Home » অর্থনীতি » কর দেয়না কোটিপতিরা : চাপে স্বল্প আয়ের মানুষ

কর দেয়না কোটিপতিরা : চাপে স্বল্প আয়ের মানুষ

সরকারি হিসাবেই দেশে সোয়া লাখ কোটিপতি

এম. জাকির হোসেন খান ::

ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ কর ভারে নিমজ্জিত মধ্যবিত্ত বা স্বল্প মানুষের আয়ের ওপর ব্যাপকমাত্রায় করারোপের কথা জানান দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ১৬ হাজার টাকা মাসিক আয় হলেই তাকে কর দিতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগ অসম কর ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং অনৈতিকভাবে উপার্জনের সুযোগ বন্ধ করার নির্দেশনার বিপরীত। উল্লেখ্য, গত জুন মাসেই ৩ লাখ টাকার বেশি আছে এমন ব্যাংক হিসাবগুলোকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০১৫ এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এমন হিসাবের সংখ্যা সংখ্যা ৩১ লাখ ৮০ হাজার যার মধ্যে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান দুই’ই আছে। সঞ্চয়ী  হিসাবের সংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি, যার অধিকাংশ নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং স্বল্প সংখ্যক উচ্চ মধ্যবিত্ত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন দাড়ায়, আসলে যারা বৈধ এবং অবৈধভাবে কোটিপতি হয়েছে তারা কি ঠিকমতো কর দেয়? এনবিআর কি তাদেরকে করের আওতায় আনতে পেরেছে বা এমন কোন উদ্যোগ কী আছে?

ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে কিংবা চাকরিজীবিদের বেতনের ওপর উৎসে করারোপের মাধ্যমে এনবিআর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করছে। অর্থ বিল ২০১২ অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ট্যাক্সপেয়ার্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) আছে এমন আমানতকারীদের থেকে ১০ শতাংশহারে উৎসে কর কেটে রাখা হয়। যাদের টিআইএন নেই তাদের মুনাফায় ১৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন হলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে জানান, গত ৭ বছরে দেশে বাংলাদেশে তফসিলি ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবধারীদের  সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৫ জন। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৭৪টি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব ছিলো, ২০১৩ সালে ৯৮ হাজার ৫৯১টি, ২০১২ সালে ৯০ হাজার ৬৫৫টি এবং ২০১১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৭৮ হাজার ১৫০টি। কিন্তু ওই সংখ্যার মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবও রয়েছে। এমনও প্রতিষ্ঠান আছে যার হিসাব সংখ্যা একশ’রও বেশি। তাই ব্যাংকের হিসাবে কত টাকা রয়েছে, তার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত কোটিপতির সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।

২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তি উদ্যোগে এক কোটি টাকার বেশি পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে, এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিলো ৩৭ হাজার ১৭৭টি এবং মোট জমার পরিমাণ ছিলো এক লাখ ৫৫ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক থেকে পাঁচ কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা ৩১ হাজার ৪২টি। পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব তিন হাজার ৬৮৭টি, ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার হিসাব আছে এক হাজার ৮৯টি। আর ৫০ কোটি টাকার ওপরে ব্যাংক ছিল ২৪৮টি। তবে বেসরকারি হিসাবে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেশি। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাত প্রায় আড়াই লাখ কোটিপতি রয়েছে বাংলাদেশে। অথচ ১৯৭৫ সালে কোটি টাকার বেশি অর্থ আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭টি।

বাস্তবে কোটিপতিদের উপার্জনের তুলনায় কর দাতার সংখ্যা রীতিমত হতাশাজনক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে ১ কোটি টাকার বেশি আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ১৭৫ জন করদাতা। ২০১৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিলো ৫ হাজারের কিছু বেশি, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ১৪৫ জন, ২০১২ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন, ২০১১ করবর্ষে সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী চূড়ান্ত হিসাবে দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে এমন করদাতার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩০৩ জন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, বাঁকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার হিসাব বা সংশ্লিষ্ট কোটিপতিরা কেন এখনো কর আওতার বাইরে? এসব কোটিপতির সম্পর্কে কোনো তথ্য কি এনবিআর এর কাছে নেই? একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন করদানে সক্ষম মানুষ প্রায় ৯৬ লাখ। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে মাত্র ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৯৪ জন করদাতা আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। এর বিপরীতে আয়কর জমা পড়ে ১ হাজার ৫৩৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। শুধু কোটিপতি নয় প্রজাতন্ত্রের বা সরকারি কাজে নিয়োজিত ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর  মধ্যে প্রায় তিন লাখ কর্মকর্তা বৈধভাবে করযোগ্য অর্থ উপার্জন করলেও আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ৬৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার। অর্থাৎ আয়কর রিটার্ন জমা দেন না ৭৫ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ব্যক্তি করদাতার সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ।

কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই এনবিআর-এর অভিযানের প্রেক্ষিতে ল্যান্ড রোভার, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কোটি কোটি টাকার গাড়ি রাস্তার পাশে আনাচে কানাচে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কোটি টাকার ওপরে (আমদানি শুল্কসহ) দাম এমন প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ি নিবন্ধিত আছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে। এর বাইরেও অনিবন্ধিত অবস্থায় আছে অন্তত ৩০০ গাড়ি। বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, ৪৯ হাজার বিলাসবহুল গাড়ির যে নিবন্ধন আছে তার মধ্যে মার্সিডিজ বেঞ্জই প্রায় ২৫ হাজার। একেকটি মার্সিডিজ বেঞ্জ ও লেক্সাস গাড়ি কিনতে খরচ পড়ে গড়ে চার কোটি টাকা, বিএমডব্লিউ ও ল্যান্ড রোভার কিনতে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে। প্রশ্ন হলো- প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ির মালিকও যদি কর দেয় তাহলে কোটিপতি করদাতার সংখ্যা মাত্র ৬ হাজারের বেশি হয় কিভাবে? শুধু তাই নয়, রিহ্যাব সূত্র অনুযায়ী, ধানমন্ডি, গুলশান এবং বনানীতে ফ্ল্যাটের মূল্য প্রতি বর্গফুট গড়ে ১৫ থেকে ২২ হাজার টাকা। সে হিসাবে এসব এলাকায় একেকটি মধ্যম মানের ফ্লাটের মূল্য কয়েক কোটি টাকা। কয়েক হাজার প্লাট মালিকের মধ্যে কতজন ঠিকমতো কর দেয়?

কর প্রদানে কোটিপতিদের এ অনীহা নতুন কিছু নয়। এনবিআরের চেয়ারম্যান এর মতে, এটা অপ্রত্যাশিত যে, এত কম সংখ্যক ব্যক্তি কোটি টাকার ওপর সম্পদ দেখিয়েছেন। যতই দিন যাচ্ছে, কোটিপতিদের কাছ থেকে কর আদায় করা ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নিয়ে কোটিপতিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ এনবিআরের গ্রহণ করা উচিত। এরপর তাদের যথাযথ আইনের আওতায় আনা উচিত। তা না হলে দেশের রাজস্ব আদায় বাড়বে না। উল্লেখ্য, উন্নত দেশগুলোতে যেখানে কর রাজস্ব এবং জিডিপি অনুপাত ৩৩.৮ শতাংশ থেকে ৩৩.৯ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গড়ে এ হার ৮%-১২% হলে ও বাংলাদেশের কর রাজস্ব অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশে নিম্ন রাজস্ব আয়ের প্রধান কারণ ব্যাপক কর ফাঁকি। গোপন বা অনৈতিক উৎস হতে উপার্জনের অবারিত সুযোগ থাকায় রাজস্ব  আয়ের ঘাটতির পাশাপাশি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কালো অর্থনীতির সুযোগ বাড়ছে এবং সর্বোপরি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ শুধুমাত্র বাংলাদেশের সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন নয়, করারোপ নীতি এবং কর ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১২-১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত সময়কালে মাত্র ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা সাদা করা হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয় হয় মাত্র ১,৪৫৫ কোটি টাকা, যা এনবিআরের ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে সংশোধিত সর্বমোট রাজস্ব করের মাত্র ১.১৬ শতাংশ। এ ব্যবস্থা চলমান থাকায় অবৈধ অর্থ উপার্জন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পাচ্ছে। আর কর ফাঁকি দিয়ে উপার্জিত অবৈধ অর্থ বিদেশে কর-স্বর্গ বলে পরিচিত দেশসমূহে পাঁচার করে তা আবার দেশে নিয়ে আসলেও এনবিআর বা দুদক এসব অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে পারেনি বা চায়নি। উল্টো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত রুই-কাতলাদের নির্বিচারে সততার সনদ দিয়েছে দুদক। উল্লেখ্য, এনবিআর সুত্রে জানা যায়, করস্বর্গ বলে খ্যাত বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, কেমান আইল্যান্ড, মরিশাস, পানামা, মাল্টা, ফিলিপাইনসহ বিভিন্নস্থানে বাংলাদেশীদের অবৈধ অর্থ পাচার হচ্ছে।

ম্যাসাচুসেটস বাজেট এবং পলিসি সেন্টার এর কূর্ট ওয়াইজ এবং নোয়াহ এর মতে, ‘করারোপে’র উল্লম্বন সমতা’র আওতায় নাগরিকের ওপর করারোপের ক্ষেত্রে কর প্রদানের সক্ষমতাকে বিবেচনা করার কথা এবং যার আওতায় নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় ধনীরা তাদের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রদানের কথা’। এ প্রেক্ষিতে কর ব্যবস্থাকে সুষম এবং দারিদ্র-বান্ধব করে তোলার প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনবিআর এর সমন্বয়ে কোটিপতিদের করের আওতায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণে দেশের প্রচলিত কর আইন সংশোধন করা; পরোক্ষ কর পর্যায়ক্রমে কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের অবদান বৃদ্ধি করে কর নীতিমালা দরিদ্রবান্ধব ও কর কাঠামো অধিকতর প্রগতিশীল করা; অত্যাবশ্যকীয় সেবাখাতকে মূল্য সংযোজন করের আওতামুক্ত রাখা; আয়-বৈষম্য এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে (ব্যক্তি এবং কর্পোরেট দেশীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পসহ) আয়স্তর, আয়কর হার নির্ধারণ; ব্যক্তির টিআইএন, জাতীয় পরিচয় পত্র, পাসপোর্টের নম্বর এবং কর প্রদান সংক্রান্ত তথ্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা করা; একটি ন্যুনতম সীমার উর্দ্ধে সকল লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা প্রদান করা; সকল বৈধ টিআইএনধারীর নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা; এবং সর্বেপারি সকল ক্ষেত্রে পূর্ণ অটোমেশন এবং কার্যকর ই-গভর্নেন্স নিশ্চিত করা; কর ন্যায়পালের পদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করতে এনবিআরকে আইনী ক্ষমতা দেয়া জরুরি।