Home » আন্তর্জাতিক » রোহিঙ্গা নিধন : সু চি’র হাতে কিভাবে এখনও নোবেল শান্তি পুরস্কার?

রোহিঙ্গা নিধন : সু চি’র হাতে কিভাবে এখনও নোবেল শান্তি পুরস্কার?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, সিএনএন ও ইকোনমিস্ট অবলম্বনে

‘ভাইয়েরা, দেখো, এটা দেখো,’ লোকটা একটা পোড়া বাড়ির ছবি তুলছিলেন। কাদা আর ছাইয়ের মধ্য থেকে লাশগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বাংলাদেশ লাগোয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে গুটিকতেক যে ভয়াবহ ভিডিও বাইরের দুনিয়ায় এসেছে, এটা তারই একটা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্যানুযায়ী, গত মাসের সহিংসতার পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী চলমান দমন অভিযানের অংশ হিসেবে গ্রামের পর গ্রাম ধরে শত শত বাড়ি ধ্বংস করে দিয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, স্থানীয় জঙ্গি গ্রুপগুলো এসব আগুন লাগিয়েছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্য ভিন্ন। গত কয়েক দিনে সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে অনেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসারও চেষ্টা করেছে।

সহিংসতা ও নীরবতা :

রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বশেষ দফার সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে অক্টোবরের প্রথম দিকে। ওই সময় ৩০০’র মতো সশস্ত্র একটি গ্রুপের হামলায় কয়েকজন সৈন্য ও পুলিশ নিহত হয়। তারপর মিয়ানমার সামরিক বাহিনী অভিযান শুরু করে। এতে কয়েক ডজন নিহত হয়, গ্রেফতার হয় অন্তত ২৩০ জন। মানবাধিকার গ্রুপগুলোর হিসাব মতে, মৃতের সংখ্যা কয়েক শ’ হবে।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরাট অংশের বাস। রাষ্ট্রহীন এই সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীটি বছরের পর বছর ধরে বৈষম্য আর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমার সরকার তাদেরকে ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তাদের মতে, এরা হলো অবৈধ বাঙালি অভিবাসী।

অনেকেই আশা করেছিল, মিয়ানমারের বেসামরিক সরকার, বিশেষ করে নোবেল পুরস্কারজয়ী অঙ সান সু চি সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন।

গত বছরের জাতীয় নির্বাচনে সু চি’র নেতৃত্বে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) বিপুল বিজয় লাভ করে। এতে করে দুই যুগের বেশি স্থায়ী নির্মম সামরিক শাসনের অবসান ঘটে।

অবশ্য সাবেক জান্তার প্রণীয় সংবিধানের আওতায় সামরিক বাহিনী পার্লামেন্টের ২৫ ভাগ আসন ধরে রেখেছে। নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিও তারা তদারকি করে।

মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর, তাতমাডো, নেতৃত্বে আছেন সিনিয়র জেনারেল মিন আঙ হ্লাইঙ। সাবেক লৌহমানব থান শু ২০১১ সালে তার উত্তরসূরি হিসেবে তাকে নিয়োগ করেছিলেন।

রাখাইনে অভিযান চালাচ্ছে সামরিক বাহিনী। তবে সরকার কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় মানবাধিকার গ্রুপগুলো হতাশা প্রকাশ করেছে।

ব্যাংককভিত্তিক ফোরটিফাই রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথু স্মিথ বলেন, ‘সরকার সরাসরি মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। সরকার যে ধরনের লংঘনকে অস্বীকার করছে, তা দেশের সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি :

মিয়ানমারে এক কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বলেছেন, রাখাইনে এ ধরনের সহিংসতা অব্যাহত থাকলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।

জাতিসংঘ দূত জয়নব হাওয়া বাঙ্গুরাও নারীদের প্রতি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ভয়াবহ জাতিবিদ্বেষপ্রসূত সহিংসতার উল্লেখ করেছেন। ওই অঞ্চলে মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমার সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে।

সিএনএন অনেকবার সু চি’র অফিসের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সফল হয়নি।

হতাশা :

গত সেপ্টেম্বরে সিএনএনের সাথে এক সাক্ষাতকারে সু চি বলেছিলেন, তার সরকার আমরা যেমন চাই, তেমন সম্প্রীতি, সমঝোতা ও সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় অনেক ঝামেলার মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, এটাই আমাদের সামনে আসা একমাত্র সমস্যা নয়। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়  এটার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি কফি আনান কমিশনের দিকে ইঙ্গিত করেন।

তবে এখন সু চি’র এ ব্যাপারে ভয়াবহ নীরবতা মনে হচ্ছে, তিনি কিছুই শুনছেন না। আর এটাই বিশ্লেষকদের কাছে ভয়াবহ উদ্বেগজনক মনে হচ্ছে।

মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের মধ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রবল অনুভূতি রয়েছে। দেশটির মূলধারায় মুসলিমবিরোধী বাগাড়ম্বরতা দিন দিন বাড়ছে। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা।

সামরিক বাহিনীর নির্যাতন :

গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের আগে ও পরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের ভয়াবহ অনেক অভিযোগ ছিলে ও আছে। সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংস নির্যাতনের অনেক ঘটনা মানবাধিকার সংস্থাগুলো তুলে ধরেছে। সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে রোহিঙ্গারা। রাখাইন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে সামরিক বাহিনী। তারা নানা আশঙ্কার কথা বলে অন্য কাউকে সেখানে প্রবেশের সুযোগ দিতে চায় না।

ম্যাথু স্মিথের মতে, এখন রাখাইন রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘নির্মূল অভিযান’ শুরু হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

তিনি বলেন, অক্টোবরের কথিত হামলার আগেই রাখাইন রাজ্য কর্তৃপক্ষ মুসলিম মালিকানাধীন সম্পত্তি ধ্বংস করার কাজ শুরু করেছিল। আরেকটি ঘটনার জের ধরে তারা বর্তমান কাজটি করছে।

ইকোনমিস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছে, চার শতাধিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর বাস্তুহারা হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি। ১,২৫০টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এসব নির্যাতন, নৃশংসতায় একটুও শব্দ করছেন না শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চি। তার এই দুর্বোধ্য আচরণে বিশ্ববিবেক হতবাক। অনেকে ক্ষোভে, ক্রোধে তার নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে। এমন অশান্তির মধ্যেও যে শান্তিতে ঘুমাতে পারে, তার হাতে কিভাবে শান্তি পুরস্কার থাকতে পারে, সে প্রশ্ন তারা তুলছে।