Home » আন্তর্জাতিক » যুক্তরাষ্ট্রে এ কেমন নির্বাচন : যুদ্ধ মন্দা বর্ণবাদ জন-সংকটও কোনো ইস্যু নয়

যুক্তরাষ্ট্রে এ কেমন নির্বাচন : যুদ্ধ মন্দা বর্ণবাদ জন-সংকটও কোনো ইস্যু নয়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ :: ফ্রন্টলাইন অবলম্বনে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য আমেরিকানরা নভেম্বরে ভোটে যাচ্ছে। মোটামুটিভাবে বলা যায়, ২০১২ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত ভোটারদের অর্ধেকের সামান্য বেশি তথা ৫৭.৫ ভাগ ভোট দিয়েছিল। বাকি ভোটারেরা নির্বাচনের পরোয়া করেনি। তারা হয় ভোট দিতে যাওয়ার মতো সময় পাননি (সেখানে নির্বাচন হয় কর্মদিবসে) কিংবা কাজটি করার জন্য ভেতর থেকে তেমন ধরনের তাগিদও সৃষ্টি হয়নি। এবারের নির্বাচন সাধারণ কোনো নির্বাচন নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা প্রার্থী দুজন সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত, বিতর্কিত দুই ব্যক্তি। জনমত জরিপে দেখা যায়, হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প একে অপরের খুবই কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছেন। ভোটাররা উদ্দীপ্ত হয়ে তাদের ভোট দিতে চান, এমন নয়। বরং প্রতিদ্বন্দ্বিকে অপছন্দ থেকে তারা ভোট দিতে চান।

এবারের নির্বাচনে কোন কোন ইস্যু প্রাধান্য পাচ্ছে? তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, কোটি কোটি আমেরিকানের দুরবস্থায় পড়া নিয়ে কোনো গভীর আলোচনা হচ্ছে না, নাগরিক অধিকার, জেন্ডার বৈষম্যও সেভাবে আলোচিত হচ্ছে না। প্রার্থী দুজনের কেউই এসব বিষয়কে প্রকাশ্য বিতর্কের মতো ইস্যু মনে করছেন না। যেসব ইস্যু ভেসে আসছে, সেগুলো যৌক্তিকাপূর্ণ কিনা তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এগুলোর মধ্যে দুটির কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় : হিলারি ক্লিনটনের স্বাস্থ্য এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেজাজ। এগুলোই আকাশ-বাতাস মুখর করছে। ক্ষুধা আর অনাহার, ও যুদ্ধ, পুলিশের সহিংসতা, ভূমি অধিকারের মতো মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিবেচনায় আসছে না।

সামনে যা আসছে : একসময় ষড়যন্ত্র তত্ত্ববিদদের অন্ধ গলিতে যেসব বিষয় ঘুরপাক খেত, এখন সেগুলোই প্রকাশ্য দিবালোকে তাদের উপস্থিতি ঘোষণা করছে। ৯/১১ বার্ষিকীতে হিলারি ক্লিনটনের প্রায় পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি এই ধারণা উস্কে দিয়েছে, তিনি মারাত্মক অসুস্থ। হিলারি শিবির থেকে বলা হলো, তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। কিন্তু সেটাই পর্যাপ্ত বিবেচিত হলো না। তার বিশ্বাসযোগ্যতা কম হওয়ায় চরমপন্থীরা তিনি যে মিথ্যা বলছেন, সেটা প্রচার করার প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। ক্লিনটন ফাউন্ডেশন, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দুর্নীতি এবং ক্লিনটন পরিবারের সদস্যদেরও বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর মতো যৌক্তিক বিষয়গুলোও তেমন ঝড় তুলতে পারছেন না খোদ অভিযোগকারীদের একনিষ্ঠতার অভাবে। হিলারি ক্লিনটনের কাশিই সত্যি সত্যি তিনি আরো বড় কিছু গোপন (ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে করা চুক্তির কথা বলা যায় উদাহরণ হিসেবে) করছেন বলে অভিযোগ করাটা অবৈধ।

আবার মার্কিন জনগোষ্ঠীর একটি বেশ বড় অংশ ট্রাম্পকে অবিশ্বাস ও অপছন্দ করে। তার ধুম-ধারাক্কা চালচলন, বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি উন্নাসিকতা, চাপাবাজি উদারপন্থীদের কাছে তাকে অভিশাপে পরিণত করেছে। তাকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে চিত্রিত করা সহজ। বলা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো উপযুক্তি নন, তিনি খুবই অস্থিরমতি, অনেকটাই ভাঁড়ের মতো। আর এটাই যারা হিলারি ক্লিনটনের প্রতি উৎসাহী নন, তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাবে। এখানে সাধারণভাবে যে বিষয়টা কাজ করছে, তা হলো ‘বিকল্পের দিকে তাকান,’ কিংবা আরো সহজভাবে বলা যায়, ‘দুই খারাপের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম খারাপকে ভোট দিন।’ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে ট্রাম্প যে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন, ডেমোক্র্যাট শিবির সেটা লুফে নিয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, পুতিন শক্তিশালী নেতা। আর বিস্ময় সৃষ্টি করে তিনি বলে ফেলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চেয়েও ভালো পুতিন। এটা উদারপন্থীদের মধ্যে ক্রোধের সৃষ্টি করেছে, তারা বাগাড়ম্বরতার সুচটি স্নায়ুযুদ্ধের এলাকায় সরিয়ে নিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পুতিন একটি বড় হুমকি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। বিষয়টি ইউক্রেন ও সিরিয়ায় রুশ সম্পৃক্ততায় এবং ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির ইন্টারনেট সিস্টেম রাশিয়ার হ্যাক করার সন্দেহের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।

এসব বিষয়গুলো সিএনএন, ফক্স, এনবিসি এবং অন্যান্য নেটওয়ার্কে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। গণতন্ত্র তাদের কাছে অনেকটা মার্বেল স্লাবে রাখা মরা ভেড়া বা মুরগির দেহ থেকে টেনে আনা বস্তু। বিশ্লেষক ও নির্বাচন সমীক্ষাকারীরা ভেবে মরছেন, হিলারি ক্লিনটনের স্বাস্থ্য কিংবা ট্রাম্পের বর্ণবাদ কিংবা স্রেফ পুতিন সত্যিই  আদৌ কোনো ইস্যু কি না। মার্কিন সমাজকে অস্থিরকারী রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর দিকে তারা তাকিয়েও তারা দেখছেন না। পুলিশের সহিংসতা, মার্কিন সমাজে ছড়িয়ে থাকা বন্দুক নিয়ে বলতে গেলে কোন আলোচনাই হয়নি। মিডিয়া যখন হিলারি-ট্রাম্প প্রতিযোগিতা নিয়ে মেতে রয়েছে, তখন টায়ার কিং নামের ১৩ বছরের এক আফ্রিকান-আমেরিকান শিশুকে পুলিশ অফিসাররা গুলি করে মেরে ফেলেছে। হত্যা করার সময় কিংয়ের হাতে একটা খেলনা বন্দুক ধরা ছিল। ঘটনাস্থল ওহাইয়োর কলম্বাস নগরীর মেয়র বলেছেন, ‘এই দেশে কিছু একটা ভুল রয়েছে। এটা আমাদের রাস্তায় মহামারী ডেকে আনছে। ১৩ বছর বয়সী ছেলেটা মারা গেল বন্দুক আর সহিংসতার প্রতি আমাদের আচ্ছন্নতার কারণে।’ এই সাংস্কৃতিক সমস্যাটি থাকা দরকার ছিল বিতর্কের সামনে ও কেন্দ্রে। কিন্তু স্থান পাচ্ছে এক প্রান্তে, কোনোক্রমে। ন্যাশনাল রাইফেল এসোসিয়েশনের সদস্য ট্রাম্প। আর মুভমেন্ট ফর ব্ল্যাক লাইভস এবং পুলিশ ইউনিয়নের মধ্যকার চাপে পৃষ্ট হচ্ছেন। তাদের কেউই বন্দুকবাজদের সাথে লড়াই করতে কিংবা বেকারত্ব, পুলিশের নির্মমতায় ছিন্নভিন্ন সমাজে কল্যাণ বয়ে আনতে আন্তরিক নন।

যে নিরন্তর যুদ্ধগুলো বিশ্বকে অস্থিতিশীল করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও দুর্ভোগ বয়ে আনছে, সেগুলো অবসানের বিষয় বলতে গেলে বিবেচনাতেই আসছে না। হিলারি কিংবা ট্রাম্প কারোরই কোনো সামরিক অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু দুজনের কেউই প্রতিদিন যে ২০ জন করে যুদ্ধফেরত সৈনিক আত্মহত্যা করছে, তা নিয়ে কোনো কথা বলছেন না। ২০১৪ সালে প্রায় ৭,৪০০ যুদ্ধফেরত সৈনিক আত্মহত্যা করেছেন। সংখ্যাটা ৯/১১-এ নিহতের দ্বিগুণ। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া ও ইয়েমেনের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির ব্যাপারে সামান্যই বক্তব্য রয়েছে। অথচ আমেরিকান সামরিক শক্তির চাবুকে এশিয়ার এক প্রান্ত থেকে আফ্রিকার অপর প্রান্ত পর্যন্ত লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাচ্ছে।

এই যুদ্ধের কোনো শেষ সীমা নেই। এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটা হতে পারত একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। এই নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের কর্তব্য অবহেলা প্রসঙ্গে ‘বেনগাজি’র (লিবিয়ার এই নগরীতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূতসহ গুরুত্বপূর্ণ চারজন নিহত হয়েছিল) কথা উল্লেখ করা হয়- লিবিয়ার বিধ্বস্ত দ্বিতীয় নগরী হিসেবে নয়।

কোটি কোটি আমেরিকানের মারাত্মক দুর্ভোগ নিয়ে আলোচনাই হচ্ছে না। অথচ পাঁচ কোটি আমেরিকান গরিব অবস্থায় রয়েছে, তাদের অনেক মারাত্মক ক্ষুধায় মরছে। মহামূল্যবান সরকারি সম্পদ চলে যাচ্ছে সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সে। সম্প্রতি ওবামা ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা বাবদ ৩৮ বিলিয়ন ডলার প্রদানের একটি চুক্তিতে সই করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে প্রতিটি মার্কিন করদাতার কাছ থেকে ৩০০ ডলার করে নেওয়া হবে। আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। পরিমাণটা ধারণারও বাইরে। নিজ দেশের জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের বদলে পুলিশ আর যুদ্ধের পেছনে অর্থ ঢালা যেন এই সিস্টেমের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

নভেম্বরে আমেরিকানরা ভোট দিতে যাচ্ছে। যে প্রার্থীকে অপছন্দ করে, তার ভয়ে তারা ভোট দেবে। আমেরিকান সমাজের সামনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো আলোচনায় থাকবে না। চাকরির নিরাপত্তা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, নিত্যপণ্যের মূল্য, ছুটি কাটানোর টাকা না থাকা, আরো সুন্দর জীবন কাটানোর স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের দুর্ভাবনা নিয়ে কারোই মাথাব্যথা নেই। তাদের এসব দুর্ভাবনা প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের কথার কথায় কেবল স্থান পাচ্ছে। রাজনৈতিক-প্রক্রিয়ায় আস্থা রয়েছে সর্বনিম্ন অবস্থানে। বাক্সে ভোট ফেলার জন্য হাত বেশ দ্রুতই ওঠবে, কিন্তু এই তাড়াহুড়াকে উদ্দীপনা মনে করে যেন ভুল করা না হয়। এটা আসলে হতাশার লক্ষণ।