Home » আন্তর্জাতিক » ভারত-রাশিয়া দীর্ঘ বন্ধুত্বে ফাটল : নতুন মিত্র পাকিস্তান!

ভারত-রাশিয়া দীর্ঘ বন্ধুত্বে ফাটল : নতুন মিত্র পাকিস্তান!

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

সেই ১৯৫০-এর দশকের প্রথম ভাগ। স্নায়ুযুদ্ধের টালমাটাল সময়। মাত্র কয়েক বছর হলো ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে। তীব্র বৈরী দেশ দুটির প্রতি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কমতি নেই। পাকিস্তান ও ভারতও এ নিয়ে ভাবছে। সব হিসাব মিলিয়ে যখন প্রায় সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, ভারত যাচ্ছে মার্কিন বলয়ে, কাজেই পাকিস্তান সোভিয়েতের দিকে। কিন্তু হঠাৎ কী থেকে কী যেন হয়ে গেল। ভারত চলে গেল সোভিয়েত বলয়ে। পরিণতিতে পাকিস্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে।

ওই দিন যা হয়নি, সেটাই কী আজ হতে চলেছে? কাশ্মির নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে শুরু হয়েছে রাশিয়া-পাকিস্তান যৌথ সামরিক মহড়া। ভারত প্রচন্ড আপত্তি জানিয়েছিল। দুই নৌকায় পা দেওয়া নিয়ে রাশিয়াকে হুঁশিয়ারও করে দিয়েছিল। অর্থাৎ শিথিল হতে থাকা রুশ-ভারত সম্পর্ক আরো ঢিলে হবে, এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তবুও রাশিয়ার সৈন্যরা যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়ে পাকিস্তানে গেছে।

রাশিয়া-পাকিস্তান এই মহড়ার নাম দিয়েছে ‘ফ্রেন্ডশিপ ২০১৬’। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর এই মহড়া হচ্ছে বলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিডিয়া শাখার প্রধান লে. জেনারেল আসিম সেলিম বাজওয়া জানিয়েছেন। দিল্লিতে রুশ দূতাবাস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতেও মহড়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে। তবে ভারতকে সান্তনা দিতে গিয়ে বলেছে, গিলগিট-বাল্টিস্তানের মতো সমস্যাসঙ্কুল বা স্পর্শকাতর কোনো স্থানে নয়, বরং রাট্টোর সামরিক স্কুলে এই মহড়া হবে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সাথে সামরিক সহযোগিতা জোরদার ও বিকাশ করার লক্ষ্যে এই মহড়া হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য হবে অবৈধ সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে নির্মূল করা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সত্ত্বেও রাশিয়া এখনো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা মিত্র এবং অন্যতম অস্ত্র যোগানদাতা। তাহলে কেন পাকিস্তান-রাশিয়া মহড়া? কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানে বলেন, ‘ভারতের যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি রাশিয়াকে পাকিস্তানের সাথে প্রথমবারের মতো সামরিক মহড়া আয়োজন করতে উৎসাহিত করেছে।’

পাকিস্তানের সাথে রাশিয়ার শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করে ২০১৪ সালে। ইসলামাবাদের ওপর থেকে দীর্ঘকালীন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় মস্কো। আর এর মাধ্যমে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জটি দ্রুতগতিতে বদলে যেতে থাকে। এবারের মহড়ার আগে রাশিয়া-পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকটি স্থাপিত হয় ২০১৫ সালে ইসলামাবাদের কাছে মস্কোর এমআই-৩৫ অ্যাটাক হেলিকপ্টার বিক্রির সিদ্ধান্তে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি রাশিয়া লক্ষ্য করে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের শীর্ষ নেতাদের সফর বিনিময়, যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক পুনবির্ন্যাসের আলোকে নয়া দিল্লির প্রাচ্যনীতি গ্রহণ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক সহযোগিতা রাশিয়ার জন্য সুখকর হওয়ার কথা ছিল না।

ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রসীমানা। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের অবস্থানকে সমর্থন করে ভারত। আর এ ব্যাপারে রাশিয়া সমর্থন করে চীনকে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সেনাদের পাকিস্তানে গিয়ে যৌথ মহড়ায় অংশ নেওয়া বিরাট ঘটনা। বিশেষ করে কাশ্মিরের এক সেনা ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ১৮ সেনাকে হত্যা করার প্রেক্ষাপটে। ভারত চাইছিল, পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করতে। কিন্তু রাশিয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকাতে ভারত আরেক দফা পরাজিত হলো বলেই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানে আরও জানান, ভারত এখনো পাকিস্তানের সাথে নিজের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ‘পাকিস্তানের সাথে দিল্লি এমনকি কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাসও করেনি। এখন পর্যন্ত সে গলাবাজিই করেছে, কাজের কাজ কিছুই করেনি।’ (টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে)