Home » প্রচ্ছদ কথা » ২০১৫ সালেই যুদ্ধ-ব্যয় ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার, কিন্তু শান্তিতে?

২০১৫ সালেই যুদ্ধ-ব্যয় ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার, কিন্তু শান্তিতে?

ক্যামিলা স্কিপা ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালটি ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুাকপূর্ন ও খারাপ একটি খারাপ বছর। ঐতিহাসিক প্রবণতা অনুযায়ী, বৈশ্বিক শান্তি আরো নাজুক অবস্থায় পড়েছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে ২০১৫ সালেই বৈশ্বিক যুদ্ধে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ভয়াবহ মাত্রায় সন্ত্রাস দেখা গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত বছরই সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুত লোক দেখা গেছে।

এই সহিংসতার মূল্য বিপুল। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ক্রয় ক্ষমতা মানদন্ডে (পিপিপি) ২০১৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সহিংসতার অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য দিনে ৫ ডলারের সমান, কিংবা বৈশ্বিক বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) আয়তনের ১১ গুণ।

সহিংসতার ক্ষতি আসলে হিসাব করা উচিত মানবীয় ও আবেগগত মানদন্ডে। অবশ্য অর্থনীতিতে ক্ষতির হিসাবটাও বিবেচনায় আনা দরকার। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের সময় সহিংসতা প্রতিরোধ ও সংযত করার ব্যয় এবং সেইসাথে এর পরিণতিও পরিমাপ করা দরকার। এই বিবেচনাটা খুবই দরকার। কারণ সহিংসতা সংযত রাখতে ব্যয় করাটা দরকারি হলেও এটা অর্থনৈতিকভাবে মূলত অনুৎপাদনশীল।

সহিংসতা সৃষ্টি ও প্রতিরোধে এবং এর পরিণামে যেসব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে, সেটা পরিমাপ করার একটি পদ্ধতি হলো ‘আইইপি’ পদ্ধতি। এতে কেবল সামরিক ব্যয়ই হিসাব করা হয় না, বরং সেইসাথে নিরাপত্তা ও পুলিশের পেছনে অভ্যন্তরীণ ব্যয় এবং সশস্ত্র সংঘাত, নরহত্যা, সহিংস অপরাধ এবং যৌন নিপীড়নে ক্ষয়ক্ষতিও বিবেচনায় আনা হয়।

১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় ও ক্ষতি বিশ্ব জিডিপির ১৩.৩ ভাগের সমান। এই টাকাটা এই দুনিয়ার সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিতে চাইলে প্রতিটি লোক পাবে ১,৮৭৬ ডলার করে।  এই হিসাব করাটা দুটি কারণে খুবই দরকার। প্রথমত, এই ব্যয়ের ৭০ ভাগের বেশি করে সরকার তার সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায়; অর্থাৎ সরকারি ব্যয়ের বড় অংশটাই যাচ্ছে এই খাতে। বিশ্ব যদি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ হয়, তবে এই বিপুল সম্পদ অন্যান্য খাতে ব্যয় হবে। দ্বিতীয়ত, সহিংসতা ও সংঘাত অবসানের পরও যে ক্ষতিটা বিরাজ করতে থাকে, সেটাও কিন্তু ভয়াবহ। তাতেও কিন্তু বিপুল খরচ হতে থাকে।

একটু নজর বুলালেই দেখা যাবে, সহিংসতা সৃষ্টি এবং সেটা থামানোর জন্য বিশ্ব অব্যাহতভাবে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তার তুলনায় শান্তির পেছনে খরচ করছে অতি সামান্য। কেবল ২০১৫ সালেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কাজে ব্যয় হয়েছে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার; যা সশস্ত্র সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হওয়া ৭৪২ বিলিয়ন ডলারের মাত্র ১.১ ভাগ। দীর্ঘ মেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যারা কাজ করছে, তাদের দরকার ৬.৮ বিলিয়ন ডলার, যা সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিকভাবে যে ক্ষতি হচ্ছে তার মাত্র ০.৯ ভাগ।

ভবিষ্যত যাতে শান্তিপূর্ণ হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিরক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ।

বর্তমানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমগুলোর লক্ষ্য মূলত সংঘাত সৃষ্টি হলে সেটা থামানোর চেষ্টা করা। কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে চাইলে প্রয়োজন সংঘাত যাতে সৃষ্টিই না হয়, সেটার ব্যবস্থা করাই সবার আগে জরুরী।

শান্তি প্রতিষ্ঠা মিশনের লক্ষ্য হবে- সহিংস সংঘাত প্রতিরোধে জাতীয় সামর্থ্য জোরদার করা, এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা- যেগুলো টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করতে পারবে।

কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সহিংসতার পেছনে ব্যয় করছে বিপুল অর্থ, শান্তিতে খুবই সামান্য। অবশ্য, এ কারণেই শান্তির পেছনে ব্যয় বাড়ানোর অর্থনৈতিক যুক্তিও প্রবল হয়ে ওঠছে।

কোনো কোনো দেশে আরো শান্তির দাবি জোরদার হতে থাকলেও এবং তারা শান্তির চেষ্টা বাড়াতে থাকলেও সার্বিকভাবে বিশ্বজুড়ে সহিংসতা বাড়ছে। এতে করে দেশগুলোর মধ্যে আরো বেশি বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। কম শান্তিপূর্ণ দেশগুলো বেশি বেশি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে তারা আরো বেশি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ছে।

(লেখক- পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পিস।)