Home » বিশেষ নিবন্ধ » চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৪৯ : সংস্কারের বেইজিং মডেলের বৈশিষ্ট্য

চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৪৯ : সংস্কারের বেইজিং মডেলের বৈশিষ্ট্য

আনু মুহাম্মদ ::

চীন কীভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলো এবং এতোবছর তা ধরে রাখতে পারলো, কীভাবে এতো দ্রুত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হলো, কীভাবে এতোবড় দেশে বাজার অর্থনীতিমুখি সংস্কার কোনো বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করলো না তা অর্থশাস্ত্র এবং অর্থনীতি বিষয়ক সব গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী আলোচনাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠেছে। বিশ্বের মহাজন শক্তিগুলো এভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে চায় যে, ওয়াশিংটন ঐকমত্য বা নয়া উদারতাবাদ বা বিশ্ব ব্যাংক-আইএমএফ নির্দেশিত পথে অর্থনীতির উদারীকরণ বা ব্যক্তিপুঁজির অবাধ বিকাশই এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি সম্ভব করেছে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে, এই মডেল তো বিশ্বের বহুদেশেই অনুসরণ করা হয়েছে, সে সব দেশে এ রকম ফলাফল দেখা যায়নি। আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার বহুদেশ, বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তান সর্বত্রই বাজারমুখি সংস্কারের ফলাফলে অনেক উঠানামা আছে। বহুদেশ হোঁচট খেয়েছে, বহুরকম সংকটে হাবুডুবু খেয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে তা দেখা গেলো না কেন? মোটাদাগে সংস্কারের দুই ধারার তুলনামূলক চিত্র নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতি বিশ্লেষক কাভালজিৎ সিং গবেষণা করেছেন। চীনের সংস্কারের মৌলিক ভিন্নতার কারণে কাভালজিৎ ‘ওয়াশিংটন ঐকমত্য’ থেকে আলাদা করে একে ‘বেইজিং ঐকমত্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এবিষয়ে তাঁর নিম্নোক্ত পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত আমি গ্রহণ যোগ্য মনে করি।[i]

প্রথমত, ১৯৭৮ সালে যখন চীন অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করে ততোদিনে তার অনেক শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছিলো। এর আগেই দারিদ্র ব্যাপকভাবে দূরীভূত হয়েছিলো। শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সামাজিক সূচকগুলোতে এর আগেই উচ্চমাত্রার সাফল্য ছিলো। এসব সাফল্য নষ্ট করে নয়, বরং এগুলোর ওপর দাঁড়িয়েই সংস্কার কর্মসূচি নেয়া হয়েছিলো।

দ্বিতীয়ত, অন্য বহু দেশে যেমন ভারত, পাকিস্তান বা ব্রাজিলে এসব সংস্কার শুরু হয়েছে একেকটি অর্থকরী সংকটের মধ্যে (ঋণ, মুদ্রামান, লেনদেনের হিসাব ইত্যাদি), সংকট থেকে বের হবার উপায় হিসেবে। কিন্তু চীন কোনো অর্থকরী সংকটের চাপের কারণে সংস্কার শুরু করেনি, করেছে সম্পূর্ণ নিজস্ব চিন্তায় উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে, বিশ্বশক্তি হবার আকাঙ্খায়। এরকম নিজস্ব পরিকল্পনা ও কর্তৃত্ব অন্যদেশগুলোর সংস্কারের বেলায় দেখা যায়নি। এখানে তাই অন্যদেশগুলোর বিশ্বব্যাংক আইএমএফের কোনো ভূমিকা বা কর্তৃত্ব ছিলো না। সে কারণে করণীয়, গতি, অগ্রাধিকারে কোনো অসামঞ্জস্য তৈরি হয়নি।

তৃতীয়ত, চীন ধাপে ধাপে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। প্রথমে কৃষি, পরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং শেষে শিল্প। এসব ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিখাতের প্রসার ঘটানো হলেও অর্থকরী খাতের ওপর প্রধানত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়েছে। যে কারণে ১৯৯৭ সালে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থকরী খাতে ধ্বস নামলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা ফটকাবাজারি দ্বারা চীন কোনোভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি।

চতুর্থত, অর্থনৈতিক সংস্কার বা ব্যক্তিখাতের প্রসার কর্মসূচি পুরো চীনের ক্ষেত্রে নেয়া হয়নি। বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে চীন। যেমন, উপকূলীয় ও পূর্ব চীন এলাকায় বিনিয়োগ, কর ব্যবস্থার সংস্কার সীমিত রাখা হয়েছে শুধু কিছু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে।

পঞ্চমত, রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে যেভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোরকম আইনী ব্যবস্থা না রেখেই   ফালতু দামে বিতরণ করা হয়েছে- যার ফলে মাফিয়া পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটেছে; চীনে সেরকম ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের হাতেই রাখা হয়েছে।

ষষ্ঠত, বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ অনেক বেড়েছে চীনে। কিন্তু অন্য অন্য দেশের মতো তা বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য বাড়াতে পারে নি। প্রথম দিকে বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ করা হয়েছে শুধুমাত্র বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে, হংকং ও তাইওয়ানে প্রবাসী চীনাদের থেকে। এই এলাকার বাইরে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর বহুরকম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়েছে।

কিন্তু অনেকরকম সতর্কতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সাফল্য সত্ত্বেও পুঁজিমুখি সংস্কারের অপরিহার্য অভিঘাত ঠিকই দেখা গেছে। গ্রাম শহর ও শ্রেণীগত বৈষম্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি, সম্পদ কেন্দ্রীভবন, পরিবেশ দূষণ তার অন্যতম।

__________________________________________________________

[i] Kavaljit Singh: “From Beijing Consensus to Washington Consensus: China’s Journey to Liberalization and Globalization”, 2008.