Home » বিশেষ নিবন্ধ » ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী কী আদৌ শক্তিশালী : ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ

ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী কী আদৌ শক্তিশালী : ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ

কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে এখন প্রবল উত্তেজনা। এমন এক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্ট। প্রতিবেদনটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

অনেক ভারতীয়ের কাছে তাদের দেশের কৌশলগত অবস্থানটাই উদ্বেগজনক। তাদের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী হলো চীন ও পাকিস্তান। অতীতে উভয়ের বিরুদ্ধেই তারা যুদ্ধ করেছে, সীমান্ত ইস্যু এখনো উত্তেজনাকর। উভয়ই পরমাণুসজ্জিত, একে অপরকে সহায়তা করতে জোটবদ্ধ। ভারতের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি জিডিপি-সমৃদ্ধ উদীয়মান পরাশক্তি চীন নিঃশব্দে ভারতের ঐতিহ্যবাহী প্রভাবে থাকা এলাকায় ঢুকে পড়ছে, উপমহাদেশজুড়ে ‘মুক্তার মালা’ জোট গড়ার প্রয়াস চালাচ্ছে। পাকিস্তান তুলনামূলক দুর্বল হলেও পরমাণু ঢালের আড়ালে সুরক্ষিত থেকে ইসলামি গেরিলাদের আশ্রয়দাতায় পরিণত হয়েছে, প্রায়ই ভারতীয় টার্গেটে আঘাত হানছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা অনেক দিন ধরেই আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের আরেকটি ঘটনা ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

এ কারণেই ১৮ সেপ্টেম্বর যখন ব্যাপক অস্ত্রে সজ্জিত চার অনুপ্রবেশকারী একটি ভারতীয় সেনা ঘাঁটিতে প্রবেশ করে আত্মহত্যা করার আগে ১৮ সৈন্যকে হত্যা করল, তখন যৌক্তিক কারণেই আশঙ্কা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ঘাঁটিটির অবস্থান ছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিতর্কিত সীমান্ত ‘লাইন অব কন্ট্রোল’-এর কাছাকাছি পর্বতমালার ঢালে। ভারতীয় কর্মকর্তারা পাকিস্তানের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়; প্রচন্ড জবাব দেয়ার দাবি জানাতে রাজনীতিবিদ আর বিশেষজ্ঞরা প্রতিযোগিতায় নামে। ‘অনুপ্রবেশ ঘটে, এমন প্রতিটি পাকিস্তানি চৌকি গোলায় উড়িয়ে দেয়া উচিত’- বলেছেন এক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার, তিনি এখন ভারতীয় রাজধানী নয়া দিল্লিতে একটি থিঙ্ক ট্যাংকের কর্তা।

পাকিস্তানের প্রতি কঠোর হওয়ার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকার তার পূর্বসূরীদের মতোই নমনীয় পথ অবলম্বন করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর লঘু শাস্তির জন্য পাকিস্তানি দূতকে তলব করে হামলাকারীরা যে সীমান্ত অতিক্রম করে এসেছিল, তার প্রমাণ তুলে ধরে, উল্লেখ করে, চলতি বছর শুরু থেকে এ ধরনের ১৭টি অনুপ্রবেশ ভারত রুখে দিয়েছে। ভারতের ‘সৌখিন’ যোদ্ধাদের জন্য অপমানজনক।

এমনটা হওয়ার যৌক্তিক কারণও রয়েছে। পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করে ভারত কূটনৈতিক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছে।  পরমাণু বিস্তার এবং তার অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সে পুরোপুরি অবগত। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভালোভাবেই বোঝে, পাকিস্তানে তারা অস্বাভাবিক বৈরিতার মুখোমুখি হয় : দেশটির রাজনৈতিক ভঙ্গুরতা এমন এক মাত্রায় রয়েছে যে, যেকোনো ধরনের ভারতীয় উগ্র ও হুমকিসৃষ্টিকারী আচরণ পাকিস্তানের ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে থাকা উপাদানগুলোকে যথাযথভাবে শক্তিশালী করে ফেলে, যা ভারতের নিজের স্বার্থেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

তবে সংযত থাকার জন্য আরেকটি, যদিও অনেক কম দৃষ্টিগোচর হওয়া, কারণ রয়েছে। সংখ্যা দিয়ে যতটুকু মনে হয়, ভারত সামরিকভাবে ততটা শক্তিশালী নয়। এটা একটা গোলকধাঁধা। দেশটির অর্থনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে তার আন্তর্জাতিক উচ্চাভিলাষ বাড়া এবং তার কৌশলগত অবস্থান উদ্বেগজনক থাকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, ভারত প্রমাণ করেছে, সে সত্যিকার অর্থেই সামরিক শক্তি গঠনে ‘‘বিস্ময়করভাবে অসমর্থ’’।

ভারতের সশস্ত্র বাহিনী কাগজে-কলমে ভালোই দেখা যায়। চীনের পর সে-ই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী, বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিস্থিতিতে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে সে বিশ্বে অস্ত্র আমদানিতে শীর্ষ দেশ হিসেবে বিরাজ করছে। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সব অস্ত্রসম্ভার সে সংগ্রহ করছে। রাশিয়ার যুদ্ধবিমান, ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র, আমেরিকার পরিবহন বিমান, ফরাসি সাবমেরিন আছে তার কাছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও বেশ ভালো কিছু জিনিস উৎপাদন করে। বিশেষ করে বলা যায়, জঙ্গিবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের কথা। তাছাড়া কোচির শিপইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে ৪০ হাজার টনের বিমানবাহী রণতরী।

 

শক্তির ভারসাম্যহীনতা

২০১৫ সালের সামরিক সামর্থ্য

সশস্ত্র বাহিনী

 

সক্রিয় রিজার্ভ আধাসামরিক পরমাণু অস্ত্র
ভারত ১৩ লাখ ১২ লাখ ১৪ লাখ ৯০-১১০
চীন ২৩ লাখ ৫ লাখ ৬ লাখ ২৬০
পাকিস্তান ৬ লাখ            – ৩ লাখ ১০০-১২০

প্রতিরক্ষা বাজেট

বিলিয়ন ডলারে জিডিপির হার
ভারত ৫১.৩ ২.৩
চীন ২১৪.৮ ১.৯
পাকিস্তান ৯.৫ ৩.৪

 

কিন্তু তারপরও ভারতীয় অস্ত্রসজ্জায় বড় ধরনের ফাঁক আছে। সত্যিকার অর্থেই ভারতের অস্ত্রশস্ত্র পুরনো বা অবহেলিত। ‘আমাদের বিমান প্রতিরক্ষা রয়েছে করুণ দশায়,’ বলেন সামরিক বিষয়ক ভাষ্যকার অজয় শুক্লা। ‘সক্রিয় যেগুলো দেখা যায়, সেগুলোর সবই ১৯৭০-এর দশকের পুরনো জিনিস। চমকপ্রদ নতুন কিছু স্থাপন করতে হয়তো আরো ১০ বছর লাগবে।’ প্রায় দুই হাজার বিমান নিয়ে কাগজে-কলমে ভারতের বিমানবাহিনী বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম। কিন্তু ২০১৪ সালে প্রতিরক্ষা প্রকাশনা জেনস ডিফেন্স-এর অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, এগুলোর মাত্র ৬০ ভাগ উড়ার মতো সক্ষম। চলতি বছরের প্রথম দিকের আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমান শাখার গর্ব বিবেচিত ৪৫টি মিগ-২কে বিমানের মাত্র ১৬ ভাগ থেকে ৩৮ ভাগের কাজ করার সামর্থ্য রয়েছে। যে রণতরীটি তৈরি করা হচ্ছে, সেটি থেকে এসব বিমান উড়বে বলে ধরা হচ্ছে। ওই বিমানবাহী রণতরীটি ১৫ বছর আগে অর্ডার দেয়া হয়েছিল, ২০১০ সালে উদ্বোধন করা হবে বলে আশা করা হয়েছিল। সরকারি নিরীক্ষকদের হিসাব অনুযায়ী,  প্রায় ১,১৫০টি পরিবর্তনের পর এখন সেটি ২০২৩ সালের আগে পানিতে ভাসবে বলে মনে হচ্ছে না।

এ ধরনের বিলম্ব কিন্তু মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৮২ সাল থেকে নতুন স্ট্যান্ডার্ড অ্যাসাল্ট রাইফেল চাচ্ছে। কিন্তু আমদানি করা হবে, না দেশেই উৎপাদন করা হবে; অধিকতর ভারী গোলাবর্ষণ না বেশি ক্ষিপ্র- কোনটা হবে- তা নিয়ে অব্যাহত বিতর্কের মধ্যেই বিষয়টা আটকে রয়েছে। সোভিয়েত আমলের জীর্ণ মডেলগুলোর স্থানে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের জন্য ভারতের বিমানবাহিনী ১৬ বছর ধরে বলে আসছে। অতি-উচ্চাভিলাষী সরঞ্জাম, দরদাম, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের কোটা পূরণে প্রায় অসম্ভব হওয়া ইত্যাদি কারণে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর বিদেশীদের দ্বারস্থই হতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। চার বছর আগে ফ্রান্স ১২৬টি রাফায়েল যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি করার অবস্থায় পৌঁছেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা কমতে কমতে নেমে এসেছে ৩৬-এ।

ভারতীয় সেনাবাহিনীরও রয়েছে দুর্নামের ইতিহাস। অতীতেও দুর্নীতি ছিল একটা সমস্যা। বিশ্লেষকেরা সত্যিই ভেবে অবাক হয়ে যান, গেরিলারা কিভাবে দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে বারবার প্রবেশ করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সেইসাথে যোগ হয়েছে জেনারেলদের পদোন্নতির জন্য প্রকাশ্যে আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া, বেতন নিয়ে সোচ্চার হওয়া এবং অফিসারদের ওজন কমানোর নির্দেশ জারির মতো ঘটনাগুলো। গত জুলাই মাসে একটি সামরিক পরিবহণ বিমান ২৯ জন আরোহী নিয়ে বঙ্গোপসাগরে হাওয়া হয়ে গিয়েছে, এখন পর্যন্ত এর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। গত আগস্টে একটি অস্ট্রেলিয়ান পত্রিকা ভারতের নতুন ফরাসি সাবমেরিনের কারিগরি বিষয়াদির বিস্তারিত বিবরণ ফাঁস করে দেয়।

ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আরো বড় সমস্যা হলো কাঠামোগত। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, তিন বাহিনীর প্রতিটিই সত্যিকার অর্থেই সামর্থপূর্ণ। তবে সমস্যা হলো, তারা প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের মতো করে কাজ করে। শুক্লা বলেন, ‘কোনো বাহিনীই অন্য বাহিনীর সাথে কথা বলে না, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক কর্মকর্তারাও তাদের সাথে কথা বলেন না।’ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মন্ত্রণালয়টিতে একজনও সামরিক ব্যক্তি নেই। ভারতের অন্য সব মন্ত্রণালয়ের মতো, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও পরিচালিত হয় পরিবর্তনশীল বেসামরিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে, রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তরা আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়ে ব্যালট বাক্সের দিকেই বেশি নজর দিয়ে থাকেন। মন্ত্রণালয়টির পরামর্শক হিসেবে দায়িত্বপালনকারী অভিজিত আয়ার মিত্র বলেন, ‘তারা সম্ভবত মনে করে, সাধারণ যে কোনো চিকিৎসকই অস্ত্রোপচারও করতে পারেন।’ ক্রমবর্ধমান শাররীক শক্তি সত্ত্বেও ভারতের সশস্ত্র বাহিনী এখনো যথাযথ বুদ্ধি-বিবেচনার অভাবে ভুগছে।