Home » আন্তর্জাতিক » ট্রাম্পের ‘বিকৃত’ দৃষ্টিভঙ্গি কী পাশ্চাত্যকে হুমকিতে ফেলবে?

ট্রাম্পের ‘বিকৃত’ দৃষ্টিভঙ্গি কী পাশ্চাত্যকে হুমকিতে ফেলবে?

ক্রিস প্যাটেন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

আমি আমার পুরো রাজনৈতিক জীবন কাটিয়ে দিয়েছি ‘পাশ্চাত্য’ (দি ওয়েস্ট) নামে পরিচিত কোথাও না কোথাও । না, এটা আক্ষরিকভাবে ‘পাশ্চাত্য’ নয়, তবে এর কেন্দ্রভূমি পশ্চিম ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, আর এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো দূরের বহু দূরের দেশও রয়েছে। একে বরং অভিন্ন আশা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটা সম্প্রদায় বলা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিফলনকারী এই ‘পাশ্চাত্য’ যুক্তরাষ্ট্রের ‘হার্ড পাওয়ার’ দিয়ে সুরক্ষিত এবং ‘সফট পাওয়ার’ দিয়ে গঠিত।

পাশ্চাত্য অনেক দিন ধরেই বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে যাচ্ছে। সম্ভবত এটাই এ যাবৎকালের সবচেয়ে সফল ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়েছে, সমবায়ের ব্যবস্থা করেছে এবং অভিন্ন সমস্যাবলীর অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থাপন করেছে। শান্তি বজায় রাখা এবং বিশ্বের বেশির ভাগ এলাকায় সমৃদ্ধি বাড়ানোর এর দৃষ্টিভঙ্গি ও মূলনীতি কোটি কোটি অনুসারীকে আকৃষ্ট করেছে।

অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় এই পুরো ব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তিনি তার রূঢ় ও অর্বাচীনমূলক নির্বাচনী প্রচারণাকালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বাস্তবায়ন যদি  করেন, তবে অত্যন্ত পরিশীলিত সৃষ্টিগুলো ধ্বংস করে ফেলবেন। অথচ এটা সৃষ্টি হতে লেগেছে অনেক দশক এবং এতে কোটি কোটি মানুষ উপকৃত হয়েছে। আমেরিকানদের মতো আমরা যারা এ থেকে লাভবান হয়েছি, আমাদেরকে এটা টিকে থাকা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

ট্রাম্পকে কোনোভাবেই একটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। সেটা হলো বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ। বিশ্বায়নের কারণে আয় বৈষম্য বাড়ছে, আমেরিকার শ্রমজীবী শ্রেণীর অবস্থা খারাপ হচ্ছে – এই বিশ্বাসে তিনি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো বাতিল করতে চাইছেন এবং নতুন নতুন চুক্তি করার আলোচনা থেকে সরে আসতে চাইছেন। অথচ আমেরিকার শ্রমজীবীদের অর্থনৈতিক দুর্দশার আসল কারণ হলো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং কর-ও-ব্যয় নীতিগুলো ধনীদের অনুকূলে থাকা।

ট্রাম্প যদি মেক্সিকো ও কানাডাকে নিয়ে নর্থ আমেরিকান ফ্রি-ট্রেড এগ্রিমেন্ট (নাফতা) থেকে সরে আসেন, ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ অনুমোদন না করেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন, তবে তা তাকে ভোট দেওয়া লোকজনকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে। আর তিনি বিদেশে বন্ধু ও প্রভাব খোয়াবেন।

ট্রাম্প আরেকটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ নিতে পারেন। সেটা হলো জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ এবং ন্যাটোর মতো সংস্থার সাথে করা আমেরিকার নিরাপত্তা চুক্তি থেকে সরে আসা। ট্রাম্পের বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে না তার মিত্রদের ‘মাগনা’ নিরাপত্তা দেওয়া। তাদের উচিত নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করা।

বাস্তবে এ ধরনের অবস্থান অত্যন্ত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী। তেমনটি করা হলে পূর্ব ইউরোপ ও বাল্টিক দেশগুলো থাকবে রাশিয়ার দয়ায়। আর এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পরমাণু বিস্তারের ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ে থাকতে না পারলে নিজেদের পরমাণু অস্ত্র ভান্ডার গড়ার পথ ধরবে। অবশ্য ট্রাম্প বলেছেন, এ ধরনের অবস্থান গ্রহণযোগ্য।

ট্রাম্প ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কেউ কি মনে করে, ইরান আবার তার অস্ত্র কর্মসূচি আবার শুরু করলে সৌদি আরব বসে থাকবে? বারাক ওবামার অন্যতম সেরা অর্জন ওই চুক্তিটির- সমালোচনা করে ট্রাম্প নির্বাচনী ফায়দা লুটেছেন, তবে বাস্তবে তিনি তা বাতিল করতে চাইলে বিশ্ব আরো বেশি বিপজ্জনক স্থানে পরিণত হবে।

ট্রাম্পের ঘোষিত জলবায়ু পরিবর্তন দৃষ্টিভঙ্গি স্রেফ সমস্যা প্রবণ। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরন কমিয়ে আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের রাশ টেনে ধরার প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসার কথাও তিনি ঘোষণা করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অস্বীকারকারী ম্যারোন ইবেলকে তিনি ইতোমধ্যেই অন্তর্বর্তীকালে মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তদারককারী নিয়োগ করেছেন।

ট্রাম্পের বিশ্বাস, মানুষের কার্যক্রমের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের যে কথা প্রচার করা হচ্ছে, তা স্রেফ ধোঁকাবাজি। মার্কিন শিল্পকে কম প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য চীন এটা উদ্ভাবন করেছে। চীনের বিরুদ্ধে এই একটি অভিযোগ করেই ক্ষান্ত থাকেননি ট্রাম্প। এই দেশটির বিরুদ্ধে বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের বৈরী মনোভাবের ফলে ইতোমধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ট্রাম্পের আমলটি অস্তিত্বগত হুমকিও সৃষ্টি করতে পারে। প্রান্তিক গ্রুপগুলোর প্রতি- মুসলিম, মেক্সিকান, নারী ও অসমর্থ্য লোকজন- তার অবমাননাকর মন্তব্য আমেরিকার মূল পরিচিতি এবং বিশ্বে আমেরিকার স্থান এবং পাশ্চাত্যকে এক সুতায় বেঁধে রাখার ব্যবস্থাকেই ঝুঁকিগ্রস্ত করে ফেলেছে।

মার্কিন নেতৃত্বে ধসের ফলে ১৯৪৫-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার দ্রুত সমাপ্তি কিভাবে ঘটাতে পারে, সেটা যারা এখনই বুঝতে পেরেছেন, তাদের অন্যতম হলেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেল। ট্রাম্পের জয়ে তার প্রতিক্রিয়া ছিল জলদগম্ভীর ও শক্তিশালী : জার্মানি ও আমেরিকা গণতন্ত্র, স্বাধীনতার মূল্যবোধ এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, মানুষের মর্যাদা, উৎস, গায়ের রং, ধর্ম, জেন্ডার, যৌন আচার বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বাধীনতার মূল্যবোধে সম্পর্কযুক্ত।’ মারকেল ঘোষণা করেছেন, এসব মূল্যবোধের ভিত্তিতেই তিনি ট্রাম্পের সাথে কাজ করবেন।

আমেরিকার সব মিত্র ও বন্ধুর উচিত এভাবেই তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা। মারকেলের মতোই আমাদের সবারই উচিত পাশ্চাত্যের অবস্থান এবং এর অর্জন নিয়ে কথা বলা। আইনের শাসন এবং মুক্ত সমাজের ধারণা সঙ্কুচিত করার ট্রাম্পের যেকোনো পদক্ষেপকে আমাদের সমালোচনা করতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই মুক্ত বাণিজ্যের জন্য কথা বলতে হবে। কারণ মানব জাতির জন্য এর সুদূরপ্রসারী কল্যাণ রয়েছে। আমাদেরকে অবশ্যই ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি সমুন্নত রাখা এবং বিশ্বজুড়ে পরমাণু বিস্তার রোধের জন্য লড়াই করতে হবে।

পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে রুশ অভিযানের বিরুদ্ধেও আমাদের প্রতিশ্রুতি আবারো প্রকাশ করতে হবে।

পরিশেষে আমাদের জোরালোভাবে বলতে হবে, আমরা পাশ্চাত্য যদিও চীনের বণিকবাদী নীতি এবং দেশে নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের সাথে একমত নই, কিন্তু তবুও আমরা তাদের সাথে কাজ করতে চাই, তাদেরকে প্রান্তিকীকরণ এবং অবদমিত করতে  চাই না।

‘পাশ্চাত্য’ হলো আমেরিকার সেরা অর্জনগুলোর অন্যতম ; অবশ্য এতে আরো অনেক দেশ অবদান রেখেছে। বিশ্বের জন্য এটা হবে সত্যিকারের বিপর্যয়- যদি আমেরিকা আত্মধ্বংসী অধঃপতনমূলক কাজ করে এই মহৎ, বাস্তবতাপূর্ণ ও উদ্দীপনাময় সৃষ্টিকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে।