Home » বিশেষ নিবন্ধ » বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(চতুর্থ পর্ব)

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(চতুর্থ পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষণের প্রয়োজন নেই আহমদ ছফা’র। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির বক্তা অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হিন্দু পুনর্জাগরণবাদের পাশাপাশি মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটেছিল। একদিকের প্রধান প্রবক্তা বঙ্কিম, অন্যদিকে নবাব আবদুল লতিফ (১৮২৬-১৮৯৩) ও সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৮-১৯২৮)। ফরিদপুরের সাধারণ ঘরে জন্মগ্রহণকারী আবদুল লতিফ ছিলেন সরকারের আমলা (বঙ্কিমের মতোই)। ব্রিটিশরাজ তাঁকে নবাব খেতাবে ভূষিত করেছিল। ব্যারিস্টার সৈয়দ আমীর আলী ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মুসলিম বিচারপতি। ১৮৬৩ সালে নবাব আবদুল লতিফ এবং ১৮৭৮ সালে সৈয়দ আমীর আলী যথাক্রমে ‘ক্যালকাটা মোহামেডান লিটেরারি সোসাইটি’ এবং ‘ন্যাশনাল মোহামেডান এসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ইংরেজির চর্চা হত এবং বাংলা ভাষা প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। মুসলিম জাতীয়তাবাদের উৎস সন্ধান করা হত বাংলাদেশের মাটিতে নয়, আরব ইরান ইরাক মধ্য এশিয়ায়। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘নবাব আবদুল লতিফ সেই ধারার মুখপাত্র যে ধারা বিংশ শতাব্দীতেও বাহাস করেছে বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা কি তাই নিয়ে।’ (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, উনিশ শতকে বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ, পৃ. ৮২। )

এই ধারারই প্রতিনিধিত্বকারী দল ছিল মুসলিম লীগ। ১৯০৫ সালে ইংরেজ শাসকদের মদদে এই সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল দলটি গঠিত হয়েছিল ঢাকায়। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও ধনাঢ্য ব্যক্তি ইসমাইলিয়া শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা আগা খান ছিলেন এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা। এখানে উল্লেখ্য যে একই বৎসর ব্রিটিশের মদদে হিন্দু মহাসভাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্পষ্টতই ব্রিটিশ সাম্প্রাজ্যবাদ চেয়েছিল হিন্দু-মুসলমানের বিভাজনকে কাজে লাগাতে তাদের শাসনের স্বার্থে।

হিন্দু মুসলমানের মধ্যে কি সত্যিই বড় রকমের বিভাজন ছিল? এতক্ষণ যে আলোচনা করা হল, ইসলাম ধর্মের উদ্ভবের প্রেক্ষাপট এবং হিন্দু মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম ও সাধারণ সংস্কৃতি নির্মাণের ঐতিহ্য তা তো সে কথা বলে না। বস্তুত বিভাজনটি প্রকট হয়ে ওঠে উনবিংশ শতাব্দীতে যখন হিন্দু পুনর্জাগরণবাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ পাল্টাপাল্টি দাড়িয়ে যায়। তাও এইসব ছিল শিক্ষিত হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে। কৃষক সাধারণের মধ্যে ধর্মীয় আচরণে কিছু বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও সংগ্রাম ও সংস্কৃতি রচনায় ভেদাভেদ চোখে পড়ে না। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী-উপরে উল্লেখিত গ্রন্থে-বলেছিলেন, ‘ওদিকে বাঙালী মুসলমানের যে বিরাট অংশ ছিলেন অক্ষরজ্ঞান বর্জিত তাদের পক্ষে সাহিত্যে থাকা না থাকা সমান কথা।’ এর পরপরই তিনি আরও লিখছেন, ‘এরই মধ্যে থেকে একজন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২) যে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন সে এক বিস্ময়কর ঘটনা বৈকি।’ (ঐ, পৃ. ৮২।)

মীর মশাররফের উল্লেখ আছে আহমদ ছফার প্রবন্ধেও। তাছাড়াও মীর মশাররফ বিশেষভাবে আলোচিত হবার দাবি রাখেন। তবে তার আগে দেখা যাক উনবিংশ শতাব্দীতে আর কোন কোন মুসলমান লেখক ছিলেন। মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষা লাভ করেছেন পরে। তার মধ্যে সম্ভ্রান্তরা আবার বাংলা ভাষাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। ফলে আধুনিক বাংলা ভাষা সাহিত্যে মুসলমান কবি সাহিত্যিকদের অবদান এত সামান্য। এমনটা কিন্তু মধ্যযুগে ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীতে অবশ্য মুসলিম নারী কবিও ছিলেন, যেমন তাহেরুন্নেসা । মুসলমান কবি সাহিত্যিক যাঁরা ছিলেন তাঁদের রচনা উচ্চমানের ছিল না।

হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কবিরা মাইকেলের অনুকরণে মহাকাব্যও লিখেছেন। কারো রচনাই উঁচু মানের নান্দনিক উৎকর্ষ দাবি করতে পারে না। এখানে আরও লক্ষণীয় যে মাইকেল যেভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানবিক ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তেমন মনের উদারতা দেখাতে পারেননি অন্যান্য মহাকাব্য রচয়িতারা। হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩) লিখেছেন ‘বৃত্রসংহার কাব্য’ যেখানে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর অবশ্য অন্য কবিতা আছে যেখানে হিন্দু মুসলমানের ঐক্য কামনা করেছেন। নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯) তিনটি মহাকাব্য লিখেছেন, যার কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীকৃষ্ণ এবং এই ত্রয়ীকাব্যে হিন্দু ধর্মবোধ বিশেষভাবে প্রতিফলিত। যোগীন্দ্রনাথ বসু দুইটি মহাকাব্য লিখেছেন ‘পৃথ্বীরাজ’ ও ‘শিবাজী’ যেখানে হিন্দুর গৌরবের ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে।

তাঁদের বিপরীতে মুসলমান কবি কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২) ‘মহাশ্মশান’ কাব্য মুসলমানদের বিজয়গাথা বর্ণনা করেছেন, যদিও একই সঙ্গে কবি দেখাচ্ছেন যে যুদ্ধ ভয়াবহ এবং চূড়ান্ত বিশ্লেষণে কোন পক্ষই জয়ী হয় না। কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী আরব মুসলমানদের দ্বারা স্পেন বিজয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী বর্ণনা করেছেন ‘স্পেনবিজয় কাব্যে’। হামিদ আলী (১৮৭৫-১৯৫৪) লিখেছেন কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘কাসেমবধ কাব্য’। এছাড়াও ‘জয়নালোদ্ধার’ ও ‘সোহরাববধ কাব্য’ এবং মুসলমানদের লেখা অন্যান্য অনেক কাব্যেই ইসলামী ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ছিল। এককথায় হিন্দু মুসলমান কবিরা, বিশেষ করে মহাকাব্য রচয়িতারা বিষয়বস্তু নির্বাচনের দিক দিয়ে দুইভাবে বিভক্ত ছিলেন।

এমন পরিবেশে মীর মশাররফ হোসেন নিশ্চিতভাবেই ব্যতিক্রম ও মহান। তিনিও কারবালাকে কেন্দ্র করে উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু সেখানে ধর্মপ্রচারের চেয়ে মানব চরিত্র ফুটিয়ে তোলাই লক্ষ্য ছিল। দুইটি দিক দিয়ে উনবিংশ শতাব্দীর অনেক সাহিত্যিকের চেয়ে মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন একেবারে ভিন্ন। তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা ও জমিদার-বিরোধিতা তাঁকে স্বাতন্ত্র্য ও মহত্ব দান করেছে। তাঁর লেখা ‘জমিদার দর্পণ’ নাটক জমিদার-বিরোধী মনোভাবের পরিচায়ক। এই নাটকে তিনি হিন্দু ও মুসলমান উভয় জমিদারকে ‘জানোয়ার’ বলেছেন। অনেক আগে মাইকেল হিন্দু জমিদারের মুসলমান নারীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টিকে তীব্র সমালোচনা করেছেন তীক্ষ্ম ও ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় (‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ নাটকে)। মীর মশাররফের ‘গো-জীবন’ গ্রন্থটি ছিল অসাধারণ রচনা, কত উদার, কত অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় বহন করে। তিনি যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন অথবা পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ ‘গোরা’ উপন্যাসে যে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষের আবেদন জানিয়েছিলেন তা যদি হিন্দু-মুসলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা অনুধাবন ও অনুসরণ করতেন তা হলে হয়তো আমাদের দেশের ইতিহাস অন্যরকম হত।

মীর মশাররফ হোসেন অবশ্য শেষজীবনে কিছু ধর্মপুস্তক লিখেছেন। তবে তা উন্নতমানের নয়। সে যাই হোক, মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক মানুষ এবং সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িকতা প্রচার করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীতে স্বল্পসংখ্যক হিন্দু লেখকের মতো স্বল্পসংখ্যক মুসলিম লেখকও ছিলেন যারা সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতেন ও প্রচার করতেন। যেমন মেদিনীপুরের শেখ আবদুল লতিফ (নবাব আবদুল লতিফ নন) মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মীয় বিষয় আলোচনা করেছেন। তিনি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সাম্যের বাণী প্রচারের চেষ্টা করেছেন। রামমোহনের সমসাময়িক আবদুর রহিম দাহরি (১৭৮৬-১৮৩৩) ছিলেন খুবই পন্ডিত ব্যক্তি। তিনি কলকাতায় বসবাস করতেন যদিও তাঁর জন্মস্থান ছিল উত্তর প্রদেশে। দর্শন, গণিত, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি বহুবিধ বিষয়ে তাঁর লেখা গ্রন্থ ছিল। তিনি ঘোষিত নাস্তিক ছিলেন।

মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদসিন্ধু’ উপন্যাসের সমালোচনা করেছেন আহমদ ছফা। তিনি বলেছেন মুসলমানের লেখা ‘শহীদে কারবালা’ পুথিতে কারবালার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে পুথিলেখক আজগুবি তথ্য জুড়ে দিয়েছেন। পুথিলেখক আরবদেশে এক ব্রাহ্মণ পরিবার আবিষ্কার করেন। হজরত হোসেনের ছিন্ন মস্তকের মুখ থেকে কলেমা বের হয়েছিল যা পড়ে ঐ ব্রাহ্মণ পরিবারের সকল সদস্য মুসলমান হয়েছিল। ইসলাম ধর্মের মহিমা কীর্তনের জন্য এই যে কসরত তাকে অতি নিম্নমানের সংস্কৃতির লক্ষণ ছাড়া আর কি বলা যায়? ‘জঙ্গনামা’ পুথিতেও এই রকম অজস্র আজগুবি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যাবে। আহমদ ছফা বলছেন, ‘বৌদ্ধ জাতক’ থেকে শুরু করে ‘শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ অথবা মঙ্গলকাব্যেও এমন আজগুবি জিনিস পাওয়া যাবে যার উদ্দেশ্য ছিল নিজ নিজ ধর্মের মাহাত্ম্য প্রচার করা। আহমদ ছফা অভিযোগ করেছেন ‘শহীদে কারবালা’ পুথির সেই আজগুবি গল্প একইভাবে মীর মশাররফের ‘বিষাদসিন্ধু’ উপন্যাসে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই রকম উদ্ভট কাহিনী বলা এবং স্বধর্মের মহিমা প্রচারের ধরনটি মীর মশাররফের চরিত্রের সঙ্গে যায় না, কারণ তিনি পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক ও বাস্তববাদী।

তবে মীরের এই সমালোচনা মুনীর চৌধুরীও করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পুথির জীবনছবি মধ্যযুগীয় অজ্ঞানতা, ধর্মভীতি এবং অলৌকিকতামন্ডিত। যেখানেই এই পুথির প্রভাব পড়েছে সেখানেই এই অন্ধকার ছায়া ফেলেছে। এই আচ্ছন্নতা এতই সংক্রামক যে পুথির অনুসরণকারী বিদগ্ধ কবি-সাহিত্যিকরা পর্যন্ত একে এড়াতে পারেননি।’… ‘জনৈক গবেষক প্রচার করেছেন যে জঙ্গনামা পুথির শেষাংশে এবং মীরের বিষাদসিন্ধুর উত্তর পর্বে সত্যতার বিশেষ কিছু নেই। যেন উভয় গ্রন্থের পূর্বাহ্নেই ইতিহাস অটুট। … মীর সাহেব ‘বিষাদসিন্ধু’র প্রথমার্ধেও ইতিহাসকে উপেক্ষা করেছেন। কিন্তু করলেও তিনি উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন, রূপকথা বা পুঁথি বানাননি। উদ্ধার পর্বে শিল্পী মীর প্রকৃতই পতিত।’ (মুনীর চৌধুরী, ‘মীর মানস’।)

আমার মতে, পুথির বয়ান ও পুথির দৃষ্টিভঙ্গিকে খুব বড় করে দেখা সঠিক হবে না। পুথি ছাড়াও বেশ কিছু হিন্দু-মুসলমান কবি-লেখকদের রচনায় স্বজাতিগর্ব, ভিন্নধর্মের প্রতি বিদ্বেষ যে দেখা গেছে তা অস্বীকার করা যাবে না। পাশাপাশি সেকুলার, উদার ও অসাম্প্রদায়িক সাহিত্যও যে ছিল সেটাও তো মিথ্যা নয়। আমি আবার সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে চাই যে শ্রমজীবী বাঙ্গালি মুসলমানের সহজাত প্রবৃত্তি হল অসাম্প্রদায়িকতা, উদারতা, মানবিকতা ও পরমত-সহিষ্ণুতা। মধ্যপ্রাচ্যের মতো ধর্মীয় মৌলবাদ কখনই বাংলার মাটিতে স্থান করে নিতে পারবে না।