Home » প্রচ্ছদ কথা » আরেক ধরনের পাইকারী হত্যাকান্ড

আরেক ধরনের পাইকারী হত্যাকান্ড

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

তাজরীন ফ্যাশনস, রাণা প্লাজা, থেকে টাম্পাকো। এ আরেক ধরনের পাইকারী হত্যাকান্ড। মধ্যযুগে যেমন মৃত্যুকূপে ফেলে মানুষকে হত্যা করা হতো, সে রকম নানা নামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এই দেশে শ্রমিকদের জন্য হয়ে উঠছে যেন মৃত্যুকূপ। ব্যবসায়ী নামক কতিপয় অর্থপিশাচের লোভের বলি হয়ে ফি- বছর এই দেশে ধ্বসে পড়ে, চাপা পড়ে, আগুনে পুড়ে, বারুদে ঝলসে মারা যায় মানুষ। দেখ-ভালের কেউই নেই। আছে, তবে তারা মালিকের রক্ষক, জনগনের তো নয়ই। সেজন্যই বছরের পর বছর মারা পড়া হতভাগা মানুষগুলির পরিবার-পরিজন কোন নিরাপত্তা পায়নি-কারো কাছ থেকে।

মালিক পক্ষ এবং যারা দেশ চালান তারা যখন ঈদ আনন্দে মাতোয়ারা, সাধারনরা ঈদ যাত্রায় পথের দুর্ভোগ সয়ে পরিবারের সাথে মিলন প্রত্যাশী-কোরবানীর পশুর রক্তপ্রবাহে উদ্বেলিত, হায় কে রাখে কার খোঁজ! ওই সময়টিতেই টঙ্গীতে জ্বলছিল টাম্পাকো ফুয়েলস লিমিটেডের কারখানা। হতভাগ্যরা আগুনে পুড়ে ভর্তা হচ্ছিল। ৩৪ জনের অধিক মানুষের দগ্ধ লাশ বের করে আনা হয় আগুন থেকে। সবশেষ খবর, ৩৯জন মারা গেছে। হাসপাতালে ভর্তি আরো অগুনতি। দুর্ঘটনার এতদিনেও শেষ হয়নি উদ্ধার তৎপরতা। স্বজনদের আর্ত আহাজারিতে ভারি বাতাস। পশুতে-মানুষে যেন তফাৎ নেই।

মালিক পক্ষের হাজারো অব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রের নতজানু ও দুর্বল নজরদারির কারনে রাণা প্লাজা থেকে টাম্পাকো দুর্ঘটনায় আদম সন্তানের বীভৎস মৃত্যু বিবেকবানদের বিপন্ন করে দিয়েছে। একি মৃত্যু না গণহত্যা! ফায়ার সার্ভিস সর্বশক্তি দিয়ে স্বল্পসময়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনতে পারেনি। সময় লাগছে অনেক দিন, তারপরেও পুরোপুরি নয়। ফায়ার সার্ভিসের অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের সক্ষমতাই এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। আগুন নিভেছে একসময়, ধ্বসিয়ে দিয়েছে আশ-পাশ, বেঁচে যাওয়াদের ঝলসে যাওয়া দেহ, দগদগে ক্ষত মুছবে কিভাবে!

এরকম একটি কারখানার ভয়াবহ আগুন যে পানি বা গ্যাস দিয়ে নেভানো সম্ভব নয়, আরো আধুনিক প্রযুক্তি দরকার, তা কর্তৃপক্ষের ৩৪টি লাশের বিনিময়ে জেনেছে। কিন্তু এ জানার বিষয়টি তারা ভবিষ্যতে কাজে লাগাবে, নাকি সনাতনী ধারায় চলবে-এই বিষয়টি মোটেই পরিষ্কার নয়। ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পরেও কারখানা থেকে নিখোঁজদের এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আরো অনেক ঘটনার মত সম্ভব হবে না, আত্মীয়-পরিজনরা এটি জেনে গেছেন। এখন অসহায় অপেক্ষা, কোন ক্ষতিপূরন বা আইনী সুবিচার তারা পাবেন কিনা?

উদ্ধার তৎপরতায় এই যে সক্ষমতার অভাব সবসময় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ায়। কিন্তু তাতে কি? মালিক পক্ষের কেউ তো আর ক্ষতির শিকার হয় না। রবীন্দ্রনাথের “সামান্য ক্ষতি” কবিতার কথা মনে আছে? সেখানে মাঘের শীতে রাণী স্নান করে শত সখী পরিবৃত হয়ে আগুন পোহাবেন বলে গরিবদের কুটিরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। রাজা ছিলেন সদাশয়, শাস্তিস্বরূপ রাণীকে করেছিলেন ত্যাগ। কিন্তু এ রাষ্ট্র তো গরীব-সাধারনের পক্ষে নয়, সুতরাং মালিক পক্ষ ‘সামান্য ক্ষতি’ করলেও  আখেরে আইনও তাদের কিছু করতে পারে না।

বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, বার বার এরকম বীভৎস ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে মেনে নেয়া হবে? এটিকে নিছক দুর্ঘটনা থাকবে, নাকি পাইকারী হত্যাকান্ড হিসেবে অভিহিত করা হবে? রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা, মালিকদের সীমাহীন লোভ-অবহেলার কারনে বছরের পর বছর যে প্রাণহানিগুলো ঘটছে সেগুলি তো আসলে এক ধরনের মুনাফালোভী হত্যাকান্ড! আরো বড় প্রশ্ন, আগামীতে কি অপেক্ষা করছে? দেশের অনিরাপদ শিল্প-কারখানাগুলি কবে কর্মরতদের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠবে?

শিল্প-কারখানা দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানির ঘটনা তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। তথ্য জানাচ্ছে, গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বেশিরভাগ বাংলাদেশে। ২০০৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সারাবিশ্বে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বড় রকম ছয়টি দুঘটনার তিনটিই এই দেশে। এই দশকে শিল্প দুর্ঘটনায় নিহত এক হাজার ছয়’শ জনের মধ্যে এক হাজার দুই’শ জনই এই দেশের। সে হিসেবে নিহতের আশি শতাংশ হতভাগ্য বাংলাদেশের।

শিল্প-কারখানা দুর্ঘটনার নামে এই পাইকারী হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে সাধারন মানুষ ও দেশকে। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে রাস্তায় নামে পরিজনরা, সামনে নিয়ে অনিশ্চিত দিন-রাত। দেশের ভাবমূর্তি হয়ে পড়ে কালিমালিপ্ত। বিনিয়োগের সম্ভাবনা নষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক মহল রপ্তানির ক্ষেত্রে চাপিয়ে দেয় নানা বিধি-নিষেধ। কোন কোন দেশ রাজনৈতিক স্বার্থেও ব্যবহার করে এসব ঘটনা। অন্তিমে যাই ঘটুক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারন খেটে খাওয়া মানুষ।

স্পেকট্রাম, তাজরীন, রাণা প্লাজা মাঝখানে ছোট-খাট অনেকগুলো এবং সবশেষ টাম্পাকোর ঘটনা বলে দিচ্ছে এরকম মৃত্যুকূপ আরো অনেক থাকতে পারে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এরকম ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। এগুলিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালানো অপপ্রয়াস মনে করিয়ে দেয় নিদারুন অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কথা। যদি পাঁচ বছর বা তারও পরে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে তাহলে তা দুর্ঘটনা হতেও পারে। মনে আছে, রাণা প্লাজার ঐ ঘটনার পর পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজেএমইএ কবুল করে নিয়েছিল যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে ২০৫ টির মত দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বর্তমান জাতীয় সংসদের শতাধিক সদস্য বিভিন্ন শিল্প-কারখানার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিক। রাষ্ট্র যদি সংসদে শিল্প-কারখানার নিরাপত্তায় বিশেষ কোন আইন করতে চায়, তাহলে সংসদের তিন ভাগের এক ভাগ সদস্য চাইবেন না যে, এমন আইন হোক- যা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এই এক ভাগের সাথে অন্য সংসদ সদস্যদের আর্থিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তাদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরী করে দেয়। এজন্যই রাষ্ট্র ব্যর্থ। কারখানা নিরাপত্তার জন্য আইন রয়েছে। আইন ভাঙ্গা হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শাস্তি হচ্ছে না।

সাধারন ধারনা হচ্ছে, এ ধরনের দুর্ঘটনায় রাষ্ট্র, মালিক, শ্রমিক-সকল পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু বাস্তবে সব মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না। দু’একজন ক্ষতির সম্মখীন হচ্ছেন। উদাহরন, তাজরীন গার্মেন্টস মালিক। মালিকরা হচ্ছেন পুঁজির ধারক। রাষ্ট্র এই পুঁজির পাহারাদার। কার্ল মার্কস বহুকাল আগে বলে গেছেন, মালিকের উৎপাদনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা। শ্রমিক কল্যাণ বা মানবকল্যাণ, কোনটিই নয়। সেজন্যই তার কাছে হিসেব হচ্ছে মুনাফার, শ্রমিকের জীবন নয়।

পুঁজির বিবেচনায় মালিক নিশ্চিত হতে চান, মুনাফার পরিমান কত আসবে! যদি বিনিয়োগ থেকে ১০ শতাংশ মুনাফা আসে, ভাল। যদি ৫০ শতাংশ আসে, তাহলে ঐ মালিক ফাঁসির দড়িতে লটকে যাবার মত ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় না। এটি এখন আমাদের রাষ্ট্রেও প্রবল হয়ে উঠেছে। এখানেও মালিকরা বিবেচনা করছেন, কারখানার ১০ শতাংশ শ্রমিক কথিত দুর্ঘটনায় মারা গেলে কি পরিমান ক্ষতিপূরণ গুনতে হতে পারে!

এই ক্ষতিপূরণের পরিমান যদি তার মুনাফার চেয়ে কম হয় তাহলে শ্রমিকের জীবন গুরুত্ব পায় না। মালিক তখন বিবেচনায় নেন, শ্রমিক মরলে মুনাফা থেকে কিছুটা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর মারা না গেলে মুনাফার পুরোটাই তার। যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে উদাহরন রয়েছে, কারখানায় প্রতি বছর তিনজন শ্রমিক মারা পড়তে পারে। তিনজনের জন্য ৫০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। কিন্তু ঐ তিনজন যদি বছরে কারখানার মুনাফার এক লাখ ডলার নিশ্চিত করতে পারে তাহলেও ক্ষতিপূরণ দেবার পরে ডলার উদ্বৃত্ত থাকছে। আর মারা না গেলে পুরোটাই মুনাফা। এই নগদ লাভের স্বার্থে মালিক পক্ষ ভয়াবহ ঝুঁকি নিতেও পিছ পা হচ্ছেন না।

এই দেশেও এখন মুনাফার হিসেব-নিকেষ প্রধান হয়ে উঠছে। মালিক পক্ষ উৎপাদন এবং সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধ্বসে পড়া, আগুনে পুড়ে যাওয়া বা যে কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে তারা শতাংশের হিসেব কষেণ। ধরা যাক, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা শতাংশের চারভাগ। বাকি ৯৬ ভাগ তাদের ভরসা হওয়ার কারণে মুত্যুকূপের মত ঐসব শিল্প-কারখানা টিকে আছে। এখানে প্রত্যাশিত মুনাফার তুলনায় ঝুঁকির বিষয়টি নগন্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ কারণেই আইন এর প্রয়োগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আইনের দুর্বলতা নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, সবলতা নিয়ে ততটা হয় না। মূলত: প্রয়োগের অভাবে। এখানে সবকিছু নির্ভর করে নির্বাহী আদেশের ওপর। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া প্রায় কোন ঘটনায় নড়া-চড়া লক্ষ্য করা যায় না। রাণা প্লাজা ট্রাজেডির পর মালিককে গ্রেফতার, উদ্ধার তৎপরতার সমন্বয়-সবকিছুতেই লেগেছিল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, এটি অব্যাহত আছে এখনও প্রায় সব ব্যাপারেই।

এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা তৈরী হয়েছে এই রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই। সর্বোচ্চ নির্বাহীর দিকে তাকিয়ে থাকেন সবাই। কারণ, রাষ্ট্র-সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার তৈরীর বদলে ব্যক্তির ওপর সব দায় চাপিয়ে দিয়ে বসে থাকে। রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটি যে সম্ভাবনা নয়, বরং সংকট-সেটি বার বার প্রমানিত হয়েছে। ‘চেইন অব কমান্ডে’র অভাব মূলত: এই নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয় সর্বোচ্চ ব্যক্তির দিকে। এর উৎস কি আমাদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ? নাকি চর্চা-অভ্যাস, আনুগত্য বা চাটুকারিতার সব আমলের নিট ফলাফল?