পরস্পর আছে, কোন ইতিহাস নেই’ (India has some episodes but no history)-এই সিদ্ধান্তকে কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। গোটা বইয়ে অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, কিভাবে শ্রমজীবী মানুষ শ্রেণীসংগ্রাম করেছে এবং ইতিহাস নির্মাণ করেছে। শুধু ইউরোপেই না, ভারতবর্ষেও। (D. D. Kosambi, An Introduction to the Study of Indian History (Bombay: Popular Prakashan, 1956).

আমরা দেখছি, আর্যদের দখলে চলে যাবার পর এই ভূখন্ডের আদিবাসী অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষেরা বর্ণাশ্রমের শিকার হতে বাধ্য হয়েছিল। সেটি ছিল বিরাট ঐতিহাসিক পরাজয়। আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথাই এ দেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিতম উৎস।’          (ঐ, পৃষ্ঠা ৩৪।) এর সঙ্গে দ্বিমত করার কিছুই নাই। হিন্দু সমাজে এখনও জাতপাত প্রথা বিষফোড়ার মতো টিকে আছে। সেই প্রসঙ্গ নিয়ে আমরা এখন আলোচনা করছি না। আমাদের আলোচ্য বিষয় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং বর্তমানের ইসলামী মৌলবাদী জঙ্গিবাদ। আহমদ ছফা আবার একই সঙ্গে লিখেছেন, ‘বাংলার আদিম কৌম সমাজের মানুষেরা সর্বপ্রকারে যে ঐ বিদেশী উন্নত শক্তিকে বাধা দিয়েছিলেন-ছড়াতে, খেলার বোলে তার অজস্র প্রকাশ ছড়ানো আছে। এই অঞ্চলের মানুষদের বাগে আনতে অহংপুষ্ট আর্যশক্তিকেও যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। (ঐ পৃষ্ঠা ৩৩) আহমদ ছফার এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনচেতা ও সংগ্রামী। সেই ঐতিহ্য পরবর্তীতেও আমাদের পূর্বপুরুষরা বহন করে এসেছেন বংশানুক্রমিকভাবে। বৌদ্ধধর্ম ছিল আর্যশাসনের বিরুদ্ধে অর্থাৎ শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিত জনগণের প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের একটি রূপ। প্রাচীন যুগে রাজনৈতিক দল ছিল না। তখন বিদ্রোহ অনেক ক্ষেত্রে ধর্মের আবরণে আত্মপ্রকাশ করত। তা পশ্চিম এশিয়ায় যেমন খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বাংলায় পাল রাজবংশের উৎপত্তি ছিল জনগণের বিদ্রোহের ফলস্বরূপ। পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল ছিলেন জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত। পাল রাজারা বৌদ্ধ হলেও জনদরদী শাসক ছিলেন, এমনটা মনে করা সঠিক নয়। সেই প্রাচীন বা মধ্যযুগে রাজাবাদশা শাসক মাত্রই ছিলেন নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী। পাল রাজাদের বিরুদ্ধে কৈবর্ত বিদ্রোহ আরেকবার প্রমাণ করে যে এই জনপদের সাধারণ শ্রমজীবী ও কৃষকরা ছিলেন সংগ্রামী মনোভাবাপন্ন। মার্কসবাদী রাজনীতিবিদ লেখক সত্যেন সেনের একটি উপন্যাস আছে কৈবর্ত বিদ্রোহ ভিত্তি করে। উপন্যাসের নামও ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’। (সত্যেন সেন, বিদ্রোহী কৈবর্ত) কৈবর্ত রাজারা (দিব্যক, রুদ্রক, ভীম) গৌড়ে কয়েক বছর রাজত্ব করেন। পরে পালরা মগধ থেকে এসে আবার গৌড় দখল করেছিলেন। ১১২০ সালে কর্ণাটক থেকে আসা সেনরা বাংলা দখল করেন এবং তাঁরা ব্রাহ্মণ্যধর্ম পুনপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। জাতিভেদ প্রথা আবার চাপিয়ে দেয়া হল এবং বৌদ্ধদের নিশ্চিহ্ন করার ব্যবস্থা করা হল। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এবং বুদ্ধের বাণী যারা প্রচার করতেন তাঁরা আত্মগোপনে গেলেন। তাঁরা কিভাবে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ একটিভিটি চালাতেন, তার একটি বিবরণ পাওয়া যায় শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে। ঠিক একইভাবে ইতিহাসের একটি পর্বে রোমান সাম্প্রাজ্যও খ্রিস্টধর্মের প্রচারকগণ আত্মগোপনে থেকে ধর্মমত প্রচার করতেন। এইসব ছিল শ্রেণী সংগ্রামের এক একটি রূপ। রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতায় দেখা যায়, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু রাজারা কিভাবে বৌদ্ধ প্রচারক ও বুদ্ধভক্তদের হত্যা করত।

‘অজাতশত্রু করেছে রচনা

স্তুপে যে করিবে অর্ঘ্যরচনা

শূলের উপরে মরিবে সে জনা অথবা নির্বাসনে।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘পূজারিনি’-কথা কাব্যগ্রন্থ, সঞ্চয়িতায় সংকলিত)

এটি উত্তর ভারতের ক্ষেত্রেও যেমন, তেমনি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সত্য ছিল।

আহমদ ছফা বলেছেন, ‘বাঙ্গালি মুসলমান শুরু থেকেই তাদের আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দুর্দশার হাত থেকে আত্মরক্ষার তাগিদে ক্রমাগত ধর্ম পরিবর্তন করে আসছিল।’ (ঐ পৃষ্ঠা ৩৪) কিন্তু আমরা ধর্মান্তরিত হবার ব্যাপারটিকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করতে পারি। এই জনগোষ্ঠী একবার বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিল, পরবর্তীতে মুসলমান হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজ শাসনামলে তো তারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেনি। বরং ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সংগ্রামী মনোভাব দেখিয়ে আসছে। বাংলার সাধারণ মানুষ যে দলে দলে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিল তা তাদের প্রতিবাদী মনেরই পরিচয় বহন করে। সেন রাজাদের নিষ্ঠুর দমনের কারণে প্রকাশ্যে বৌদ্ধধর্ম অবলুপ্ত হল। আর ঠিক সেই সময়ই এল ইসলাম ধর্ম ও বিজয়ী মুসলমান শাসকরা। এমনই পরিস্থিতিতে বাংলার নিম্নবর্ণের শ্রমজীবী মানুষের বিরাট অংশ দলে দলে মুসলমান হয়ে গেল। একদিকে হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথা, অন্যদিকে ইসলাম ধর্মের তুলনামূলক উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও কিছুটা সামাজিক সাম্যের আদর্শ (এই সাম্য অর্থনৈতিক সাম্য নয়) এই মানুষদের আকৃষ্ট করেছিল। এই সকল ঘটনা প্রমাণ করে যে বাংলার মানুষ নতুন আদর্শকে, তুলনামূলক প্রগতিশীল আদর্শকে সহজেই গ্রহণ করতে পারে অর্থাৎ তারা চরিত্রগতভাবে রক্ষণশীল নয়। এই জনপদের মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা নেই, এমন অপবাদ মেনে নেয়া যায় না।

ঐতিহাসিক সুজিত আচার্য বলেছেন, ইসলাম ধর্ম এই দেশে তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ইসলাম তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত হলে, উত্তর ভারতে মুসলিম শাসনের রাজধানী দিল্লি আগ্রার আশেপাশের অঞ্চলের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগুরু হত না। (সুজিত আচার্য, বাংলায় ইসলাম ধর্মের আদিপর্ব) তবে একথা সত্য যে মুসলমানদের হাতে রাজদন্ড থাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচার সহজ হয়েছিল। বাংলায় যারা ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন তারা ছিলেন সুফি মতবাদের অনুসারী, মানবতাবাদী ও উদারপন্থী। কট্টর মৌলবাদী ও শরিয়তপন্থীদের থেকে সুফি সাধকদের জীবনদর্শন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুফি ধর্ম-প্রচারকদের জীবন-প্রণালীও এই দেশের নিম্নবর্ণের খেটেখাওয়া মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। তাই আশরাফদের তুলনায় আতরাফ বা নিচু জাতের মুসলমান, যারা আবার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা ছিলেন বরাবরই অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী। ধর্মীয় গোঁড়ামি তাদের কখনও স্পর্শ করেনি।

আমাদের এই জনপদে বহু প্রাচীনকালেই বেদবিরোধী একটি লোকায়ত দর্শন ছিল। বাংলায় বৌদ্ধধর্মের যে সংস্করণটি জনপ্রিয় হয়েছিল তা সহজিয়া ধর্ম নামে পরিচিত। সহজিয়া ধর্মের মধ্যে মানবিক দিক অনেক বেশি ছিল। সহজিয়া ধর্মের সাহিত্যে বৈদিক ধর্ম, পৌরাণিক পূজাপদ্ধতি, এমনকি বৌদ্ধধর্মের অনেক আচার-নিষ্ঠাকে কটাক্ষ করা হয়েছিল। ‘সহজিয়া’ মতবাদ কেবল বৌদ্ধধর্মের ব্যাপার ছিল না। ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগেই হিন্দু সমাজের এক বড় অংশের মধ্যে তার প্রভাব ছিল। ইসলাম ধর্মপ্রচারকদের সুফি মতবাদের সঙ্গে সহজিয়া মতবাদের অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিল মধ্যযুগের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা। তাই তারা খুব সহজে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

সহজিয়া ঐতিহ্যের দুইটি ধারা-সগুণ ও নির্গুণ। মধ্যযুগে জন্মগ্রহণকারী (১৪৮৬ সালে) শ্রীচৈতন্য নিজে ব্রাহ্মণ হলেও জাতিভেদ প্রথার বিরোধী ছিলেন এবং মানবতাবাদী ছিলেন। তাঁর অনেক মুসলমান শিষ্যও ছিল। বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্য এবং কবি চন্ডীদাস ছিলেন সগুণ ধারার শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা। (চন্ডীদাস-‘সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’) অন্যদিকে নির্গুণ পথের পথিক বাউল সাধকরা ছিলেন অধিকতর মানবিক এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের পক্ষে। মধ্যযুগে বাংলাদেশে এবং উত্তর ভারতে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও গরিব মুসলমানদের মধ্যে অনেক প্রতিভাবান কবি ও সমাজ সংস্কারকের উদ্ভব ঘটেছিল যাঁরা ছিলেন প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের পক্ষে। তাঁরা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবতাবাদী। তাঁদের অনেকেই ছিলেন গরিব ও শ্রমজীবী-যথা কবীর (মুসলমান ও তাঁতি), শোন (নাপিত), রামদাস (মুচি), ধন (শূদ্র) প্রমুখ।

মধ্যযুগে বাংলায় পাচালি, যাত্রা, সঙ্গীত প্রভৃতি রচনা ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বেশ সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। কোন কোন রচনায় ধর্মের আবরণ বা রাজরাজড়ার কাহিনী থাকলেও (শেক্সপিয়ারের নাটকেও রাজারাজড়া ও ভূতপ্রেতের কাহিনী আছে) তা মানবতাবাদী গুণেও সমৃদ্ধ ছিল। এই যে জনপ্রিয় সাহিত্য গড়ে উঠেছিল তা অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতেও সাহায্য করেছিল। যে মানুষ এমন সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারে, তাদের ছোট করে দেখা হবে অনৈতিহাসিক।

সগুণ ধারার তুলনায় নির্গুণ সহজিয়া ধারার প্রবক্তাগণ অর্থাৎ বাউলরা ইসলাম ধর্মের সুফি মতবাদের প্রতি অধিক সহিষ্ণু ছিলেন। অন্যদিকে শরিয়তপন্থী কট্টর মোল্লাতন্ত্র হিন্দুধর্মকে যেভাবে শত্রুতার মনোভাব নিয়ে দেখেছে, সুফি সাধকদের মনোভাবের সঙ্গে তার দুস্তর তফাৎ ছিল। আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলায় ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে সুফি মতবাদের সাধকদের হাত দিয়ে। তাই অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রথম থেকেই শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিরাজ করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ মিলবে বাউল সাধকদের মধ্যে (তাঁদের সঙ্গীতেও)। মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন বাউল গানের সংকলন প্রকাশ করেছিলেন ১৯২৭ সালে ‘হারামণি’ নামক গ্রন্থে। সেই সংকলনের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

আমাদের দেশে যারা নিজেদের শিক্ষিত বলেন, তারা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। … কিন্তু আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্ত মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে সেই সাধনা দেখি-এ জিনিস হিন্দু-মুসলমানের উভয়েরই, একত্র হয়েছে, অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভা-সমিতি প্রতিষ্ঠা হয়নি, এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে। কোরান-পুরাণ ঝগড়া বাধেনি। এই মিলনেই ভারতের সভ্যতার সত্য পরিচয়, বিবাদ-বিরোধে বর্বরতা। বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা স্কুল কলেজের অগোচরে আপনা-আপনি কি রকম কাজ করে এসেছে, হিন্দু ও মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তার পরিচয় পাওয়া যায়। (মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন, হারামনি)এই জনপদের গরিব শ্রমজীবী, যারা ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং যাদের অধিকাংশ ইতিহাসের এক কালপর্বে দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তারা ঐতিহ্যগতভাবে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক। এইটুকু বললেই যথেষ্ট বলা হল না। তারা ইতিহাসে সক্রিয় ভূমিকাও পালন করেছেন, সমৃদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতি যেমন নির্মাণ করেছেন, তেমনি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগে এবং পরে। কৈবর্ত বিদ্রোহের কথা একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেটা ছিল এদেশে ইসলামের অভ্যুদয়ের আগের ঘটনা। কিন্তু পরেও আমরা হিন্দু মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম দেখব, মিলিত সাহিত্য-সংস্কৃতি নির্মাণও দেখব।

মধ্যযুগে যে সকল বাঙ্গালি কবির সাক্ষাৎ আমরা পাই তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুকুন্দরাম, দৌলত কাজী, আলাউল, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ প্রমুখ। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন তাঁদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মেরই কবিরা ছিলেন। তাঁরা ছিলেন গরিব। তাঁদের কবিতায় শোষিত মানুষের ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। তবে পরবর্তীতে উনবিংশ-বিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য মুসলমানের অবদান হিন্দুর তুলনায় কম হল কেন? এই প্রশ্নটি আহমদ ছফা উত্থাপন করেছেন। সেই প্রসঙ্গে আমরা একটু পরেই আসছি।

আমরা আরও দেখব নিম্নবর্ণের হিন্দু ও ধর্মান্তরিত মুসলমান অর্থাৎ গরিব শ্রমজীবী মানুষ অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বারবার সংগ্রাম করেছে, বিদ্রোহ করেছে। দুই একটি উদাহরণ দেয়া থাক। সুলতান আলাউদ্দিনের রাজত্বকালে স্থানীয় কোতোয়ালের অত্যাচারের বিরুদ্ধে হাজি মোল্লা নামক জনৈক কোষাগার রক্ষীর নেতৃত্বে স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান জনগণ বিদ্রোহ করেছিল। যশোরের জমিদার কেদার রায়ের রাজত্বকালে নোওয়াপাড়ার কৃষক জনগণ বিদ্রোহ করেছিল। দেখা যাবে, অত্যাচারী শাসক ও জমিদারদের মধ্যে যেমন হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের লোক ছিল তেমনি বিদ্রোহী জনগণের মধ্যেও দুই ধর্মেরই মানুষ ছিল।

আসা যাক ব্রিটিশ যুগে। ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তিতুমীরের ওয়াহাবি আন্দোলন ও দুদুমিয়ার নেতৃত্বাধীন ফরায়েজি আন্দোলন ছাড়া অন্য কোন গণ আন্দোলনে বাঙ্গালি মুসলমানের অংশগ্রহণ দেখতে পেলেন না আহমদ ছফা। (ঐ পৃ. ৩৬) কিন্তু ইংরেজ শাসকের ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশে যে অসংখ্য সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল, তাতে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বী বিদ্রোহীরা ছিলেন। ফকির সন্যাসী বিদ্রোহ কৃষক বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৮৫৭) ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলিত যুদ্ধ। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যে নীলবিদ্রোহ ও প্রজাবিদ্রোহ হয়েছিল, সেখানেও হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম আমরা দেখব।

তবে একথা ঠিক যে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন বিকাশ লাভ করেছিল তাতে সাধারণভাবে মুসলমানদের অংশগ্রহণ কম ছিল। সাম্প্রদায়িক বিভাজন যে স্বদেশী আন্দোলনের একটি বড় দুর্বলতা তা রবীন্দ্রনাথ ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে দেখিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনেও কয়েকজন মুসলমান বুদ্ধিজীবীর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে যাঁরা আন্দোলনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন। যেমন ব্যারিস্টার আবদুল রসুল (তিনি চরমপন্থী বলেও পরিচিত), লিয়াকত হোসেন (তিনিও চরমপন্থী বলে পরিচিত), মৌলবী আবুল কাশেম, আবদুল হালিম গজনভী প্রমুখ।

তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ (সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী) আন্দোলনে অবশ্য বাঙ্গালি মুসলমানের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। তার কারণ এই সকল গোপন দলের নেতারা মুসলমানদের দলে নিতে চাননি। তবে বিপ্লবী সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রতি যে স্থানীয় মুসলমান কৃষকদের সহানুভূতি ছিল একথা আমাকে বলছিলেন সূর্যসেনের এক কিশোর শিষ্য (পরবর্তীতে কমিউনিস্ট নেতা) প্রয়াত শরবিন্দু দস্তিদার। নেতাজী সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু-মুসলমান-শিখ সকলেই ছিলেন, অফিসার হিশাবে, সেনাপতি হিশাবে এবং সাধারণ সৈন্য হিশাবেও।

১৯৪৬ সালের ঐতিহাসিক নৌ বিদ্রোহ ছিল হিন্দু-মুসলমান নাবিকদের ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ। আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যদের বিচার শুরু করে হলে কলকাতায় রশীদ আলী দিবসকে কেন্দ্র করে যে গণ অভ্যুত্থান হয়েছিল সেখানে বাঙ্গালি হিন্দু ও বাঙ্গালি মুসলমান কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াই করেছেন। সেই লড়াই যে ভিত্তি করে মানিক বন্দোপাধ্যায় ‘চিহ্ন’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। সেখানে সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী যে চরিত্রগুলি দেখি তার মধ্যে হিন্দুও আছে, মুসলমানও আছে। ১৯৪৬ সালে যে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন গ্রাম বাংলাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল তার মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের কৃষকরা ছিল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ। তিনি নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙ্গালি মুসলিম পরিবার থেকেই এসেছিলেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির আদি গঠনপর্বে বাংলাদেশে যে সামান্য কয়জন উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে কমরেড আবদুল হালিম ও কমরেড আবদুর রাজ্জাক খানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাঙ্গালি মুসলমানের সংগ্রামী ঐতিহ্য তুলে ধরার মানে এই নয় যে, এই জনগোষ্ঠীর দুর্বলতাকে আড়াল করতে চাই। আহমদ ছফা দুর্বলতার দিকটাই তুলে ধরেছেন অত্যন্ত তীক্ষ্ম ভাষায়। সেই দিকটার প্রতি এবার আমি দৃষ্টিপাত করার চেষ্টা করব। আহমদ ছফা যথার্থই বলেছেন যে বাংলা সাহিত্যে নজরুল ও জসিম উদ্দিন-মাত্র দুইজন মুসলমান কবির নাম করা যায় যাঁরা ‘কাব্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।’ ছফা আরও লিখেছেন, ‘এই দুই কবির প্রথম পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী ছিল হিন্দুসমাজ, মুসলমান সমাজ নয়।’ (আহমদ ছফা, ঐ, পৃষ্ঠা ৩৭) সত্যি তো আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম পর্বের (এবং এখনও) দিকপাল কারা? ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম। মুসলমানের সংখ্যা এত কম কেন? আমরা এখন সেই আলোচনায় প্রবেশ করব।