Home » আন্তর্জাতিক » ট্রাম্পের জয় কী প্রভাব ফেলবে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে?

ট্রাম্পের জয় কী প্রভাব ফেলবে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে?

সি রাজা মোহন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

একটি আতঙ্ক, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আতঙ্ক ইউরেশিয়াকে তাড়া করে ফিরছে। কারণ ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ ও এশিয়া প্রশ্নে আমেরিকান কৌশলের মূলনীতি তিনি বাতিল করে দেবেন। ইউরেশিয়াজুড়ে তথা প্যারিস থেকে টোকিও, ব্রাসেলস থেকে সিঙ্গাপুর, বার্লিন থেকে সিউল পর্যন্ত সরকারগুলো ট্রাম্পের একেবারে অপ্রত্যাশিত বিজয়ের পরপরই সম্ভাব্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন শুরু করে দিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ ও এশিয়ায় সামরিক জোট গঠনের মাধ্যমে ইউরেশিয়ান নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টিতে দূরবর্তী শক্তি আমেরিকা প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ১৯৭০-এর দশকের সূচনায় পূর্ব সুয়েজ থেকে গ্রেট ব্রিটেন নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরীয় উপকূলজুড়ে প্রধান বহিঃশক্তিতে পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্র।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনান্ড ট্রাম্প আমেরিকান গাঁটছড়ার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরেশিয়ান অংশীদারদের মধ্যকার প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পুনঃবণ্টন দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যদি তাদের প্রতিবেশীদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে তবে তিনি তাতেও তেমন উদ্বিগ্ন হবেন না।

রাজনৈতিক দৃশ্যপটে থাকা উভয় পক্ষের হস্তক্ষেপবাদীদের বিপরীতে ট্রাম্প জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধকে মারাত্মক ভুল হিসেবে সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, সর্বজনীন মূল্যবোধ বিকাশের কল্পনার পিছু ধাওয়া না করে এবং বিশ্বজুড়ে ব্যয়বহুল ও অসফল জাতিগঠন কাজে না জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বরং আত্ম-স্বার্থের দিকে নজর দেওয়া।

‘রুশ হুমকি’ প্রশ্নে ওয়াশিংটনের কান্ডজ্ঞানহীন অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন ট্রাম্প। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, তার সাথে কাজ করা যায়। ইরাক ও সিরিয়ার আইএস-কে পরাজিত করতে তিনি মস্কোর সাথে অংশিদারিত্বের আহবান জানিয়েছেন। তিনি দেশে ও মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চরম পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, দক্ষিণ থেকে অভিবাসন ঠেকাতে তিনি একটি দেওয়াল নির্মাণ করবেন, এবং এজন্য মেক্সিকোকে খরচ দিতে বাধ্য করবেন। তিনি আমেরিকায় বেইজিংয়ের ‘অর্থনৈতিক ধর্ষর্ণের’ সমাপ্তি টানার জন্য যে সস্তা চীনা পণ্যরাজি আমেরিকান চাকরিগুলো শেষ করছে, তার ওপর বিপুল মাত্রায় কর আরোপ করবেন।

ট্রাম্পের নির্বাচন ও  জয় ন্যাটো ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদর দফতর  ব্রাসেলসে ভয়াবহ ভীতির সৃষ্টি করেছে। মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যাটো কমান্ডাররা ইউরোপ থেকে আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারে ট্রাম্পের নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে তা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতারা রোববার জরুরি এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ট্রাম্পের নির্বাচন বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন কনভেনশন এবং ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি এবং ভবিষ্যতে আমেরিকার সাথে যুদ্ধপরবর্তী জোটের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা নির্বাচনী প্রচারণার সময় পুতিনের সাথে ট্রাম্পের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের জয়ের ফলে ইউরোপে উগ্র জনপ্রিয় দলগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠবে বলেও মূলধারার ইউরোপিয়ান দলগুলো ভীত।

আমেরিকার এশিয়ার মিত্ররা তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল, সে ব্যাপারে ট্রাম্পের কাছ থেকে নতুন করে আশ্বাস চাচ্ছে। চলতি সপ্তাহেই নিউইয়র্কে ট্রাম্পের সাথে বৈঠকে বসবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে। জাপানের সাথে যুদ্ধ-পরবর্তী জোটের ব্যাপারে ট্রাম্পের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করবেন তিনি।

নির্বাচনের পরপরই চীনা নেতা শি জিনপিং টেলিফোনে আলাপ করেছেন ট্রাম্পের সাথে। তিনি বলেছেন, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একমাত্র পথ হলো দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা। শি ছিলেন

কার্যত: বেশ বিনীত। কিন্তু দেশটির পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস বেশ অসংযত মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনা পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক কর বসায় তবে সেটার সমুচিত জবাব দিতে চীন প্রস্তুত। সোমবারের সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটি ট্রাম্পকে হুঁশিয়ার করে জানায়, তিনি চীনের সাথে নিশ্চিত পরাজয়মূলক বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িত হয়, তবে তাকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন, অজ্ঞ ও অযোগ্য হিসেবে নিন্দিত হতে হবে।’

বিশ্বের একেবারে প্রত্যেকেই ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের গদি লাভ নিয়ে আতঙ্কে ভুগছে, এমন নয়। ট্রাম্পকে নিয়ে ভালো কিছু হওয়ার আশা করতেই পারে রাশিয়া। তবে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। জাপানের অনেক আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের জোট নিয়ে নতুন সমঝোতা হবে এবং এতে করে এই অঞ্চলে টোকিওর নিরাপত্তাগত ভূমিকা বৈধ ও সম্প্রসারিত হবে। বারাক ওবামার বিদায়ে মধ্যেপ্রাচ্যের ইসরাইল, মিশর ও সৌদি আরব খুশি হয়েছে। তারা এই অঞ্চলে বন্ধুদের পরিত্যাগের জন্য ওবামাকে দায়ী করে ট্রাম্পের কাছ থেকে আশা করতে পারে, তিনি পুরনো মিত্রতা ঝালাই করবেন, ইরানের প্রতি আরো কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবেন।

আপনি যদি বড় শক্তি হন এবং আপনার মন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন, তবে অনেক দেশের সামনেই আপনার নীতি মেনে নিতে বাধ্য হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। আমেরিকার প্রতিবেশী ও বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডা ইতোমধ্যেই নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট নিয়ে নতুন করে আলোচনায় প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায় এই চুক্তিটি হলো আমেরিকার সবচেয়ে বড় চাকরিখোর।

অবশ্য অনেকে এমন আশাও করছেন, ওয়াশিংটনে দায়িত্ব পালন করার সাথে সাথে চরম বাগাম্বড়তাপূর্নতা ছেড়ে ট্রাম্প মধ্যপন্থাই অবলম্বন করবেন। অন্য কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে নানা ধরনের বিপরীতমুখী বক্তব্য ছিল। এগুলো প্রয়োগ করা সহজ নয়।

তবে দিল্লির কর্মকর্তাদের উচিত ওয়াশিংটনে ধারাবাহিকতার বদলে ব্যাপক পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করা। ট্রাম্প অবশ্যই ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকদের সাথে কোনো না কোনো ধরনের খাপ খাওয়ানোর পন্থা খুঁজে নেবেন। কিন্তু তবুও তার অনেক সমর্থকের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির প্রতি প্রবল ভাবাবেগকে তিনি স্রেফ উড়িয়ে দিতে পারবেন না। ট্রাম্প তার আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতিতে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে এলেও ইউরেশিয়ার ভূরাজনীতি আর আগের মতো থাকবে না।

লেখক : পরিচালক, কার্নেগি ইন্ডিয়া, দিল্লি এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সম্পাদক