Home » প্রচ্ছদ কথা » আ’লীগের কাউন্সিল, না তৃতীয় প্রজন্মের অভিষেক?

আ’লীগের কাউন্সিল, না তৃতীয় প্রজন্মের অভিষেক?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

সাতষট্টি বছর বয়সী আওয়ামী লীগ সম্ভবত: ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা সময়টি উপভোগ করছে। গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা-জেলা থেকে কেন্দ্র, সর্বত্রই আওয়ামী লীগ। দেশ জুড়ে ছড়ানো লক্ষ লক্ষ বিলবোর্ডে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনার ছবি ক্রমশ: ছোট হচ্ছে, বড় হচ্ছে নামধারীদের ছবি এবং গুনকীর্তন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং সংসদ সদস্যদের হাত ধরে ফুলের মালা দিয়ে ও নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের পাঁচ সহস্রাধিক নেতা-কর্মী এখন আওয়ামী লীগার। একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের ভাষায়, আওয়ামী লীগের ইশারা ছাড়া এখন গাছের পাতাও নড়ে না।

তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত এখন একক এই দলের নামে সবকিছু হচ্ছে। মেগা সাইজের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, কুড়ি বিলিয়ন ডলারের ওপরে রিজার্ভ, নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ মাথাপিছু আয় হাজার ডলারের ওপরে-সবকিছুর কৃতিত্ব দাবি করছে দলটি একজনের নামে। তিনি হচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি ধারাবাহিক দুই মেয়াদসহ তৃতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা করছেন। প্রথম মেয়াদে অবশ্য বলেছিলেন, বয়স ৫৭ পেরোলে অবসরে যাবেন। সম্ভবত: সেটি ছিল কথার কথা; অবসরে যাওয়া হয়নি। কাজ করছেন পূর্ণোদ্যমে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে আবারও অবসরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। দলীয় প্রধান হিসেবেও তার একটি দুর্লভ বিশ্বরেকর্ড রয়েছে- আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন সূদীর্ঘ ৩৬ বছর। এবারের কাউন্সিলেও সভাপতি হবেন, কারণ তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সারাদেশে আওয়ামী লীগ এখন অনেকটাই প্রতিপক্ষবিহীন। বিএনপি দল হিসেবে এতটাই নির্জীব যে, কেন্দ্র ব্যতীত অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার। বিএনপি নিজেরা নির্জীব হয়ে পড়েছে ও নির্জীব করাও হয়েছে নানা পন্থায়। জামায়াত-শিবির আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং মাঝে মাঝে সহিংস হামলায় অস্তিত্ব জানান দেয়। এজন্য প্রায় প্রতিপক্ষবিহীন রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনসমূহ নিজেরাই এখন নিজেদের প্রতিপক্ষ। দেশের এমন কোন ইউনিয়ন, উপজেলা-জেলা নেই যেখানে আওয়ামী লীগের বিভাজন নেই। এখানে কর্মীর বিরুদ্ধে কর্মী, নেতার বিরুদ্ধে নেতা, দলের বিরুদ্ধে দল। যে নেতার যত অর্থ-নানা ধরনের ক্ষমতা- তার দাপট সবচেয়ে বেশি। এই দলীয় বিভাজন কোন আদর্শের নয়; এই বিভাজন-লড়াই সাম্রাজ্য বিস্তারের, ক্ষমতাবলয় সংহত করার, অর্থে-বিত্তে সর্বেসর্বা হওয়ার।

আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী মুসলিম লীগের সামন্ততান্ত্রিক ও জমিদার তোষণের প্রচন্ড বিরোধী ছিলেন এবং একটি গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছিল তারই উদ্যোগে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অভাবনীয় সাফল্য, যা মুসলিম লীগের সামগ্রিক বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল, তার মূল স্তম্ভ ছিলেন ভাসানী, শেরে-বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী। এখনও ওই নির্বাচন হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নৌকার নির্বাচন হিসেবে ইতিহাসখ্যাত।

শিগগীরই ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। সোহরাওয়ার্দী তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। স্বায়ত্ত্বশাসন, বাঙালীর অধিকার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নীতির প্রশ্নে এই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং ১৯৫৭ সালে কাগমারীর ঐতিহাসিক সম্মেলনে প্রগতিশীল, উদার ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীদের নিয়ে মাওলানা নতুন দল গঠন করেন। দলের নাম ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। মার্কিনীদের প্রতি অনুরক্ত উর্দুভাষী আওয়ামী লীগ নেতা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর সাথে দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পরিনতি ছিল এটি।

পাকিস্তানে মার্কিনীদের প্রভাববলয় গড়ে ওঠা, পাক মার্কিন সামরিক চুক্তি, সিয়াটো ও সেন্টো চুক্তিতে স্বাক্ষর প্রশ্নে ভাসানী ছিলেন তীব্র বিরোধী এবং অনমনীয়। পরিনামে আওয়ামী লীগে দুটো ধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই দল গঠনের পেছনে সামন্ততান্ত্রিক, ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক ধারণা পরিত্যাজ্য হয়েছিল। কারণ মাওলানা ভাসানীর জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে সবসময়ই সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদী ধারণার বিরুদ্ধে ছিলেন। এই দ্বন্দ্বে  ভাসানীর বিশেষ স্নেহভাজন শেখ মুজিব অবস্থান নেন সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যত নেতা হিসেবে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়ার সূচনা হয়।

ভাসানীর অত্যন্ত স্নেহভাজন সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য শেখ মুজিব থেকে যান আওয়ামী লীগে। এর পরের ইতিহাস, বিশেষ করে প্রাক মুক্তিযুদ্ধ পর্ব পর্যন্ত ইতিহাসের যে কোন নির্মোহ বিশ্লেষণে উঠে আসবে ষাটের দশকে পশ্চিমমুখীনতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ বাঙালী জাতীয়তাবাদের ধারক-বাহক হিসেবে জনগনের ইচ্ছের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এ সময়কালে স্বায়ত্ত্বশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনগুলিতে আওয়ামী লীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে জনগনের মুক্তির আকাঙ্খা ধারন করতে সমর্থ হয়। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফা ঘোষণা করেণ এবং অচিরেই এটি বাঙালীর মুক্তি সনদে পরিনত হয়ে ওঠে। যদিও এর আগে তৎকালীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ব্যপক সমর্থন পায় এবং ৬ দফাসহ ওই সময়ের নানা ঘটনার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পরিনামে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দলটি পূর্ব বাংলায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই নির্বাচনই ছিল বাঙালীর মুক্তি আন্দোলনের নির্ধারক, যা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরিনত হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

ইতিহাসের এই সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিকতা মনে করিয়ে দেবার কারন, পাকিস্তানী সামরিক স্বৈরাচার ও শোষন-বঞ্চনার বিরুদ্ধে জাতিগত ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানে আওয়ামী লীগের সাফল্যের মূলে ছিল, জনগনের অকুন্ঠ সমর্থন। দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ জনগনের এই ইচ্ছাকে ধারন করতে তো পারেইনি বরং উল্টো যাত্রায় সামিল হয়েছিল স্বাধীনতার পরেই। এর সবচেয়ে বড় উদাহরন হচ্ছে, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর দলটি উদার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় চতুর্থ সংশোধনী পাশের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটি মুছে ফেলেছিল।

ফলে দলের মধ্যের ষড়যন্ত্রকারী নেতৃবৃন্দ ও কতিপয় বেসামরিক-সামরিক আমলার সম্মিলনে ’৭৫-এর বর্বরতম ট্রাজেডি সংঘটিত হয়। ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষকরা মনে করেন, একদলীয় শাসনব্যবস্থা ও ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার বাসনায় সুষ্ট জনবিচ্ছিন্নতা ট্রাজেডির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, যা সাধারন মানুষের কাম্য ছিল না। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অন্যতম ধারক এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল ঐতিহাসিকভাবে গণতন্ত্র বিচ্যুতির দায় পরিশোধ করেছিল নির্মম ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে। পরিনামে নির্বাক-নিথর জনগন সাক্ষী হয়ে থাকে ক্ষমতা দখলের নোংরা খেলায় ক্যু-পাল্টা ক্যু, অজস্র রক্তপাতের। গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্খায় পৃথিবীর কোন জাতিকে এত রক্ত দিতে হয়েছে- ইতিহাসে এরকম নজির বোধকরি আর নেই।

এই হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পরিনাম ছিল সূদুরপ্রসারী। এ সময়েই রাজনীতিকদের হাত থেকে রাজনীতি বেরিয়ে যেতে থাকে। সামরিক আমলাতন্ত্র বেসামরিক আমলাতন্ত্র রাজনীতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আওয়ামী লীগ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। ১৯৬৬ সালে প্রায় সকল জেলে আটক থাকাকালে আমেনা বেগম আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন, যেমনটি ’৭৫ পরবর্তীকালে ধরেছিলেন জোহরা তাজউদ্দিন। কিন্তু অচিরেই দল দ্বিধাবিভক্তির পাশাপাশি অনেক উপদলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে নিয়ে আসা হয় আসন্ন দলীয় বিপর্যয় রোধ করার জন্য।

১৯৮১ থেকে ২০০৮ এর নির্বাচন পর্যন্ত একটি কালপর্ব ধরলে দেখা যাবে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৮৩-৯০ পর্বে প্রথমে সামরিক শাসনকে স্বাগত জানিয়েছে, যেমনটি জানিয়েছিল ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। বিএনপি ও বাম দলগুলোর সাথে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছে, আবার ১৯৮৬’র নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। এরশাদের পতনের পরে সংসদীয় পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। তত্ত্বাবধায়ক  সরকার প্রতিষ্ঠায় জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। এ সময়েই এরশাদের সাথে যে সমঝোতা হয়েছিল পরবর্তীকালে সেটি অংশীদারীত্বে পরিনত হয়েছে।

১৯৯৬ সালে আওযামী লীগ ক্ষমতায় এসে কুখ্যাত ইনডেমনিটি বিল বাতিল করে শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের বিচার সম্পন্ন করেছিল। ফলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাটি নষ্ট হয়ে যায় দলীয়করণ ও কুক্ষিগত করার কারণে। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে স্থুল কারচুপির অভিযোগ আনেন শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের মত সংসদ বর্জনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। সুতরাং দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ পর্ব অতিক্রম করলেও দেশের রাজনীতিতে সুস্থ গণতান্ত্রিক বাত্যাবরন গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেননি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হয় তিন-চতর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। সম্ভবত: এই বিজয় দলটিকে পুনরায় স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। ফলে  তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মত একটি পরীক্ষিত বিষয়কে সংস্কার না করে জনগনের অভিপ্রায়ের বিপক্ষে বাতিল করে দেয়া হয়। এর সূদুুরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল একটি একক নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কারণ সিটি নির্বাচনে শেখ হাসিনা মেসেজটি পান যে, প্রচলিত ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশ নেয় তাহলে ফলাফল কি হতে পারে! রাজনীতির কূটচালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় একক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে।

২০০৯ থেকে ২০১৬। অনুকল এক রাজনৈতিক পরিবেশে গনতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রতিকূলে প্রবাহিত করার ঐতিহাসিক দায় আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। সরকার তার নিজস্ব দল ও রাজনৈতিক শক্তির ওপরে নির্ভর করার বদলে প্রশাসন, পুলিশ ও দমননীতি নির্ভর হয়ে পড়ে। এ কারণে জনসমর্থন নয় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার নীল নকশাটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পালে আরো বাতাস লাগে প্রায় কোন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না থাকায়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এসময় একক ও কর্তৃত্ববাদী সবকিছৃ নিয়ন্ত্রণের আগ্রাসী সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবারতন্ত্রকে গ্রহনযোগ্য মনে না করা হলেও বাংলাদেশে প্রধান দল দুটিতে এটি জেঁকে বসেছে। বিএনপিকে যেমন ‘মায়ে-পুতে’র দল বলা হয় আগামী কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগও সেই ধারার সূচনা করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সজিব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, রেজওয়ান এরা কাউন্সিলর হয়েছেন। বলা যেতে পারে, এবারের কাউন্সিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের আনুষ্ঠানিক অভিষেকের এবং রাজনীতিতে জয় যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন, সন্দেহ নেই। তরুন তুর্কীরা দলে জয়ের নেতৃত্ব চাচ্ছেন, শেখ হাসিনাকে খুশি করার জন্য এবং ক্ষমতাবলয়ে অবস্থান দৃঢ় করতে।

‘‘উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছে দুর্বার, এখন সময় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার”-আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলনের মূল শ্লোগান এটি। এরকম একটি শ্লোগান চমৎকৃত করতে পারে বা কসমেটিক উন্নয়নের সাফল্যগাথা আরো উজ্জীবিত করতে পারে, কিন্তু এর অন্ত:সারশূন্যতা অন্য জায়গায়। এই দেশের উন্নয়ন ভাবনায় ভীমরতি ঢুকেছে, যে কোন উপায়ে হীনপন্থা অবলম্বনে উন্নয়ন সাফল্য প্রচার করা হচ্ছে। অবকাঠামো, শিক্ষাক্ষেত্র, পরিবেশ- কোনকিছুই বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না উন্নয়ন সাফল্য প্রচারে।

যে কোন টেকসই উন্নয়নের সারকথা হচ্ছে, সুনীতি-সুশাসনের ভিত্তিতে পরিকল্পিত চেষ্টা। যে উন্নয়নের পেছনে সুনীতি-সুশাসন নেই, গায়ের জোরে উন্নয়ন চাপিয়ে দেয়া হয়, তার ভেতরে থাকে গলদ, দুর্নীতি আর ক্ষণস্থায়িত্ব। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উন্নয়ন মানুষকে কতটা ঝুঁকি ও বিপদে ঠেলে দেয়, আইয়ুব-এরশাদের কথিত উন্নয়ন ফল তার প্রমান রেখেছে অনেককাল আগে। মূলত: মানুষের অধিকার ও আকাঙ্খাকে দমিত রাখার জন্য এরকম চটকদার শ্লোগান সামনে নিয়ে আসা হয়। সুতরাং আওয়ামী লীগের এবারের কাউন্সিল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে কথিত উন্নয়ন ভাবনায় আবর্তিত হবে-সে বিষয়ে সন্দেহ থাকছে না।