Home » আন্তর্জাতিক » ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কি হবেই?

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কি হবেই?

সিএনএন-এর বিশ্লেষন অবলম্বনে মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ভারত ও পাকিস্তান কি যুদ্ধে নামবে? প্রশ্নটা অনেক দিন থেকেই ছিল স্রেফ কথার কথা, প্রায় অসম্ভব একটা বিষয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দুই দেশই অনেক আগে থেকেই পরমাণু শক্তিধর; আর এটাই সেখানকার ১৪০ কোটি মানুষকে চেপে ধরে আছে। ২০ শতকের হানাহানির ধারাবাহিকতায় উভয় দেশই একাধিকবার যুদ্ধে নেমেছে, আবার তুলনামূলক শান্তির সময়ও অতিবাহিত করেছে।

কিন্তু তারপর?

এখন যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, তাকে নিছক আর অসম্ভব আর চাপাবাজি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, খুবই গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারত দাবি করছে, তারা পাকিস্তান-সংলগ্ন নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালিয়েছে। ঘটনাবলীর ভারতীয় ভাষ্য হলো, তারা একটি সন্ত্রাসী লঞ্চিং প্যাডে হামলা করেছে। আক্রান্ত স্থানটি কোনো সন্ত্রাসী ঘাঁটি ছিল না বলে পাকিস্তান দাবি করেছে। এর প্রমাণ হিসেবে তারা তাদের দুই সৈনিকের নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।

সর্বশেষ যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে তা হলো ১৮ সেপ্টেম্বর ভারত-শাসিত কাশ্মিরে একটি সেনা ঘাঁটিতে হামলায় ১৮ সৈনিকের নিহত হওয়া। ওই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান পরিচালনা-বিষয়ক মহাপরিচালক ঘোষণা করেন, হামলার জন্য দায়ী সন্ত্রাসীরা ‘পাকিস্তানি চিহ্নযুক্ত’ সরঞ্জাম বহন করেছিল।

এই অভিযোগটি সামাজিক মাধ্যমযোগে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং টুইট করেন, ‘পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, একে এই পরিচিতিতেই চিহ্নিত ও নিঃসঙ্গ ও এঘরে করতে হবে।’

ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির মহাসচিব রাম মাধব ফেসবুকের আশ্রয় নেন : ‘একটা দাঁতের জন্য পুরো চোয়াল।’ তিনি দৃশ্যত, ভয়াবহ প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বলেছেন।

ভারতের অনেক টিভি চ্যানেলে ক্রমাগত যুদ্ধের সুর তোলা হতে থাকে, সেটা বাড়তে বাড়তে প্রাইমটাইমের প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়ে পড়ে। ভারতে সবচেয়ে বেশি দেখা হয়, এমন একটি ইংরেজি সংবাদ চ্যানেলের হোস্ট অর্নব গোস্বামী পাকিস্তানের প্রতি তার ক্রোধ প্রকাশ করেন আরো প্রবলভাবে এই বলে : ‘তাদেরকে পঙ্গু করে দেওয়া দরকার, আমাদের উচিত তাদেরকে তাদের হাঁটুর মধ্যে নামিয়ে দেওয়া।’ তার অতিথিদের মধ্যে একজন ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত এক জেনারেল। তিনি আরেক ধাপ এগিয়ে বলেন : ‘আমাদেরকে অবশ্য অ-সন্ত্রাসী পন্থায় পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে হবে।… জাতির একটু স্বস্তি দরকার।’

কিন্তু উভয় দেশে তৈরি হয়ে থাকা পরমাণু অস্ত্র ভান্ডার নিয়ে কী হবে? সেটা ভয় দেখানোর হাতিয়ার হয়েই থাকবে?

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জি ডি বকশির কাছে জবাবটা পরিষ্কার, ‘পাকিস্তান আকারে ভারতের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। আমরা আমাদের অস্ত্র ভান্ডারের অল্প কিছুও যদি প্রয়োগ করি তবে পাকিস্তানি পাঞ্জাব, যেখান থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আসে : ৮০০ বছরে সেখানে আর কোনো ফসল ফলবে না।’ তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘আসুন আমরা নিজেদের ভয় পাওয়া থেকে বিরত থাকি।’

পাকিস্তানও জবাব দিয়ে চলে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সরতাজ আজিজ এক বিবৃতি দিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তারা যেসব ভিত্তিহীন ও দায়িত্বহীন অভিযোগ করছেন তার দেশ সেগুলো সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করছে।’

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র সিএনএনকে বলেন, ভারত-শাসিত কাশ্মিরের পরিস্থিতি থেকে বিশ্বের নজর সরিয়ে নিতে ভারত বেপরোয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি দৃশ্যত কাশ্মিরের বিক্ষোভ ও উত্তেজনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

পাকিস্তানেও উত্তেজনা চলছে। ২০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় এক ভারতীয় সাংবাদিককে সেখান থেকে চলে যেতে বলেছিলেন বলে খবর বেরিয়েছে।

বিরাজমান বাস্তবতা :

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অজয় শুল্কা বলেন, ‘আমরা যে বাগাড়ম্বরতা দেখছি, তা চালিয়ে নেওয়া খুবই সহজ।’ তিনি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার স্ট্যাটেজিক সম্পাদক।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর যে হামলাটি হয়েছে, সেটি পাকিস্তান থেকে হয়েছে বলে যে অভিযোগটি ভারত করেছে, এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। জানুয়ারিতে উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবে ভারতীয় আরেকটি ঘাঁটিতে হামলা হয়েছিল। স্থানটি পাকিস্তান সীমান্ত থেকে বেশি দূরে নয়। তাছাড়া ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার কথা বলা যায়। তাতে নিহত হয়েছিল ১৬৪ জন।

ভারতীয় কর্মকর্তারা এইসব হামলার জন্য পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্কিত করা অব্যাহত রেখেছেন। আর ইসলামাবাদ তাদের যেকোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে।

এ ধরনের যেকোনো হামলার সময়ই কড়া ভারতীয় প্রতিক্রিয়ার দাবি ওঠে। ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় (ভারত) সরকার জনসাধারণের চিৎকারে নয়, বাস্তবতায় চালিত হয়। তারা বোঝে, তারা যদি পাকিস্তানে হামলা চালায়, তা ভারতের অনুকূলে হবে না।’ শুক্লা উল্লেখ করেন, কোনো ধরনের হামলা চালানোর জন্যই কৌশলগতভাবে ভারত প্রস্তুত নয়। তিনি যা বলতে চেয়েছেন, তা হলো ‘পরিকল্পনা-প্রক্রিয়ায় ব্যর্থতা।’ শুক্লার মতে, এই বাস্তবতা কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না যে, পাকিস্তানের রয়েছে বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম সেনাবাহিনী। তিনি বলেন, ‘আমরা ধারাবাহিক সম্পর্কের মধ্যে রয়েছি। যেকোনো ধরনের হামলার যে পরিণতি হবে, তা লোকজন কল্পনাও পারছে না।’

আগের যেকোনো হামলার চেয়ে ১৮ সেপ্টেম্বরের হামলাটি ছিল সম্ভবত ভিন্ন। কারণ এবার প্রতিশোধ গ্রহণের দাবিটি ওঠেছে খোদ ভারত সরকারের ভেতর থেকে। ফলে মুখ রক্ষার জন্য হলেও কিছু একটা করা দরকার হয়ে পড়েছে।

ভারতীয় বিক্ষোভকারীরা ১৯ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কুশপুত্তলিকা দাহ করে।

ভারতে যে বাগাড়ম্বরতা চলছে, তা পাকিস্তান লক্ষ করছে। ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক মোশাররফ জাইদী, যিনি একসময় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি বলেন, ‘ভারতে যে ব্যথা ও ক্রোধের আবেগ দেখা যাচ্ছে, তা বোধগম্য। কিন্তু হামলার মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা যে, হামলাকারীরা জৈশ-ই-মোহাম্মদের এবং গ্রুপটি পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের সাথে সম্পর্কিত- তা পুরোপুরি কান্ডজ্ঞান-বহির্ভূত, পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে পরিহাসমূলক বিষয়।’ জাইদী বলেন, পাকিস্তান হয়তো ১৯৯০-এর দশকে কাশ্মিরে সক্রিয় গ্রুপগুলোর প্রতি সমর্থন দিত, কিন্তু পাকিস্তান সে পথ থেকে অনেক আগেই সরে এসেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান প্রকাশ্যে যে বক্তব্য রাখছেন, পাকিস্তানের নীতি এখন পুরোপুরি সে অনুযায়ীই চলছে। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালে এটা হবে আত্মঘাতী নীতি। পাকিস্তান এখন তার অর্থনীতি জোরদার করার চেষ্টা করছে। দেশটি এখন নিজেকে চীনের মতো দেশের জন্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।’

পাকিস্তানকে নিঃসঙ্গ করার ভারতের কঠোর বক্তব্য উভয় পক্ষের যুদ্ধবাজদের জন্য হবে পোয়াবারো। জাইদির মতে, এ ধরনের বক্তব্য যুক্তির কথাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তবে সবশেষ খবর হচ্ছে, সীমান্তে উত্তেজনা এড়াতে দুই দেশের দুই নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেলিফোনে আলোচনা করেছেন।

বৈশ্বিক কূটনীতি :

কয়েক দশক নয়া দিল্লী পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোর নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিল। দেশটি ছিল জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠা। লক্ষ্য ছিল দেশটিকে পরাশক্তির প্রভাব থেকে দূরে রাখা। কিন্তু সদ্য কারাকাসে অনুষ্ঠিত ন্যাম সম্মেলনে ১৯৬১ সালের পর প্রথমবারের মতো দেশটির প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব ছিল না। এর বদলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত থাকতে চেয়েছেন। ২০১৪ সালের পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে তার আটবার সাক্ষাত হয়েছে, ২০১৬ সালে এখন পর্যন্ত তিনবার।

মোদির পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্টভাবে অনেক বেশি গোছালো ও সিদ্ধান্তসূচক। সম্ভবত এই কারণেই তার সমর্থকেরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অনেক বেশি শক্তিপ্রদর্শনমূলক পদক্ষেপ আশা করে।

তবে ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই পুরোপুরি আচ্ছন্নকারী বিষয় হচ্ছে প্রবৃদ্ধি, কিন্তু যুদ্ধ নয়; আর সেটাই গত কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানকে আক্রমণ করার গণদাবির প্রতি ভারত কর্ণপাত করেনি এবং তা তার কৌশলতগত স্বার্থকে ভালোভাবেই রক্ষা করেছে।

সম্প্রতি প্রভাবশালী পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৮১ ভাগ ভারতীয় মোদির প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে, ৬১ ভাগ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার পদক্ষেপকে সমর্থন করে; আর ৭৩ ভাগ ভারতীয় পাকিস্তানের প্রতি বিরূপ, ৫৬ ভাগ দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার পক্ষে।

বিশ্বের বেশির ভাগই আশা করে, মোদি জরিপের সংখ্যাটির দিকে নজর দেবেন, জ্বালাময়ী বক্তৃতা বা সামাজিক মাধ্যমের প্রতি নয়।