Home » প্রচ্ছদ কথা » সংলাপের ফলাফল কী হবে?

সংলাপের ফলাফল কী হবে?

আমীর খসরু ::

আগামী বছরখানিক সময়ের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং এ ধরনের একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে- এমনটা ধরে নিয়ে ও চিন্তা-ভাবনা মাথায় নিয়ে বিএনপি কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে। কৌশলের প্রথমটি হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে সব দলকে নিয়ে একটি সংলাপ অনুষ্ঠানে সরকারকে সম্মত করা। সে মতে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া ইতোমধ্যে একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে। আর এরই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আহবান জানানো হয়েছে একটি সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য- যার মাধ্যমে কিনা নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে একটি সার্চ কমিটি গঠিত হতে পারে। রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে অর্থাৎ বঙ্গভবন থেকে এমত একটি সংলাপ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করা হয়েছে। ডিসেম্বরেই এই সংলাপটি অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।

তবে প্রথমেই বিএনপির কৌশল গ্রহণের কারণ ও প্রেক্ষাপটটি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। যেসব কারণগুলো রয়েছে তার কয়েকটি হচ্ছে- এক. ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত এই দলটি অর্থাৎ বিএনপি কোনোভাবেই জনগণের কাতারে এসে দাঁড়াতে পারেনি এবং কোনো জনসম্পৃক্ত ইস্যুতেই তারা কখনোই সম্পৃক্ত হয়নি। বিএনপি যতোটা না বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের ব্যক্তিকেন্দ্রীক বিষয়কে রাজনৈতিক ইস্যু বানানোর চেষ্টা করেছে, তার ছিটেফোটা সময় ব্যয় বা চিন্তা পর্যন্ত তারা করেনি জনসম্পৃক্ত কোনো ইস্যুতে। দুই. আগাগোড়া নেতৃত্বের পর্যায়ে সিদ্ধান্তহীনতা, চরম পর্যায়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং সমন্বিত ও কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণই তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। লন্ডনে বসে থাকা তারেক নির্ভরতা দলটিকে যতোটা না লাভের মুখ দেখিয়েছে তার চেয়েও লক্ষ কোটি গুণ লোকসানের মধ্যে তাদের পড়তে হয়েছে। তারেক বন্দনায়ই অনেক সময় ব্যয় করেছে কতিপয় নেতা। এতে যে শীর্ষ পর্যায়ের সায় ছিল না, তা বলা যাবে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ঢাকা না লন্ডন-এমন দোদুল্যমানতা বিএনপির জন্য সীমাহীন ক্ষতির কারণ হয়েছে। ওই সময় তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা চূড়ান্ত পর্যায়ে তৈরি থাকলেও, একমাত্র মির্জা ফখরুল বাদে অন্য তেমন কোনো কেন্দ্রীয় নেতাই মাঠের ধারে-কাছেও ছিলেন না। তিন. এই অবস্থায় ২০১৫ সালে আন্দোলনের ডাক দিয়ে শেষ পর্যন্ত তৃণমূল নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করে নতুন একটি আন্দোলনের উদ্যোগ পর্যন্ত নিতে না পারায় দলটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চার. স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই-এ দলটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সীমাহীন অভিযোগ উঠলেও শীর্ষ পর্যায়ের নির্লিপ্ততা বহু নেতাকর্মীকে যেমন ক্ষুদ্ধ করেছে, তেমনি মনোবলও ভেঙ্গে দিয়েছে অনেকের। বিশেষ করে মতলবী প্রার্থী বাছাই দলটিকে তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পাচ. দলটি নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে অধিকমাত্রায় বিদেশী শক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিএনপি মনে করছে, পশ্চিমা শক্তিসহ বিদেশীরা নির্বাচন এনে দেবে ও  বিএনপি তাতে অংশ নেবে এবং জনগণ তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে দলটিকে জয়লাভ করিয়ে দেবে। বিশেষ করে দলটি ভারত প্রশ্নে সীমাহীন দ্যেদুল্যমানতার পরিচয় দিয়েছে। ভারতের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর বিজয়ে দলটির উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের ধারণা ছিল, মোদী ক্ষমতায় এলে ভারতই সবকিছু ঠিকঠাক করে দেবে। আন্তর্জাতিক পররাষ্ট্রনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়াবলী সম্পর্কে ধারণা না থাকলে যা হয়- দলটির ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। ছয়. শেষমেষ দল গোছাতে ব্যর্থ হয়ে, কেন্দ্রীয় সম্মেলন দিয়ে দল গোছানো ও দলকে বেগবান করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় সম্মেলন দেয়া হলেও এতে কোনো কাজ হয়নি; শুধুমাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হয়েছেন মাত্র। সাত. সব মিলিয়ে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো ইস্যুতেই দলটি সরকারকে বাধ্য করার মতো কোনো পরিবেশ-পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারেনি।

দুই.

বিএনপি নতুন করে আন্দোলন শুরুর অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন প্রশ্নে সংলাপের কৌশল নিয়েছে।  সরকারি দল এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। ২০১২ সালেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সংলাপ করেছিলেন নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে একটি সার্চ কমিটি গঠনসহ এ জাতীয় কার্যক্রম সম্পন্নের জন্য। তার কি ফলাফল হয়েছে তা সবারই জানা আছে। ৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘সকল দলের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি যেভাবে চাইবেন, সেইভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। আমরা তা মেনে নেবো। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক সেটাই আমরা চাই। আজকে গণতন্ত্রের যে সুষ্ঠু ধারা সৃষ্টি হয়েছে, সেটা অব্যাহত থাকুক।’ তাহলে এক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি যে, প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে কিভাবে মূল্যায়ন করেন? এখানে আরও একটি প্রশ্ন জরুরি যে, নতুন যে নির্বাচনটি হবে তাই বা কোন ধরন এবং ধারা অনুসরণ করবে?

তবে একটি বিষয় কেউ উল্লেখ করছেন না যে, নির্বাচন কমিশন পুনঃগঠন সংবিধানের ১১৮ ধারা মোতাবেক রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার হলেও বাস্তবে তিনি কি ইচ্ছা থাকলেও বা চাইলেই ক্ষমতাসীন সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবেন? সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘….বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’

তবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সকল দলের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি যেভাবে চাইবেন, সেই ভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। আমরা তা মেনে নেবো।’ কিন্তু  সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেনঃ

তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোন পরামর্শদান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সবক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়েই দায়িত্ব পালন করবেন। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেও তা প্রধানমন্ত্রী মেনে নেবেন কিনা? কাজেই সরকার কতোটা আন্তরিক এবং সদিচ্ছাপ্রবন হবে, তার উপরই আগামী সংলাপের ফলাফলটি নির্ভর করছে। আন্তরিকতা যদি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও একে কেন্দ্র করে যা যা হয়েছিল সেমতো হয়, তাহলে আগাম বলে দেয়া যায় যে, এবারেও সংলাপের ফলাফল কি হবে?