Home » বিশেষ নিবন্ধ » বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(তৃতীয় পর্ব)

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(তৃতীয় পর্ব)

 

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষণের প্রয়োজন নেই আহমদ ছফা’র। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির বক্তা অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

একথা অনস্বীকার্য যে আমাদের দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল ইংরেজি ও ইউরোপীয় সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের সংস্পর্শে আসার ফলেই। ইংরেজরা চেয়েছিল এই দেশের কিছু লোককে ইংরেজি শিক্ষাদান করে তাদের কেরানি ও নিচু প্রশাসনিক পদে নিয়োগ করতে-তাতে প্রশাসনিক খরচ কম হবে। মোগল আমলে টোল-মাদ্রাসার বাইরে কোন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। মুদ্রণ শিল্পও ছিল না। সংবাদপত্র এসেছে ইংরেজ শাসনের পরই। এইভাবে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ইংরেজ শাসন এ দেশের সমাজজীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছিল সেকথা ইংরেজ শাসনের ঘোর সমালোচক ও তৎকালীন পরাধীন ভারতের জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু কার্ল মার্কস পর্যন্ত স্বীকার করেছেন। (কার্ল মার্কস, ‘ভারতে বৃটিশ শাসন’)। পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের সংস্পর্শ আসার ফলশ্রুতিতে বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব জাগরণ হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীতে। সৃষ্টি হয়েছিল আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর যার প্রায় পুরোটাই ছিল বর্ণহিন্দু। তাঁদের অনেকে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেছিলেন এবং হিন্দুসমাজ সংস্কারে মনোযোগী হয়েছিলেন। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সেকুলারিজম, নারীমুক্তি ইত্যাদি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধারণারও সৃষ্টি হয়েছিল, যদিও তখনও পুঁজিবাদ আর বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেনি। সে সময় জমিদার ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুৎসুদ্দিগিরি করা একটা সংকীর্ণ ধনিকশ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল। তারাও ছিল বর্ণহিন্দু।

হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছিল, শিক্ষায় ও বিত্তে। এই যে জাগরণ হয়েছিল, যাকে অনেক সময় রেনেসাঁস বলা হয় (যদিও এই শব্দ নিয়ে বিতর্ক আছে) তা সীমাবদ্ধ ছিল বর্ণহিন্দুদের এক সংকীর্ণ অংশের মধ্যে। এর বাইরে ছিল ব্যাপক মুসলমান জনগোষ্ঠী এবং হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে কৃষক ও মেহনতি জনগণ এবং তারাই তো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তাছাড়া যে সকল মহাপুরুষ উনবিংশ শতাব্দীতে সাহিত্যে ও সমাজ সংস্কারে ঐতিহাসিক ও মহৎ অবদান রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে কিন্তু নানা ধরনের স্ববিরোধিতা দেখা যায়।

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ প্রথম আধুনিক ভারতীয় ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। কিন্তু তিনি সামন্তবাদী জমিদারী ব্যবস্থা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক ছিলেন। ফরাশি বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন দরকার বলে মনে করতেন। সবদিক দিয়ে সবচেয়ে র‌্যাডিকাল বুর্জোয়া গণতন্ত্রী ছিলেন ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী ও ডিরোজিওর শিষ্যরা। তাঁরা সরাসরি না বললেও স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন নাস্তিক এবং অবশ্যই অসাম্প্রদায়িক। তাঁরা নারী পুরুষের সমতার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ডিরোজিওর র‌্যাডিক্যাল ভাবধারা পরবর্তীতে খুব বেশি অগ্রসর হয়নি। বরং রামমোহন-বিদ্যাসাগরের আপোসপন্থী লিবারেল ধারার পথেই শিক্ষিত হিন্দু সমাজ অগ্রসর হয়েছিল। অবশ্য বিদ্যাসাগর ছিলেন পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক, সম্ভবত নাস্তিকও। পরাধীনতার গ্লানি তাঁকে পীড়িত করত, কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে ইংরেজ শাসনের বিরোধিতা করেননি, জমিদারী ব্যবস্থা সম্পর্কেও নিরব ছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিক শিক্ষার প্রসারের জন্য আগ্রহী ও তৎপর ছিলেন। একথা সকলেই জানেন যে রাজা রামমোহন রায়ের একান্ত প্রচেষ্টার ফলে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হয়েছিল (১৮২৯ সালে) আর হিন্দুসমাজে বিধবা বিবাহ আইন সিদ্ধ হয়েছিল (১৮৫৬ সালে) বিদ্যাসাগরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে। আমার বিবেচনায় বিদ্যাসাগর ছিলেন এই মাটির মহত্তম পুরুষ।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত পৈত্রিক জমিদারি ও পৈত্রিক ধর্ম পরিত্যাগ করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি খুবই ভালভাবে পরিস্ফুট। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এলেন আরেক প্রতিভাবান সাহিত্যিক যার সামাজিক ভূমিকাও ছিল বিরাট। তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রথম জীবনে তিনি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। কিছুটা সাম্যের ধারণাও। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠলেন হিন্দু পুনর্জাগরণবাদের প্রধান প্রবক্তা। তিনি হয়ে উঠলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক, ইংরেজ শাসনের ভক্ত এবং মুসলিম বিদ্বেষী। বিরাট সাহিত্য-প্রতিভার অধিকারী বঙ্কিমচন্দ্র জাতীয়তাবাদের আবেগ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘আনন্দমঠে’র অন্তর্ভূক্ত গান থেকে নেয়া ‘বন্দে মাতরম’ শব্দদ্বয় বিংশ শতাব্দীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের মন্ত্রধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এই উপন্যাসেই তিনি দেখাচ্ছেন, ইংরেজরা এসেছে জনগণকে রক্ষা করতে। তাঁর জাতীয়তাবাদের শত্রু কিন্তু ইংরেজ নয়, বরং প্রতিবেশী মুসলমানরা শত্রু বলে চিহ্নিত হয়েছিল। এইভাবে রামমোহন-বিদ্যাসাগর যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ও উদার মানবতাবাদী ধারার সৃষ্টি করছিলেন তা হিন্দু পুনর্জাগরণবাদে পরিণত হয়েছিল।

অবশ্য হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ব্যতিক্রমও ছিলেন। যেমন হিন্দু পেট্রিয়টের সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তিনি জমিদারের বিরুদ্ধে কৃষকপ্রজার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পাবনার প্রজাবিদ্রোহের জন্য বঙ্কিমচন্দ্র যখন কৃষকের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, তখন হরিশচন্দ্র বিদ্রোহী কৃষকের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। এমনকি ১৮৫৭ সালের  মহাবিদ্রোহের সময় তিনি কৌশলের সঙ্গে ইংরেজ শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। নীলকুঠির অত্যাচারের বিরুদ্ধে নাটক লিখেছেন দীনবন্ধু মিত্র। ধর্মনিরপেক্ষ ধারণা তুলে ধরেছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, আর্যদর্শনের সম্পাদক যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ প্রমুখ হিন্দু বুদ্ধিজীবী। শ্রমজীবীর পক্ষে গান রচনা করেছেন এবং বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন শিবনাথ শাস্ত্রী। এইরকম আরও কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে মুসলমান সমাজের চিন্তাচেতনা কোন স্তরে ছিল? হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল গরিব ও কৃষক। উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিতরা যখন হিন্দু পুনর্জাগরণবাদ অথবা মুসলিম জাতীয়তাবাদ নিয়ে মাতামাতি করছেন, অথবা বিপরীতে উভয় সম্প্রদায়ের উদার অংশ যখন হিন্দু-মুসলমানের মিলনের জন্য সচেষ্ট তখন গরিব শ্রমজীবী হিন্দু-মুসলমান আপনা থেকেই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন এবং মিলিতভাবে লড়াই করেছেন ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে, জমিদারদের বিরুদ্ধেও। তবে এই শ্রমজীবীরা ছিলেন অক্ষরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত। অভিজাত মুসলমান শ্রেণী প্রথমে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। শাসন-ক্ষমতা হারানোর ক্ষোভে এই তার প্রতিক্রিয়া। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উচ্চবিত্ত ও বর্ণহিন্দুরা ছিল রাজভক্ত, কিন্তু তাদের একটি অংশ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। অন্যদিকে মুসলমানরা ছিল ইংরেজ বিরোধী, তবে চিন্তাচেতনায় পশ্চাৎপদ। উভয় সমাজের মধ্যে এই যে অদ্ভূত ধরনের বৈপরীত্য তা ছিল ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

আহমদ ছফা মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত যে দুইটি গণ-সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছে তিতুমীরের নেতৃত্বাধীন ওয়াহাবি আন্দোলন ও দুদুমিয়ার নেতৃত্বাধীন ফরায়জি আন্দোলন। এই আন্দোলন ব্রিটিশ রাজ ও জমিদার বিরোধী ছিল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুইটি জনপ্রিয় আন্দোলন ছিল মহৎ। কিন্তু একই সঙ্গে এই আন্দোলন দুইটির মধ্যে যে ধর্মীয় রং ছিল এবং তা যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারেনি সেটাও ভুললে চলবে না। এক কথায় বলা যায়, উনবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষিত হিন্দুরা ছিলেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজভক্ত, কিন্তু বহুবিধ সামাজিক বিষয়ে তারা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। অন্যদিকে অভিজাত ও কিছুটা শিক্ষিত (আরবি-ফার্সি ভাষায় শিক্ষিত) মুসলমানরা ছিল ব্রিটিশ বিরোধী কিন্তু সামন্ত ধ্যান-ধারণা দ্বারা আচ্ছন্ন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চিত্রটি বদলে গেল। হিন্দু শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী হয়ে উঠলো বৃটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী। অন্যদিকে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ-প্রীতি তৈরি হয়েছিল। মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ এবং বাংলায় নবাব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী। মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ রাজের প্রতি আনুগত্যের মনোভাব তৈরির জন্য তাঁরা সচেষ্ট হয়েছিলেন।