Home » অর্থনীতি » বাংলাদেশ কী আসলেই লোপাট হওয়া অর্থ ফেরত পাবে?

বাংলাদেশ কী আসলেই লোপাট হওয়া অর্থ ফেরত পাবে?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

বারবার ঘোষণা দিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। কি আছে এই প্রতিবেদনে? কেন এত লুকোচুরি? ইত্যাদি প্রশ্ন আজ মানুষের মুখে মুখে। রিজার্ভ চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে কি আছে সে বিষয়ে এখনো কেউ নিশ্চিত নন। এমনকি ফিলিপাইন সরকার, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, অর্থ আদান-প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সুইফট কেউই এ বিষয়ে জানেন না। যদি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশের সূত্র পাওয়া যায় তাহলে ফিলিপাইন, ফেডারেল রিজার্ভ বা সুইট তা থেকে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে; তারা বাংলাদেশের অর্থ ফেরত দিতে চাইবে না; এ বিষয়ে গড়িমসি করবে-বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এমনটিই মনে করেন। তবে রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদনে যদি ভালো কিছু থাকে অর্থাৎ বাংলাদেশের কেউ জড়িত না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তাতে অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে তো কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তবে সেক্ষেত্রে ফেডারেল রিজার্ভ, সুইফট নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টা খুবই স্পর্শকাতর। কারণ এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা বা না করা উভয়ই বিপজ্জনক। একদিকে মানুষ জানতে চায় মূল বিষয়টা কি ঘটেছে। আর তার অগ্রগতিই বা কতদূর। সেটা জানা গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। অন্যদিকে প্রকাশ করলে সমস্যা হবে। প্রথমত, বাংলাদেশের কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকলে চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন হবে। আর দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের দোষ না হলে ফেডারেল রিজার্ভ বা সুইফটের দুর্বলতার কারণে ঘটলে তারা বলবে এটা কেন চট করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলো। এ বিষয়ে তারা খারাপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে। এছাড়া এ বিষয়ে সিআইডি তদন্ত করছে। তাদের তদন্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

রিজার্ভ চুরি বিষয়ে ১৫ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। যার প্রধান করা হয় সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- বুয়েটের কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস। গত ২০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর কাছে অন্তবর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দেন এই কমিটি। ৩০ মে দেওয়া হয় পুরো প্রতিবেদন। এর পর অর্থমন্ত্রী একাধিকবার তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের কথা বললেও সেটি আর প্রকাশ করা হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সরিয়ে নেয় সাইবার অপরাধীরা। এরমধ্যে ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুরুতেই আটকে দেয় এবং পরে তা ফেরত দিয়েছে। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার শাখার কয়েকটি হিসাব থেকে চলে যায় ওই দেশটির ক্যাসিনোতে। ফিলিপাইনের বিভিন্ন সংস্থা চুরি যাওয়া অর্থের কিছু অংশ নানাভাবে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া সেই অর্থের মধ্য থেকে ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার ফেরত পেতে ফিলিপাইনের আদালতে বাংলাদেশের একটি আবেদন বিচারাধীন ছিল। বাংলাদেশের হয়ে আবেদনটি করে ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) ও ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্ষতি দেখানো হয়নি। বরং তা বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়-ব্যয়ের হিসাবে (ব্যালান্সশিট) ‘প্রটেস্টেড বিল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা এক ধরনের শ্রেণীকৃত সম্পদ। এই অর্থ আদায় হওয়া বা না হওয়ার ওপর নির্ভর করে চলতি অর্থবছর শেষে চূড়ান্ত হিসাবে নেওয়া হবে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের উৎসাহ বোনাস গত বছরের তুলনায় ১টি কমিয়ে ৪টি করা হয়েছে। তবে এই বোনাস তারা পাবেন পুরনো বেতন কাঠামোর মূল বেতনের হারে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, চুরি হওয়া রিজার্ভের অর্থ ব্যালান্সশিটে কীভাবে দেখানো হবে বিষয়টি বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) টেকনিক্যাল অ্যাসিট্যান্স মিশনের সঙ্গে গত জুনে বৈঠক করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টেকনিক্যাল অ্যাসিট্যান্স মিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে চুরি হওয়া অর্থ ‘প্রটেস্টেড বিল’ হিসাবে ব্যালান্সশিটে রাখার জন্য বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয়। ফলে পর্ষদ এটি অনুমোদন করে।

পর্ষদ সভায় জানানো হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক (এফআরবি) নিউইয়র্ক শাখায় থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাক হয়ে যায়। এর মধ্যে শ্রীলংকা থেকে ২ কোটি ডলার ফেরত পাওয়া গেছে। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এখনো পাওয়া যায়নি। ওই অর্থ এফআরবির নিউইয়র্ক শাখায় আলাদা একটি হিসাব খুলে ইতোমধ্যে প্রটেস্টেড বিল হিসাবে রাখা হয়েছে, যা অন্যান্য সম্পদের শ্রেণিভুক্ত। সার্বিক বিবেচনায় আইএমএফ টেকনিক্যাল কমিটি সুপারিশে বলেছে, চুরি হওয়া অর্থ তাৎক্ষণিক ক্ষতি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ব্যাংকের ইক্যুয়িটির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এটি করা সমীচীন হবে না। কারণ চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে জোর চেষ্টা চলছে। তাই এখনই ক্ষতি হিসেবে তা দেখানো ঠিক নয়।

আইএমএফের সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির মামলার আর কোনো অগ্রগতি না হলে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে আর কোনো হিসাবায়ন না করে প্রটেস্টেড বিল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে নোট হিসেবে এটি সন্নিবেশন করা যেতে পারে। আগামী অর্থবছর থেকে এর যৌক্তিক হিসাবায়ন করা উচিত হবে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উৎসাহ বোনাস ‘ইনসেনটিভ বোনাস’ ৪টি মূল বেতনের সমপরিমাণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই বোনাস তারা পাবেন পুরনো স্কেলের মূল বেতন অনুসারে। এর আগে পরপর দুই অর্থবছর তাদের ৫টি করে উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে তারা যে বেতন কাঠামো ভোগ করতেন তার মূল বেতনের হারেই তা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের লোপাট হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের সবটাই ঢুকে পড়েছে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতে। ফিলিপাইন সিনেটের বিশেষ কমিটির শুনানির পরে একজন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী রাষ্ট্রীয় তহবিলে ওই অর্থের দেড় কোটি ডলার ফেরত দিয়েছেন। তবে প্রথমে শুনানিতে তিনি বলেছিলেন, তার হাতে পড়েছে সাড়ে তিন কোটি ডলার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই ব্যবসায়ী আর বাকি দুই কোটি টাকা ফেরত দেননি। কাজেই হদিসহীন রয়ে গেছে বিশাল অংকের বাংলাদেশী অর্থ। এই অর্থ উদ্ধারে এখন আর ফিলিপাইন তেমন একটা উদ্যোগী নয়, যদিও ফিলিপাইন সরকারের দিক থেকে নানা ইতিবাচক কথা বলা হয়েছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির ওই বৈঠকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে বলা হয়, নিউইয়র্কের রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ, ইমপোর্ট বিল ও দাতা সংস্থার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়। সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনের (সুইফট) মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থায় এসব পেমেন্ট দেয়া হয়। চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনতে আগষ্ট মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল ম্যানিলা যায়। ফিলিপাইন সরকারের কাছে জমা দেয়া এক ক্যাসিনো মালিকের দেড় কোটি ডলার ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্যই ম্যানিলা যায় প্রতিনিধি দলটি। ফিলিপাইনের বিচার বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিনিধি দলটি অর্থের মালিকানা দাবি করে আদালতে একটি হলফনামা জমা দিয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি। প্রতিবেদনটি আমরা কমিটির কাছে দিতে বলেছি। কমিটির সব সদস্য মনে করেন, ৮ কোটি ডলার যেটা গেছে, সেটা তো গেছে। কিন্তু দেশের ভাবমূর্তি বড় বিষয়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা জরুরি। কারা দায়ী, সেটা বের করতে পারলে অন্যান্য দেশও এ বিষয়ে সজাগ হতে পারবে। রিজার্ভ থেকে খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে’।

গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেয় অপরাধীরা। এর মধ্যে ২ কোটি ডলার যায় শ্রীলংকায়, যা উদ্ধার করা হয়েছে বলে সে সময় জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার শাখার চার হিসাবের মাধ্যমে চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোয়। এরই মধ্যে চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেড় কোটি ডলার বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগষ্ট মাসেই পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছিলেন ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ। কিন্তু সে অর্থও এখনো আসেনি, কবে আসবে বা আসবেনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।