Home » বিশেষ নিবন্ধ » রামপাল প্রকল্প : ইউনেসকোকেও না বলা কার স্বার্থে

রামপাল প্রকল্প : ইউনেসকোকেও না বলা কার স্বার্থে

এম. জাকির হোসেন খান ::

ইউনেসকোর উদ্বেগ সংবলিত সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের জবাবে সরকারের অবস্থান জানিয়ে সুন্দবরন রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছে, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা হচ্ছে। এই কেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না। আর রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে বলে ইউনেসকো যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যা বলেছে, তাতে তথ্যগত ভুল রয়েছে।’ এ সংক্রান্ত একটি জবাব গত ১১ অক্টোবর সরকার ইউনেসকোর কাছে প্রদান করে। কিন্তু সরকারের সে ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি ইউনেসকো। এই প্রেক্ষিতেই জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ‘‘ইউনেসকো’’ এবং আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন অব কনজার্ভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০১৬-এর ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে রামপালে সরকারিভাবে নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এবং বেসরকারিভাবে ওরিয়ন কর্তৃক নির্মিত ৫৫৬ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ অর্থাৎ এর জীববৈচিত্র্যের জন্য ব্যাপক হুমকি হিসাবে উল্লেখ করে। ইউনেসকো এবং আইইউসিএন রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল করে সুন্দরবন এবং সম্পদের ক্ষতি করবে না এমন যথাযথ স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সরিয়ে নিতে সুপারিশ করেছে। এ বিশ্ব ঐতিহ্যের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ প্রতিবেদন জমা দিলে তার ভিত্তিতেই ২০১৭ সালে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিকভাবে ইআইএ নির্মোহভাবে সম্পাদনের নিয়ম রয়েছে। রামপালে সরকার কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের ইআইএ আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান (সেন্টার ফর ইনভায়রনমেন্টাল এন্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস -সিআইজিআইএস) কর্তৃক সম্পাদনের ফলে এটি নিরপেক্ষতার মানদনন্ড অর্জন করতে পারেনি, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংঘাত থাকার সম্ভাবনা থাকার কারনে। উল্লেখ্য, ১৭৯৭ থেকে ২০০৯ সালে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড় আইলা’র সময় পর্যন্ত ৪৭৮ টি মাঝারি ও বড় ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস যেমন, তোমেন, গোর্কি, সিডর, নার্গিস বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। সুন্দরবন না থাকলে এসব প্রাকৃতিক দূর্যোগে জাতীয় অর্থনীতিতে কত ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতো তার হিসাব করেনি সিইজিআইএস। এটা পরিস্কার, বিশ্বাবাসীর উদ্বেগকে আমলে না নিয়ে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখলে সুন্দরবনের ধ্বংস অনিবার্য।

উল্লেখ্য, এর আগে সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ইউনেসকো’র উদ্বেগ সম্বলিত প্রতিবেদনকে বাস্তবতার সঙ্গে মিল না থাকা বা অসত্য বলে সরকার জাতিসংঘের এই প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, বরং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ১৩ আগষ্ট ২০১৬ বলেন, “বর্তমানে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প একটি জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। এ বিতর্কের যৌক্তিক কারণ থাকতেও পারে, আবার নাও পারে। তবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত ঝুঁকি থাকলে তা আরো সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে”। শুধু তাই নয়, প্রস্তাবিত প্রকল্প বিষয়ে রামসার সচিবালয়ে’র উদ্বেগ-এর প্রেক্ষিতে ২০১২ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর এক চিঠিতে সুস্পষ্টভাবে জানায়,‘‘প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে  রামসার সাইট/এলাকা সুন্দরবনের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্রের ওপর সম্ভাব্য বিরুপ প্রভাবের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর উদ্বিগ্ন”। শুধু তাই নয়, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১-এ তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক স্বাক্ষরিত এক পত্রে উল্লেখ করা হয় যে, ‘‘ রামসার সাইট/এলাকা’’ সুন্দরবনেরই অংশ -যার বৈধ বা লিগ্যাল আভিবাবক বন অধিদপ্তর। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং ‘ল্যান্ডস্কেপ জোন’ এ কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার তথা সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে।” ঐ পত্রে প্রধান বন সংরক্ষক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রামপালে স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুন:বিবেচনার আহবান জানান। প্রশ্ন হলো কোন কারনে ও কার স্বার্থে ইউনেসকো’র উদ্বেগকে এখন অস্বীকার করা হচ্ছে? আর সরকার যদি মনেই করে থাকে যে, রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে সুন্দরবন এর কোনো ক্ষতি হবে না- তাহলে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্তে¡ও প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা বাতিল করলো কেন?

সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রটি সর্বাধুনিক আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মাণ করার কথা বলা হলেও ইউনেসকো’র দাবি, ‘‘রামপালে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে না।” বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী কোম্পানি থেকে প্রকাশিত তথ্য, পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) প্রতিবেদন ও দরপত্রের নথি বিশ্লেষণ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রযুক্তি, পরিবেশ সুরক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞরাও স্পষ্ট করে বলেছেন, এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৩০ বছর আগের দ্বিতীয় শ্রেণির প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বড় ভূমিকম্প ও বন্যা-জলোচ্ছ্বাসের হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম নয়। ভারতীয় বিশেষজ্ঞ রণজিৎ সাহু বলেন, ‘‘সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল জায়গার পাশে এ ধরনের বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কখনো নির্মিত হয়নি। এমনকি ভারতের পরিবেশ অধিদপ্তরের গাইড লাইন অনুসারে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ না করার নিয়ম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মানেনি চুক্তির প্রধান পক্ষ ভারতীয় এনটিপিসি। রামপাল প্রকল্পে কয়লার ছাই বাঁচানোর জন্য পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে ওই ছাই বাজারে বিক্রি করা যায়। খরচ কমাতে ও আয় বাড়াতে নেওয়া এই পুরোনো প্রযুক্তির কারণে প্রকল্প থেকে পারদ নির্গত হওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে, যা সুন্দরবনের পানি ও মাটির সঙ্গে মিশে পুরো বনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও বিষাক্ত করে তুলবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজিও ব্যবহার করা হলে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণের পরিমাণ মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব। আর সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি যদি আর্থিকভাবে লাভজনকই হতো বা দূষণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমাতে পারতো তাহলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে এই টেকনোলজি ব্যবহারের পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হলো কেন? তাছাড়া, রামপাল প্রকল্পের সমান অংশীদার ভারতের ইআইএ নোটিফিকেশন ২০০৬ এবং ভারতের বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন, ১৯৭২-এর অধীন সংরক্ষিত ঘোষিত কোন এলাকার ১০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না। এসব বলা হলেও বাংলাদেশে তা  মানা হয়নি; বরং সুন্দরবনের মাত্র ৯ কিলোমিটারের দূরত্বে রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার প্রধান প্রতিষ্ঠান ভারতীয় এনটিপিসি’র কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত ছাই’র দূর্বল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ২০১০ এবং ২০১১ সালে প্রকল্পের কারিগরি প্রস্তাবের ইআইএ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ এপ্রাইজাল কমিটিই শুধু অসন্তোষ প্রকাশ করে। সম্প্রতি ভারতীয় গবেষণা সংস্থা সায়েন্স এন্ড এনভায়রেনমেন্ট সেন্টার (সিএসসি) কর্তৃক ৪৭টি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে দিল্লিতে অবস্থিত এনটিপিসি’র কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র সর্বোচ্চ পরিবেশ দূষণকারী কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উল্লেখ্য, গত ২০১৫ এর ১৩ মার্চ ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল তথ্য বিকৃতি/জালিয়াতি এবং প্রতারণার দায়ে কর্ণাটক রাজ্যে এনটিপিসি’র প্রস্তাবিত একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ ছাড়পত্র স্থগিত করে দেয়। ভারতের কর্ণাটক, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও ওড়িশ্যার রাজ্য সরকারগুলো এবং স্থানীয় জনগণের আপত্তির কারণে চারটি বড় ধরনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প ২০১৬-এর  জুনে বাতিল করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইতিমধ্যে ভারতের তামিলনাড়ু–তে ২৫০০ একর জায়গায় ৬৪৮ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিশ্বের বৃহৎ সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৩ লাখ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। রামপালেও একই ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদার পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব।