Home » বিশেষ নিবন্ধ » বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(পঞ্চম পর্ব)

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(পঞ্চম পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষণের প্রয়োজন নেই আহমদ ছফা’র। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির বক্তা অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

একথা সত্য যে বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে কয়েকবার ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। পাকিস্তান আন্দোলনের মতো প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেই সকল ঘটনা ব্যাখ্যা করব কিভাবে? একথাও সত্য যে, একই মাটিতে জন্ম নিয়ে একই ভাষায় কথা বলে একই গ্রাম বা শহরে প্রতিবেশী হয়েও হিন্দু ও মুসলমান শতাব্দীর পর শতাব্দী পৃথক থেকেছে। কেন?  হ্যাঁ, একত্রে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। বহুবিধ সামাজিক কাজকর্মে ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে হিন্দু মুসলমান একসঙ্গে কাজ করেছে। তবু তারা একত্রে খায় না, তাদের মধ্যে বিয়েশাদি হয় না, হিন্দুর রান্নাঘরে মুসলমান যেতে পারে না, গো-মাংস, শূকরের মাংস খাওয়া নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রভেদ আছে। হিন্দু সমাজে ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারটি প্রবল। এত বৎসর পাশাপাশি বাস করার পরও এই প্রভেদ-খাওয়া ও বিবাহ এই দুই ক্ষেত্রে পার্থক্য ও বাধাটুকু ঘুচল না। কেন? এর সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। এটি গভীর গবেষণার বিষয়। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণ খুবই প্রণিধানযোগ্য: ‘ভারতবর্ষের এমনি কপাল যে, এখানে হিন্দু-মুসলমানের মতো দুই জাত একত্র হয়েছে; ধর্মমতে হিন্দুর বাধা প্রবল নয়, আচারে প্রবল, আচারে মুসলমানের বাধা প্রবল নয়, ধর্মমতে প্রবল। এক পক্ষের যে দিকে দ্বার খোলা, অন্য পক্ষের সেদিকে দ্বার রুদ্ধ। এরা কী করে মিলবে।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর।)

হিন্দু মুসলমানের মধ্যকার এই যে বিভাজন (এমনকি গরিবদের মধ্যেও) তাকে কাজে লাগিয়েছিল ইংরেজ শাসকরা। অষ্টাদশ-উনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজরা হিন্দুদের কাছে টেনে নেয়, বিংশ শতাব্দীতে হিন্দুদের সন্দেহের চোখে দেখে। উনবিংশ শতাব্দীতে মুসলমানদের দূরে রাখা হত, বিংশ শতাব্দীতে মুসলমানদের কাছে টানার চেষ্টা ছিল। বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের কথা আগেই বলেছি। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের জন্য রাখিবন্ধনের চেষ্টা করেন, কিন্তু সে চেষ্টা খুব বেশি অগ্রসর হয়নি। কেন হয়নি তার কারণটিও রবীন্দ্রনাথের চোখে পড়েছে। প্রধানত জমিদার ও মহাজন ছিল হিন্দুরা। প্রজারা অধিকাংশ ছিল মুসলমান (পূর্ববঙ্গে-যেখানে কবির জমিদারি ছিল)। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আমি যখন প্রথম জমিদারি কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলুম তখন দেখেছিলুম, কাছারিতে মুসলমান প্রজাকে বসতে দিতে জাজিমের একপ্রান্ত তুলে দিয়ে সেই স্থানে তাকে স্থান দেওয়া হতো।’ (‘হিন্দু-মুসলমান’-কালান্তর।) রবীন্দ্রনাথ অন্যত্র জাজিম তোলার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে দেখিয়েছেন যে হিন্দু-মুসলমানের জন্য পৃথক বসার ব্যবস্থা এবং মুসলমানের জন্য নিম্নতর আসনের ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে বিরাট ফাঁক। ঐক্যের পথে বাধা রয়েছে ‘জাজিম তোলা আসনে বহু দিনের মস্ত ফাকটার মধ্যে।’ (‘স্বামী শ্রদ্ধানন্দ,’ কালান্তর।)

কংগ্রেসেও বর্ণহিন্দুর প্রাধান্য ছিল। গান্ধি খাঁটি হিন্দু হলেও অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষ বসু ও জওহরলাল নেহরুও অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। মওলানা আজাদ কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। তা সত্ত্বেও কংগ্রেসে মুসলমানরা কিছুটা পেছনের সারিতে ছিল। অনেক হিন্দু কংগ্রেস-নেতার মধ্যে সাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রবল ছিল। ভারতবিভক্তি, সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে কংগ্রেসের নেতৃত্বের ভূমিকাও বহুলাংশের দায়ী ছিল। ১৯২০ সালে গান্ধি খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে মুসলমানদের সমর্থন আদায় করতে চেয়েছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থাকে। আসলে খিলাফত আন্দোলন কতটা সমর্থনযোগ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের সম্রাট পরাজিত হন। তুরস্কের সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল বিভিন্ন জাতি, কয়েকটি আরব রাজ্য। যুদ্ধে বিজয়ী ইংরেজ-ফরাশিরা সেই সাম্রাজ্য ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেয়। এতে ভারতের মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল, তারা তুরস্কের খিলাফতের পুনপ্রতিষ্ঠা চেয়েছিল। এর মধ্যে প্যান-ইসলামিক ভাবধারা আছে, যা হল প্রতিক্রিয়াশীল। এইভাবে তুরস্ক সাম্রাজ্যের অধীনস্ত দেশ ও জাতিসমূহের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয় এবং খোদ তুরস্কের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকেও বাতিল করা হয়। পরে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল এবং রাজতন্ত্র বা তথাকথিত খিলাফত অপসারিত হয়েছিল। প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের কারণে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ খিলাফত আন্দোলন সমর্থন করেননি। পরবর্তীতে সেই জিন্নাহ্ই বদলে গেলেন। তিনি হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি-এই প্রতিক্রিয়াশীল দ্বিজাতিতত্ত্ব তুলে ধরেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারতবিভক্তি এবং পাকিস্তান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রের সৃষ্টি কোন অনিবার্য ঘটনা ছিল না। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মীয় মৌলবাদ কোনটাই কখনই শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ছিল না। আমার দৃঢ় অভিমত, এখনও নেই। প্রথমেই বলে রাখি, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ এক জিনিস নয়। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা হল এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি অপর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিদ্বেষমূলক মনোভাব। কখনও কখনও তা সহিংসতায় পর্যবসিত হয়েছে। ঠিক এই মুহূর্তে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছে না, কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ঠিকই ছড়াচ্ছে। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের প্রভাবশালীরা সংখ্যালঘুর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে জায়গাজমি সম্পত্তি দখল করছে। চাকুরির ক্ষেত্রেও আপন লোকজনদের সুবিধা দেওয়ার জন্য দুর্বল জনগোষ্ঠীকে (হতে পারে ধর্মীয় সংখ্যালঘু অথবা সংখ্যালঘু জাতি, আদিবাসী ইত্যাদি) বঞ্চিত করা হয়। এর মধ্যে যত না সাম্প্রদায়িক মনোভাব কাজ করে, তার চেয়ে বেশি কাজ করে স্বার্থবুদ্ধি, আর্থিক সুবিধালাভের নোংরা মনোবৃত্তি। এই কারণে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই ধর্ম, ভাষা, জাতি, বর্ণ (গায়ের চামড়ার রং) ইত্যাদির দিক দিয়ে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয়।

ধর্মীয় মৌলবাদ এক ধরনের ভাবাদর্শ যা ধর্মের নামে সবরকম পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণাকে লালন করে এবং তা জোরজবরদস্তি করে এবং প্রায়শ সহিংস উপায়ে প্রয়োগ করতে চায়। সব ধর্মের ক্ষেত্রেই দেখা যায় মৌলবাদীরা ফ্যাসিস্ট চরিত্রের হয়, তারা বিজ্ঞানবিরোধী ও নারীবিদ্বেষী। এটা সকল ধর্মীয় মৌলবাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ইউরোপে আলোকপ্রাপ্তির যুগে এবং ফরাশি বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে যাজকশ্রেণী ও চার্চের প্রভাব কমে আসে। তারই প্রতিক্রিয়ায় খ্রিষ্টীয় ধর্মকে কেন্দ্র করে যে আধুনিকতা-বিরোধী জীবনাচরণ সংক্রান্ত মতবাদ জন্ম নেয়, তাকেই ইংরেজিতে বলা হয় ফান্ডামেন্টালিজম বা ‘মৌলবাদ’। অর্থাৎ ধর্মে যেভাবে জীবনাচরণ বর্ণিত আছে, সেইভাবে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে চালিত করতে হবে। তা যদি বর্তমান কালের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তবে আধুনিকতাকেই বর্জন করতে হবে। অবশ্য ধর্মীয় ব্যাখ্যাটা হবে মৌলবাদের মনমতো।

আমদের দেশে হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদের ধ্যানধারণা উনবিংশ শতাব্দীতেই দেখা গিয়েছিল-তার আগে নয়। আর তা রাজনৈতিক সাংগঠনিক রূপ লাভ  করে বিংশ শতাব্দীতে। আবুল আলা মওদুদী ইসলামী মৌলবাদকে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক রূপ দেন। জামায়াতে ইসলামী তাঁরই তৈরি। অন্যদিকে ১৯২৫ সালে গঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আর.এস.এস। এটা হিন্দু মৌলবাদীদের সংগঠন। পূর্বে যে ওয়াহাবি ও ফরায়জি আন্দোলনের উল্লেখ করা হয়েছে সেই আন্দোলনের মধ্যেও মৌলবাদী ভাবনা কিছুটা মিলেমিশে ছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু সমাজে সংস্কার হয়েছিল ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে। কিন্তু ওয়াহাবি ও ফরায়জি আন্দোলনের মধ্যে ব্রিটিশরাজ ও জমিদার বিরোধী সংগ্রামের দিকটি থাকলেও উভয় আন্দোলনের মধ্যেই ধর্মীয় ও সমাজ-সংস্কারের নামে বহু বছর ধরে চলে আসা লোকসংস্কৃতির উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করার প্রবণতা ছিল। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল সমাজে। যেমন ওয়াহাবি নেতা তিতুমির প্রচার করেন যে আরবদেশের মুসলমানদের মতো ইসলামী ধরণের নাম রাখতে হবে, সন্তানের জন্য আকিকা করতে হবে, দাড়ি রাখতে হবে, গোফ ছোট করে কাটতে হবে ইত্যাদি, তা না করলে পাপ হবে, আল্লাহ্ শাস্তি দেবেন। তবে তিনি দাবি করেন, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’ এবং অমুসলমানের সঙ্গে ধর্মীয় ব্যবধানের কারণে অহেতুক বিবাদ করা আল্লাহ্-রসুল পছন্দ করেন না।

ফরায়জি আন্দোলনের প্রভাবে মুসলমানদের মধ্যে পোশাক-পরিচ্ছেদ, সাংস্কৃতিক উৎসব ইত্যাদি বিষয়ে হিন্দুদের থেকে পার্থক্য সৃষ্টি এবং এক অদ্ভূত ধরনের স্বাতন্ত্র্যবোধ তৈরির প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। যেমন দাবি করা হয়েছিল ধূতি নাকি হিন্দুদের পোশাক। আগে নবান্নের সময় হিন্দু-মুসলমান মিলিতভাবে উৎসব করত, কট্টর মুসলমনাপন্থীরা বলল, এটা হারাম। ঠিক একই জিনিস এখনও দেখা যায়। মৌলবাদীরা বলে, পহেলা বৈশাখের উৎসব করা অনৈসলামিক। তবে এই ধরনের কুপ্রভাব যে স্থায়ী হয়নি, তার প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন দেখি পহেলা বৈশাখের গানের আসরে বোমা নিক্ষেপ ও মানুষ হত্যার পরও বাংলা নববর্ষের গান ও উৎসব বন্ধ করা যায়নি। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পহেলা বৈশাখের উৎসবে অংশগ্রহণ করে। এটা প্রমাণ করে যে মৌলবাদের শিকড় এখানে খুব দুর্বল। এক সময় ফরায়জিদের প্রচারের কারণে গানবাজনা নিষিদ্ধ ছিল, নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাত্রা, গান, সিনেমা কোনটাই বন্ধ হয়নি (সাম্প্রতিক সময়ে মৌলবাদীরা সিনেমা হলেও বোমা নিক্ষেপ করেছিল)। এই সকল ঘটনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, বহু অতীত থেকে আমাদের সমাজ জীবনে যে উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিকবোধ উত্তরাধিকারসূত্রে চলে আসছে, সংকীর্ণ গোঁড়ামিপূর্ণ মতবাদ তাকে পাল্টে দিতে পারেনি। অবশ্য এইখানেই প্রশ্ন উঠতে পারে,তাহলে পাকিস্তান আন্দোলন সফল হল কিভাবে?