Home » বিশেষ নিবন্ধ » ছাত্রলীগ কী আসলেই অপরাধ করে না ?

ছাত্রলীগ কী আসলেই অপরাধ করে না ?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ক্ষমতাসীন দল বা অঙ্গসংগঠনসমূহের নেতা-কর্মী যখন কোন অপরাধ সংঘটন করে তখন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ ও নেতৃবৃন্দের মুখে গৎবাঁধা কতগুলো বাক্য উচ্চারিত হয়। “অপরাধী যে দলেরই হোক শাস্তি তাকে পেতেই হবে। ছাত্রলীগ ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। ছাত্রদল-ছাত্রশিবির থেকে আগত অনুপ্রবেশকারীরা এসব অপরাধ করছে”। গত আট বছরে ছাত্রলীগ নামধারীদের শত শত অপরাধ দু’চারটে ব্যতিক্রম বাদে বাগাড়ম্বরের আড়ালেই চাপা পড়ে গেছে। তদন্ত-অনুসন্ধান এগোয়নি, বিচারের সম্ভাবনা তো সূদুর পরাহত।

গত ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, খাদিজা হামলার বিচার হবেই। তার মতে, “এখানে কোন দলীয় কোন্দল ছিল না বা দল হিসেবে কেউ মারতে যায়নি। কে কোন দল করে আমি সেটা দেখি না বা দেখব না। যে অপরাধী সে অপরাধীই। কিছু লোক ও মিডিয়া এটিকে দলীয় হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করছে, দলীয় হিসেবে আমরা প্রশ্রয় দিচ্ছি না”। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য যে কোন নাগরিককে আশ্বস্ত করতে পারতো, যদি সারা দেশে ছাত্রলীগ নামধারী নেতা-কর্মীদের কৃত অপরাধগুলি আইনের আওতায় বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতো।

প্রধানমন্ত্রী মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখে সংসদে যুগপৎ দুঃখ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। “একটি ছেলে একটি মেয়েকে নির্মমভাবে কোপালো। এত মানুষ দাঁড়িয়ে দেখেছে, ছবি তুলেছে”। প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ, হতাশা নিশ্চয়ই নাগরিকদের ছুঁয়ে যাবে। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটে মেয়েটির সাথে সেলফি তুলেছেন যুব মহিলা লীগ নেত্রী অপু উকিলসহ আরো কয়েকজন; যদিও ফেসবুকে তা প্রকাশের পরে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় তারা এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। অন্যদিকে, ঘাতক বদরুলের মা ‘‘ছেলের অপরাধের বিচার চেয়েছেন’’। সন্দেহ নেই, ঘটনার এপিঠ-ওপিঠ দুই-ই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে সবকিছুই বিবেচনা করতে হবে, কি কারণে মূল্যবোধগুলি হারিয়ে যেতে বসেছে।

এই দেশের মানুষ সামাজিক-রাজনৈতিক- নির্বাচনী তান্ডবে খুন, রক্তপাত, দখল, রাহাজানি, লুন্ঠন দেখে দেখে অসাড় হয়ে আছে। বোধশূন্য হয়ে পড়ছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত অপরাধের খবর স্বাভাবিক ও সহনীয় মাত্রা অর্জন করেছে। তারপরেও রাণা প্লাজার মত মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগসহ অনেক ঘটনায় মানবতা ও মূল্যবোধের বড় নির্দশনগুলো চোখের সামনে আছে। এখনো নানা দৈব-দুর্বিপাক ও সংকটে মানুষ এগিয়ে আসে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কৃত অপরাধের ক্ষেত্রে মানুষের নির্লিপ্ততার মূল কারণ হচ্ছে, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা।

সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব অপরাধ প্রসঙ্গে  যেটি মনে করেন, তাও বলেছেন অকপটে। তার মতে, “এভাবে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা শিখিয়েছে বিএনপি-জামায়াত। এরাই পথ দেখিয়েছে। নৃশংসতা করে করে মানুষের ভেতরে একটা পশুত্বের জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে একমত হলে বলতে হবে, ২০১৩-১৪ ও ২০১৫ সালে আন্দোলনকালে পেট্রোল বোমায় জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার বীভৎসতার তুলনাই হয় না। এই দায়ে বিএনপি-জামায়াত অভিযুক্ত। আবার নাশকতার দায় থেকে ছাড়া পেতে আওয়ামী লীগ নেতারা সনদ দেয়ার পাশাপাশি দলেও বরণ করেছেন অনেক বিএনপি-জামায়াত নেতা কর্মীকে ।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একমত হলে মানতে হবে, ছাত্রলীগ নামধারী যেসব নেতা-কর্মী হত্যাসহ নানা অপরাধে লিপ্ত, বিএনপি-জামায়াতই তাদের এই নৃশংসতা শিখিয়েছে। পথ দেখিয়ে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের এতটাই বেপরোয়া করে তুলেছে যে, গত আট বছরে তারা আন্ত:কোন্দলে খুন করেছে ১৭৫ জনকে। এটি অবশ্য ২০১৪ সাল পর্যন্ত পত্র-পত্রিকার হিসেব মতে পরিসংখ্যান। মাতৃজঠরের শিশুও নিস্তার পায়নি তাদের বর্বরতার হাত থেকে। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে অপরাধীর শাস্তির কথা বলছেন বটে, কিন্তু দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বক্তব্যের সাথে বাস্তবের মিল নেই।

২০০১-০৬ মেয়াদে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, খুন-গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং অবশ্যই গ্রেনেড হামলায়ও বিএনপি-জামায়াত অভিযুক্ত। আইন-আদালতের বিচারে এই অভিযোগসমুহ এখনও প্রমানিত নয়। কিন্ত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ প্রতিটি ঘটনায় বিচার চায়। যেমনটি অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৫-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ও ২০০৬ সালে সুষ্ঠ র্নিাচনের দাবিতে আন্দোলনে গান পাউডার, লগি-বৈঠা ও বোমায় নিহত মানুষদের হত্যার অভিযোগের বিচারের দাবিও তো ক্ষতিগ্রস্তদের।

বলার অপেক্ষা রাখেনা, ক্ষমতার ছাত্রলীগ যা করছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ছাত্রদলও একই কায়দায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি ও হলের সিট বাণিজ্য, মাদকব্যবসা ও নারী নির্যাতনে যুক্ত ছিল। সে আমলে ছাত্রলীগ ছিল এখনকার ছাত্রদলের মত অসহায়। আর ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ভয়াবহ আতংকের ইসলামী ছাত্রসংঘের উত্তরাধিকার। কিন্ত কোন সরকারই এসব ছাত্র সংগঠনের নৃশংস ও ভয়াবহ অপরাধের বিষয় বিচারের আওতায় আনেনি, কারণ অপরাধের ক্ষেত্রে তারা একধরণের অলিখিত ইমিউনিটি ভোগ করে। ফলে ক্ষমতায় থাকতে হেন দুস্কর্ম নেই, যার সাথে এসব সংগঠনের নেতা কর্মীরা জড়িয়ে পড়েনা।

শোকাবহ আগষ্টেও ছাত্রসংগঠনটির নামে বেপরোয়া তান্ডব ও হামলার এন্তার অভিযোগ আছে। গত ২০ আগষ্ট ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী আফসানাকে ধর্ষণের পরে খুন করার অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে। কুমিল্লায় সংঘর্ষের পরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এবং খুলনায় সংঘর্ষের পর পরীক্ষা  পেছানো হয়েছে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। জঙ্গীবিরোধী মানববন্ধন করতে গিয়ে চট্টগ্রামে দুই গ্রুপ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। গেল মাসগুলিতে সংবাদপত্রের রিপোর্টগুলি উল্লেখ করলে কলেবর বৃদ্ধি পাবে, কারণ প্রাচীন কলেজের ছাত্রাবাস সোল্লাসে পুড়িয়ে দিলেও যে দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গৃহীত হয় না সেখানে কলেবর বাড়িয়ে কি লাভ!

সারাদেশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা জনপদে ছাত্রলীগের প্রায় কোন প্রতিপক্ষ নেই। রাজশাহী ও চট্টগ্রামে শিবিরের অস্তিত্ব আছে, ছাত্রদলের সাড়াশব্দও নেই কোথাও। যেখানে ছাত্র ইউনিয়ন আছে হামলার শিকার হচ্ছে তারাও। এজন্য এখন ছাত্রলীগেরই প্রতিপক্ষ ছাত্রলীগ। তারা সংঘর্ষে জড়ায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি ও হলের সিট বাণিজ্য, মাদকব্যবসা ও প্রত্যাখ্যাত প্রেমের প্রতিশোধ নিতে। খুনোখুনির পরে নেতৃবৃন্দ জানান, বিচার হবে, অনুপ্রবেশকারীরা এসব করছে। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে ছাত্রলীগের কোন্দলে খুন হয়েছে কম- বেশি ১৭৫ জন।  ঐতিহ্যমন্ডিত এই ছাত্রসংগঠন এখন দেশের অনেক এলাকায় আতঙ্কের নাম।

লাগামহীন সন্ত্রাসের ঘটনায় সরকারের মন্ত্রী ও একাধিক নেতা নানা সময়ে বলেছেন, ছাত্রলীগের এসব কর্মকান্ডের দায় আওয়ামী লীগ নেবে না। দলের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ অনেকবার বলেছেন, ছাত্রলীগের ভেতরে শিবির ঢুকে গেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত এরকম একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এমন তথ্য জানা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠন কেন যে এরকম করছে বলে যারা বিষ্ময়ের ভান করেণ, তারা পেছনে ফিরে তাকান না।

১৯৭২-৭৫ এবং ১৯৯৬-২০০০ মেয়াদে ছাত্রলীগ কি করেছে! সেনাসমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে কি দায়িত্ব পালন করেছে ছাত্রলীগ? “ক্ষমতার বাঘ ছাত্রলীগ সেই দুই বছর কি বিড়াল বনে গিয়েছিল”-ভাষ্যটি ছিল মতিয়া চৌধুরীর । ছাত্রলীগ এই ভাষ্যের উত্তর দেয়ার জন্য তাদের সে সময়ের অবস্থান কখনোই কি তুলে ধরবে?

এক অভূতপূর্ব ও নজীরবিহীন নির্বাচনে পুনর্বার ক্ষমতাসীন হয়ে সরকার বসেছে, তাদের ভাষায়, গণতন্ত্র সুরক্ষার যাত্রায়। এই যাত্রাকে বিএনপি বলছে, গণতন্ত্র হত্যা। বাস্তবতা হচ্ছে- গণতন্ত্র এক, দেশ এক, কিন্তু ভাবনা দুই। একদল ভাবছে তারা গণতন্ত্র পাহারা দিয়ে রক্ষা করছে, অপর দল রক্ষক সেজে গণতন্ত্র রক্ষা করার অভিযোগ আনছে। তাদের এই বিপরীতমুখী ভাবনা সৃষ্টি করছে অজস্র ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন, যাদের হাতে অজস্র প্রাণ ঝরে যাচ্ছে অকালে, শিকার হচ্ছে ধর্ষণ-যৌন হয়রানিসহ নানা নির্যাতনের। ফলে আশ্বাস নয়, জনগন তখনই সংসদে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে নিশ্চিন্ত হবে, যখন দেখবে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত হতে শুরু করেছে।