Home » প্রচ্ছদ কথা » বৈষম্যপূর্ণ কর্মহীন প্রবৃদ্ধি নিয়ে ‘রাজনৈতিক উচ্ছাস’

বৈষম্যপূর্ণ কর্মহীন প্রবৃদ্ধি নিয়ে ‘রাজনৈতিক উচ্ছাস’

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে অনেক অর্থনীতিবিদই বলেছেন, জিডিপির মধ্যে একটি দেশের মানুষের উন্নয়ন, সন্তুষ্টি বা সমৃদ্ধি পরিমাপের কিছু নেই। এসব বোঝার জন্য ভিন্ন উপায় খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা। তাদের মতে, জিডিপি দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাপা যায়, কিন্তু দেশের মানুষের ভালো-মন্দের কিছুই বোঝা যায় না। একটি সুষম অর্থনীতির দেশ প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে; অর্থাৎ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ও সুখী জীবন যাপন করবে, চরম বৈষম্য ও পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা পাবে। কিন্তু জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধিও এসবের নির্দেশক নয়। অর্থাৎ জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ কতটা ভালো আছে তা জানার জন্য যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো জিডিপির বাইরে পাঁচটি সূচক ব্যবহার করার ঘোষণা দেন। এগুলো হলো- ভালো চাকরি, সরকারি নীতির ভালো-মন্দ, পরিবেশ সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও সুস্বাস্থ্য।

বাংলাদেশ এক দশকের বেশি সময় ধরে ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছে। গেল অর্থবছরে সেটি ৭ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে দাবি করছে সরকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে কি মানুষের অবস্থার খুব কী বেশি উন্নতি হয়েছে? এ প্রবৃদ্ধি কর্মহীন ও বৈষম্যপূর্ণ। কর্মহীন প্রবৃদ্ধি কথাটি প্রথম ব্যবহার করে ইউএনডিপি। সংস্থাটি ১৯৯৩ সালে তাদের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে এই পদবাচ্য সর্বপ্রথম ব্যবহার করে। এই প্রতিবেদনের ভাষ্য মতে, বিশ্বের অনেক দেশই এই এক নতুন পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে। এসব দেশে উচ্চ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়ছে না। এমন এক কর্মহীন প্রবৃদ্ধি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। তাই আমাদের ভাবতে হবে কর্মহীন প্রবৃদ্ধি না বাড়িয়ে দেশকে কী করে আমরা কর্মসমৃদ্ধ প্রবৃদ্ধির বলয়ে উন্নীত করতে পারি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণে জানা যায়- ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি; বরং কর্মসংস্থান কমছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহযোগিতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রণীত ‘এমপ্লয়মেন্ট ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক পর্যালোচনায় এ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে এ সংস্থাটি বলেছে, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর থেকে ২০০৫-২০০৬ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। একই সময়ে কর্মসংস্থানের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০৬-২০০৭ অর্থবছর থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১১ শতাংশ।  এ সময়ে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি না বেড়ে বরং কমে যায়। এ সময় কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিদেশি কর্মীরা যে পাঁচ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে, তাও এ দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভ‚মিকা রাখছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে হ্যাকাররা যে আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করেছে, সেটিও চলতি অর্থবছরের জিডিপির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।  এ টাকা ফেরত পাওয়া গেলেও নতুন করে জিডিপিতে যোগ করা হবে না। প্রবাস থেকে বাংলাদেশিরা যে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাঠায় বছর বছর, তার জায়গাও নেই জিডিপির হিসাবে। এক্ষেত্রে দুটি দেশের কথা ভাবা যাক। দুটি দেশই এক বছরে ১০০ টাকার পণ্য ও সেবা উৎপাদন করেছে। অর্থাৎ তাদের জিডিপি সমান। কিন্তু একটি দেশের সরকার ১০০ টাকার মধ্যে ৯০ টাকা অপ-ব্যবহার করেছে। আরেক দেশের সরকার ১০০ টাকা জনগণের কল্যাণে সমহারে ব্যয় করেছে। এই দুই দেশের মধ্যে কোনটি ভালো, তা জিডিপি দেখে বোঝা যায় না। ফলে শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেখে একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঠিক চিত্রও বোঝা যায় না। তা সত্ত্বেও উন্নয়নশীল দেশগুলো জিডিপির উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিসের মতে, জিডিপি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা পরিমাপের সঠিক উপায় নয়। এটি নাগরিকের অবস্থার ভালো-মন্দ তুলে ধরতে পারে না। ২০০৯ সাল বাদে প্রতিবছরই যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। কিন্তু বেশির ভাগ নাগরিকের জীবনমান ৩৩ বছর আগের মানের চেয়েও খারাপ দশায় পৌঁছেছে। অর্থনীতির সুফল চলে গেছে সর্বোচ্চ সম্পদশালীদের কাছে। আর নিচের দিকে এখন যে মজুরি রয়েছে, প্রকৃত অর্থে এটি ৬০ বছর আগের মজুরির চেয়ে কম।

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল ভোগ করেছে ধনীক শ্রেণী। বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে মানুষের সম্পদ বেড়েছে তিনগুণ; আর প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা সংস্থা ক্রেডিট সুসির সাম্প্রতিক  এক জরিপে উঠে এসেছে এ তথ্য। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দিন দিন বাড়তে থাকায় বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে। ক্রেডিট সুসির তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজার সালে বাংলাদেশের মোট প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ২৬ লাখের বেশি। আর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি এসে তা ১০ কোটি ৭২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দুই হাজার সালে বাংলাদেশের মানুষের হাতে ৭৮ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ছিল। ১৫ বছরের মাথায় তা বেড়ে হয়েছে ২৩৭ বিলিয়ন। ক্রেডিট সুসির হিসেবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি। পূর্ণবয়স্ক নাগরিকদের ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশের হাতে যে সম্পদ রয়েছে, তার পরিমাণ মাথাপিছু দশ হাজার ডলার বা ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকার কম। বাকিদের সম্পদের পরিমাণ গড়ে দশ হাজার থেকে এক লাখ ডলারের মধ্যে। এদের মধ্যে ১২ লাখ বাংলাদেশিকে ‘মধ্যবিত্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ক্রেডিট সুসি, যাদের প্রত্যেকের হাতে অন্তত ১৭ হাজার ৮৮৬ ডলারের সম্পদ রয়েছে। মানুষের সম্পদ বাড়লেও বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অবস্থানের খুব একটা নড়চড় হয়নি।  দুই হাজার সালে বাংলাদেশিদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল বৈশ্বিক সম্পদের শুন্য দশমিক ১ শতাংশের কম; এখনও তাই।

সরকার গেল কয়েক দিনে দাবি করছে, তারা দারিদ্র্য কমিয়ে আনতে পেরেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ প্রায় চার কোটি মানুষ এখনো খাদ্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের খাদ্য সংকট প্রকট। এমনকি তিনবেলা পেটপুরে খাওয়া তাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ইচ্ছেমতো বৈচিত্র্যময় খাবার সংগ্রহ করতে পারে না; তারা অপুষ্টিরও শিকার। নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও এখনো প্রতি তিনজনে একটি শিশু নিপীড়নের শিকার। নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও গত কয়েকবছরে দেশের অতি অপুষ্টিহীনতার হার সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। দেশের গ্রামাঞ্চল ও বস্তিতে এ প্রবণতার হার বেশি। সরকারের কথা সত্য ধরে নিলে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ হতদরিদ্র। এরা অনেকেই ভিক্ষুক; দুই বেলা খেতে পায় না। হতদরিদ্র এসব লোকজন তাদের ভাগ্যকে অভিসম্পাত দেয়। অথচ তাদের স্বজন এবং পরিবারের লোকজন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে প্রাণ দিয়েছে, চরম নির্যাতন ভোগ করেছে,  দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার হিসাবে এই ১২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ হচ্ছে প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ। এর অর্থ হচ্ছে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে দুই কোটি ৮০ লাখ মানুষ দুই বেলা খেতে পায় না। জীবনে বেঁচে থাকার জন্যে প্রতিদিন-প্রতিরাত সংগ্রাম করে তারা, বেদনায় অশ্রু বিসর্জন করে নীরবে-নিভৃতে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, আনন্দ তাদের কাছে অপরিচিত শব্দ। তারা শুধু শুনতে পায় কান্না, নবজাতকের আর্তনাদ, প্রবীণের আহাজারি। বিশ্বের প্রায় ১৭৫টি দেশ আছে যাদের মোট জনসংখ্যা দুই কোটির কম। সাম্প্রতিক হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী লোকজনের পরিমান হচ্ছে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। যার অর্থ হচ্ছে- প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ সীমার নিচে বসবাস করে। এই চার কোটি মানুষ সত্যিই গরিব।

হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে বা খানা আয় ও ব্যয় জরিপ মোতাবেক এ দেশের আয়-বৈষম্য পরিমাপক ’গিনি সহগ’ ২০০৫ সালে শূন্য দশমিক ৪৬৭ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল এবং ২০১০ সালের একই জরিপে ওই সহগ শূন্য দশমিক ৪৬৫-এ রয়ে গেছে। তার মানে ওই পাঁচ বছরে আয়-বৈষম্য আর না বাড়লেও কমানো যায়নি। (২০১৫ সালের হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভের ফল এখনো পাওয়া যায়নি)। কোনো দেশের গিনি সহগ শূন্য দশমিক ৫ অতিক্রম করলে ওই দেশকে ‘উচ্চ আয়-বৈষম্যের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; আমরা তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ২০১০ সালের উপাত্ত মোতাবেক এ দেশের ১০ শতাংশ ধনী ব্যক্তি দেশের ১০ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১৮ গুণ বেশি আয় ও সম্পদের মালিক। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি পরিবারের কথা বলা হতো, যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ওই ২২ পরিবারের মধ্যে দুটো পরিবার ছিল পূর্ব পাকিস্তানের, এ কে খান ও ইস্পাহানি (অবাঙালি)। ওই বাংলাদেশেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক ২০১৫ সালে কোটিপতির সংখ্যা ৫৭ হাজার অতিক্রম করেছে। গত ২৬ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে এক কোটি টাকার বেশি আমানতের অ্যাকাউন্ট রয়েছে লক্ষাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল একটি ক্ষুদ্র অথচ ধনীক জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়ে যাওয়ার বিপদ সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যাথা নেই।

মোট আয়ে দরিদ্রদের আয়ের অংশ ১৯৯১-৯২ সালে ছিল ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ; যা ২০১০ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২২ শতাংশে। নিম্ন মধ্যবিত্তদের আয়ের অংশও এ সময়ে ১০ দশমিক ৮৯ থেকে ৯ দশমিক ১০ শতাংশে নামে। আর মধ্যবিত্তদের আয়ের অংশ ১৫ দশমিক ৫৩ থেকে কমে গিয়ে ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে যায়। অন্যদিকে সবচেয়ে উপরের ১০ শতাংশের আয়ের অংশ ২৯ দশমিক ২৩ থেকে বেড়ে ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশে উঠে যায়। এসব পরিসংখ্যান (যেগুলো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ থেকে প্রাপ্ত) থেকে এটা স্পষ্ট যে, আয়ের বণ্টনের দিক থেকে দেখলে গত দুই দশকে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অবস্থার অবনতি ঘটেছে, আর উচ্চবিত্তরা উঠেছে উপরের দিকে।

আয়ের বণ্টনে অসাম্য বৈষম্যের একটি মাত্র দিক। আসলে বৈষম্য বহুমাত্রিক বিষয়; আয় ছাড়াও রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো বিষয়ে শ্রেণীবৈষম্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য, গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য। শিক্ষার কথাই ধরা যাক। এ কথা বলতে হবে যে, দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের জন্য শিক্ষা খাতে অনেক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এ শ্রেণীর শিশু-কিশোররা যে ধরনের স্কুলে যায় আর সেসব স্কুলে কী মানের শিক্ষা দেয়া হয়, সেটা উচ্চবিত্তদের শিক্ষার মানের সঙ্গে তুলনা করলেই এক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্রটি কিছুটা হলেও পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য যে বিরাট, তা সহজেই বলা যায়। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের ক্ষেত্রে চিত্রটা এত পরিষ্কার নয়। শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য হয়তো কমেছে, কিন্তু জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কর্মসংস্থান, বেতন ও মজুরির ক্ষেত্রে এ কথা কি জোর দিয়ে বলা যায়? খুব সম্ভবত না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে, ২০০৫-১০ সময়কালে গ্রাম ও শহরের মধ্যে গড় আয়ের পার্থক্য কমেছে। বস্তুত গত কয়েক দশকে গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে, ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ সুসংবাদের পেছনেও রয়েছে শ্রেণীবৈষম্য। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ১৯৯১-৯২ থেকে গ্রামাঞ্চলেও আয় বণ্টনে অসাম্য বেড়েছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন হতে প্রাপ্ত আয় থেকে দরিদ্র ও নিম্নবিত্তরা উচ্চবিত্তদের তুলনায় কম সুফল পেয়েছে।

অনেক কারণেই অসাম্য বৃদ্ধি কাম্য নয়। প্রথমত. নৈতিক অবস্থান থেকে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, শুধু প্রবৃদ্ধিও যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে অসাম্যের লাগাম টেনে রাখা উচিত। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাজার সৃষ্টি ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। সুতরাং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর আয় দ্রুত বাড়লে তা ভোগ ও চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে-এটা বোঝার জন্য শক্তিশালী অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। চতুর্থত, উচ্চপ্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাস (এবং সম্পূর্ণভাবে দূর করা) যদি লক্ষ্য হয়, তাহলেও অসাম্যের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কেন? প্রবৃদ্ধি হলেই তো দারিদ্র্য কমে যাওয়ার কথা। অবশ্যই প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য কমানোর একটি জরুরি পূর্বশর্ত। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি যথেষ্ট নয়। কী ধরনের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী প্রশ্ন- অসাম্য কমছে না বাড়ছে, সে বিষয়টি। উন্নয়নের নিম্ন স্তরে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য যে হারে বাড়ে, উপরের স্তরে কিন্তু সে হার কমে যায়। সুতরাং এখন লক্ষ রাখতে হবে যে, দারিদ্র্য হ্রাসের হারে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। দারিদ্র্য হ্রাসের হার ধরে রাখতে হলে অসাম্য হ্রাসের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।