Home » বিশেষ নিবন্ধ » চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫১ : সমৃদ্ধির গতিপথ

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫১ : সমৃদ্ধির গতিপথ

আনু মুহাম্মদ ::

পুঁজিমুখি সংস্কারের মধ্য দিয়ে চীন দ্রুত পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার শক্তিশালী অংশীদারে পরিণত হয়েছে গত কয়েক দশকে। চীন যে খুব দ্রুত এবং ধারাবাহিকভাবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে সবাইকে বিস্মিত করেছে শুধু তাই নয়, খুব দ্রুত একটি ছোট কিন্তু খুবই সম্পত্তিশালী গোষ্ঠী গড়ে তুলেও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। এই নতুন এলিট গোষ্ঠী চীনে তাইজিদাং (Taizidang) নামে পরিচিত। এদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাসী চীনা পরিবারের সাথে সম্পর্কিত, অনেকেই বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত, ব্যবসায় বিশেষ আগ্রহী এবং সফল। চীনা পার্টি প্রশাসনের সাথে এরা যে খুবই ঘনিষ্ঠ তা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। বিভিন্ন হিসাবে দেখা যায়, চীনে বিপুল সম্পদশালীদের (মার্কিন ডলারে বিলিয়নেয়ার) সংখ্যা এখন প্রায় ৩০০-তে পৌঁছেছে। ৬ বছর আগে এদের সংখ্যা ছিলো ১৩০।

এই একই প্রক্রিয়ায় চীনে মধ্যবিত্তেরও বিস্তার ঘটেছে, তাদের একটি শক্তিশালী ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। চীনে বিভিন্ন বিলাস সামগ্রীর বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে তাদের ওপর ভর করেই। মাথাপিছু বার্ষিক  আয় ১৭ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি হলে মধ্যবিত্ত বলে বিবেচিত হয়। এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন ১০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে।

চীন এখনও নিজেকে সমাজতান্ত্রিক বলে দাবি করে। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থা কি সমাজতান্ত্রিক না পুঁজিবাদী তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তাত্ত্বিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। সুনির্দিষ্টভাবে এই বিষয় নিয়ে আমরা সামনের পর্বগুলোতে আরও বিশ্লেষণে যাবো। তবে এতোটুকু বলাই যায় এটি নিশ্চিতভাবে নতুন একটি মডেল উপস্থিত করেছে।  চীনা অর্থনীতিকে এখন আর কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি বলা যায় না।  কেননা জিডিপির শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই এখন আসে অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষি ও ছোটবড় বিভিন্ন ব্যবসা থেকে। শিক্ষা ও চিকিৎসাও আগের মতো পুরো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে বহন করা হয় না। জমির ওপর ব্যক্তি মালিকানা এখনও স্বীকৃত না হলেও দখলীস্বত্ত আছে। তবে সরকারের ভূমিকা এখনও কেন্দ্রীয়। মূলধনী হিসাব, বিনিয়োগ, মালিকানা হস্তান্তর ইত্যাদিতে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আছে। ব্যাংক ঋণ, বিনিয়োগ গতিমুখ সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত। নীতিমালা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা চীনে এখনও অনেক বেশি। এর ভিত্তি বস্তুত বিপ্লব-উত্তর চীনেই নির্মিত হয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে ব্যাপক নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচিতে চীনের সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে চীনকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। ১৯৪৯ সালে যেখানে শিক্ষার হার ছিলো শতকরা মাত্র ২৮ ভাগ, তা দুইদশকের মধ্যে শতকরা ৭০ ছাড়িয়ে যায়। শিক্ষার মতো চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বিপ্লব-উত্তর চীনে বিভিন্ন উদ্ভাবনী পথে বিশাল জনগোষ্ঠীর সুস্থ থাকার অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছিলো। ১৯৪৯ সালে বিপ্লবী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার আগেই মুক্তাঞ্চলে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিকাশ ঘটানো হয়েছিলো। বিপ্লবের পরপরই সারাদেশে সর্বজনের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিলো। যথেষ্টসংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তারের অভাবে নগ্নপদ ডাক্তার, ধাত্রীদের দিয়ে বিরাট বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিলো। চীনের লোকজ চিকিৎসার বিকাশের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসার সমন্বয় করে ক্রমে সবার কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। চিকিৎসার আগে রোগের কারণ দূর করায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করায় সামাজিক আন্দোলনসহ ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত পার্টি কমিটি ও কমিউন কাঠামো ছিলো এসব বিষয়ে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম। সবার আগে সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার বিষয়টি তো ছিলোই। বস্তুত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করবার মধ্য দিয়েই চীনের বিশাল জনসংখ্যার স্বাস্থ্য পরিস্থিতির গুণগত উন্নতি হয়েছিলো। বাজারমুখি সংস্কার প্রক্রিয়ায় কমিউনের সাথে সাথে এসব সর্বজনকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিও আর কার্যকর নেই। চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেককিছুই এখন বাণিজ্যিক তৎপরতার আওতায়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ও সেকারণে বেড়েছে। উন্নয়ন বা প্রবৃদ্ধির ধরনের কারণে এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পানি ও বায়ুদূষণ।

বাজারমুখি সংস্কারের আগে দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ, গোপন অর্থনীতির অস্তিত্ব প্রায় ছিলোই না বলতে গেলে। এমনকি ১৯৮৫ সালেও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবেও চীন ছিলো দুর্নীতির দিক থেকে অনেক নীচে।[1] বাজারমুখি সংস্কারে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়তে থাকার সাথে সাথে দুর্নীতির বিস্তার ঘটলেও খুন, ধর্ষণ, গোপন অর্থনীতির হারে চীন এখনও অনেক নিয়ন্ত্রিত। বিপ্লবের ধারায় গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত পার্টি কাঠামো, বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের মত ও সিদ্ধান্ত প্রকাশের পাশাপাশি সক্রিয়তার সুযোগ অনেকখানি অব্যাহত রাখায় রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কার্যকর আছে এখনও।উন্নয়ন নামের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক এমনকি প্রতিরোধের ঘটনাও ঘটছে।


[1]Vladimir Popov: Is Chinese Variety of Capitalism Really Unique?  http://www.net workideas.org/featart/ jun2010/ Unique.pdf