Home » প্রচ্ছদ কথা » নদী-বন ধ্বংসে আর কতো বিনাশী আয়োজন

নদী-বন ধ্বংসে আর কতো বিনাশী আয়োজন

হায়দার আকবর খান রনো ::

ফারাক্কা বাধ যখন নির্মিত হয়, তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। ফলে সেদিকে নজর দেয়ার সুযোগ আমাদের হয়নি। ভারত তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে সাহায্য করেছিল, তা কখনোই ভোলার নয়। কিন্তু একই সময়ে ভারত যে বাংলাদেশের জন্য এতো বড় সর্বনাশ করে চলছিল, সেদিকটি দেখার সময়-সুযোগ অবকাশ কোনটাই হয়নি আমাদের। ভারতের উচিত হয়নি, ভাটির দেশের সাথে কোন রকম সমঝোতা না করে গঙ্গা নদীর উপর বাধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া। অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার তদানীন্তন পূর্ব বাংলার (আজকের বাংলাদেশ) ভবিষ্যত স্বার্থ নিয়ে তো কখনোই মাথা ঘামায়নি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রথম বিপদের দিকটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তার বিখ্যাত ফারাক্কা মার্চ বাংলাদেশের মানুষকে সচেতন করে তুলেছিল।

সেই জন্য মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতবিরোধী’ বলে বদনাম কুড়াতে হয়েছিল। কিন্তু জনগণের নেতা কুৎসার প্রতি কর্ণপাত না করে যা সত্য, জনগণের যা ন্যায্য দাবি তা তুলে ধরতে কখনো পিছপা হননি।

ভারত বিরোধীতার দুটো দিক আছে। একটি হলো- ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অন্ধভারত বিরোধীতা, যা পাকিস্তানি রাজনীতির সম্প্রসারণ মাত্র। ঐতিহাসিক কারণেই এই ধরনের ভারত-বিরোধীতার সাথে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি জড়িত থাকে; যা একদা মুসলিম লীগ করেছিল। জামায়াত ও বিএনপির রাজনীতিও তাই। অন্যটি হলো- ভারত একদা আমাদের স্বাধীনতার জন্য সাহায্য করেছিল বলে যে ভারতের সব অন্যায় আচরণ মেনে নিতে হবে, এ তো কোনো কাজের কথা হলো না। আমরা লক্ষ্য করছি, শাসকবর্গ ভারতের প্রতি একপেশে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে চলেছে। এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং কিভাবে ঢাকায় অবস্থান করে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছিলেন সে কথা তো ফাঁস করে দিয়েছিলেন বর্তমান সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল এরশাদ। এছাড়া প্রতিদিন ভারতের বিএসএফ যেভাবে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যা করছে, তা কি কোন বন্ধুত্বের লক্ষণ? বন্ধুত্ব কখনো একতরফা হয় না।

বাংলাদেশের জন্য ভারত সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর যে কাজটি করেছে তাহলো-ভাটির দেশকে বঞ্চিত করে গঙ্গা-তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানি সরিয়ে ফেলা। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তা তারা পারে না। কিন্তু গায়ের জোরে করছে। দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশ সরকার মৃদুকণ্ঠেও প্রতিবাদ জানাচ্ছে না।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ ভবিষ্যতে নদীশূন্য, এমনকি পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে, এমন আশংকা করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তথ্য, উপাত্ত, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

মরার উপর খাড়ার ঘা। এবার ভারত ও বাংলাদেশের দুই রাষ্ট্রীয় কোম্পানী মিলে সুন্দরবনও শেষ করতে চলেছে। সুন্দরবনের গা ঘেষে বাগেরহাটের রামপালে যে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, তাতে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে উজাড় পর্যন্ত হয়ে যাবে, এমন আশংকা করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। গণপ্রতিবাদও গড়ে উঠেছে দেশব্যাপী। কিন্তু সরকার জেদ ধরে বসে আছে, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ওখানেই করবে। ক’দিন আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে সে কথা জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা বলেছি, এতে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাতাসের তাপ বৃদ্ধি পাবে, ছাই ও কয়লার কণা বনাঞ্চলে ও নদীতে ছড়িয়ে পড়বে, পশুর নদীর পানি ব্যবহার করে তা দূষিত আকারে আবার নদীতে ফেলা হবে ইত্যাদি। এতো বড় সর্বনাশ না করার জন্য আমরা অনেক বলেছি। সরকার বলেছেন, ওসব নাকি মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। তাদের উন্নত প্রযুক্তির কারণে নাকি কোনো ক্ষতিই হবে না। এমনকি সরকার একথাও বলছেন যে, রামপাল নাকি সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে। আমরা বলছি ১৪ কিলোমিটারের চেয়েও কম দূরত্বে (বাফার জোন ধরলে নয় কিলোমিটারেরও কম)। সরকার দূরত্ব নিয়েও অবান্তর কথা বলছেন।

এবার জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কোও বলেছে, সুন্দরবনের নিকটস্থ রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবন ধ্বংস হবে। এই প্রকল্প এবং মংলা বন্দরের পাশে আরেকটি প্রস্তাবিত প্রাইভেট কোম্পানীর কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে ইউনেস্কো আপত্তি জানিয়েছে। আপত্তির কারণ হিসেবে আমরা এ পর্যন্ত যে সকল কথা বলে এসেছি, সেই একই কথা তারাও বলেছেন। কারণ বিজ্ঞান তো দুই রকম হতে পারে না। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯০০ ফুট উচু চিমনি দিয়ে যে তাপ বের হবে তা বাতাসকে উত্তপ্ত করবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে নদীর পানি ব্যবহার করা হবে, তা দূষিত আকারে আবার নদীতে ফেলা হবে। প্রতিদিন অনেক জাহাজ যাতায়াত করবে। তার শব্দ দূষণ তো আছেই। তাছাড়াও নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য ৩৫ কিলোমিটার নদীপথ খনন করা হবে। এতে ৩ কোটি ২১ লাখ ঘনমিটার মাটি নদী থেকে উত্তোলন করা হবে। ফেলা হবে কোথায়? সব মিলিয়ে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ গাছপালা জীববৈচিত্র দারুনভাবে হুমকির মুখে পড়বে। গত দুই বছরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেল, সার, সিমেন্ট ও কয়লাবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনার উল্লেখ করে ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এতো দুর্ঘটনার পরও জাহাজ চলাফেরার ক্ষেত্রে যে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা ছিল, তা নেয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘের এই সংস্থাটি বাংলাদেশ সরকারকে রামপাল প্রকল্প বাতিল করার জন্য আহবান জানিয়েছে। দেখা যাক, এবার সরকার কি করে?

জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছে। সেটি হলো- ফারাক্ক বাধ সংক্রান্ত। গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনটি বলছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে সুন্দরবনের নদীসমূহে মিষ্টি পানি প্রবাহ কমে গেছে। পানির স্রোতও কম। ফলে সাগরের লবণাক্ত পানি অনেক বেশি। ভেতরে প্রবেশ করছে। এতে সুন্দরবনের গাছ কম জন্মাচ্ছে। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকেই অনেক বিজ্ঞানী একথা বলেছিলেন। ফারাক্কার অন্যান্য বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে সুন্দরবন ধ্বংসের বিষয়টিও ছিল। তাহলে সুন্দরবন ধ্বংসের প্রক্রিয়া চার দশকের আগের থেকেই শুরু হয়েছিল। এখন রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ধ্বংসের বাকি কাজটি দ্রুতই সম্পন্ন হবে।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার যেন ভারতের সাথে আলোচনা করে পদ্মার পানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। আমি জানি না, সরকার সেই উদ্যোগ নেবে কি না। অন্তত অতীত অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। তারপরেও দেখা যাক, ভারত তাতে সাড়া দেবে কি না।

ফারাক্কার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের অনেক নদী হারিয়ে যাচ্ছে। কুষ্টিয়ার আটটি নদী এবং বাগেরহাটের ২৩টি নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফারাক্কা ছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের অপরিকল্পিত সুইস গেট নির্মাণের কারণেও চলনবিলের বিভিন্ন নদনদী ও বিল জলাশয় পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে তিস্তা নদীতে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে যে বাধ দিয়েছে, তাতে উত্তরবঙ্গের বহু নদী হারিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে দেখা যায়, প্রমত্ত পদ্মায় ধুধু বালি। তিস্তা নদীতে পানি নেই।

প্রকৃতিকে এইভাবে হত্যা করা বড় ধরনের অপরাধ, যে কাজটি ভারত সরকার নির্বিচারে করেই চলেছে।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে একদিকে আমরা পানিশূন্য হচ্ছি, অন্যদিকে খোদ ভারতের বিহারেও ব্যাপক বন্যা হচ্ছে। ভারতের অঙ্গরাজ্য বিহারের মুখমন্ত্রী নিতিশ কুমার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। হায়! একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে। একদা নাকি উগ্রভারত বিরোধীরা ফারাক্কা বাধ ভেঙ্গে ফেলার জন্য শ্লোগান  দিত। এখন স্বয়ং ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একই কথা বলছেন।

বস্তুত ইঞ্জিনিয়ারিং দিক দিয়ে ফারাক্কা একটি ব্যর্থ প্রকল্প। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য এই বাধটি নির্মাণ করা হয়েছিল; কিন্তু তা সফল হয়নি। এখন এটাকে ভেঙ্গে ফেলা ও বন্ধ করাই উত্তম হবে। বাংলাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের জনগণের স্বার্থে, কল্যানে। পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলাই উচিত, এটা হচ্ছে আধুনিক চিন্তা। পরিবেশকে কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু পরিবেশের উপর জবরদস্তি করতে গেলে ফল খারাপ হবে। এই উপলব্ধি কি ভারত-বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কদের আছে?