Home » বিশেষ নিবন্ধ » মওলানা ভাসানী : ইতিহাসের নির্মাতা ও স্রষ্টা (শেষ পর্ব)

মওলানা ভাসানী : ইতিহাসের নির্মাতা ও স্রষ্টা (শেষ পর্ব)

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

১৯৬৬ সালের ৭ জুনের হরতালকে কেন্দ্র করে নিম্নবিত্ত ও শিল্প শ্রমিকরা অংশগ্রহন করলে সরকারী দমন নীতি তুঙ্গে উঠে। এ পরিস্থিতিতেও ন্যাপ নেতৃত্ব অনেকটা নির্লিপ্ত ছিলেন, যদিও কেউ কেউ বিবৃতি দিয়ে নিন্দা করেছিলেন, কিন্তু সাংগঠনিক পদক্ষেপ না থাকায় সরকার বিরোধী আন্দোলনে গতি আসেনি। ১৯৬৭ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার কিছু দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এ সময়ে আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্ব জেলে থাকলেও ছয় দফা ও হরতাল কর্মসূচি জনগনের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করে। ফলে সরকার বিরোধী একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের অবস্থান পাকাপোক্ত হয়।

এ সময়কালে ন্যাপ প্রণীত ১৪ দফায় স্বায়ত্ত্বশাসনের পূর্নাঙ্গ দাবি উত্থাপিত হলেও এর স্বপক্ষে রাজনৈতিক কর্মকান্ড ছিল শিথিল। দলটি সরকারকে সরাসরি আক্রমন থেকেও বিরত থাকছিল। আন্দোলনের জন্য শ্রমজীবিদের ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি সরকার বিরোধিতার প্রশ্ন উহ্য রেখে সামন্ত-বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদীদের আঘাতে প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে জনগনের সামনে তুলে ধরে। এ নিয়ে অভ্যন্তরীন মতবিরোধের এক পর্যায়ে দল বিভক্ত হয়ে যায়। পিকিংপন্থী ন্যাপ (ভাসানী) ও মস্কোপন্থী ন্যাপ (মোজাফ্ফর) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এর মধ্য দিয়ে মস্কোপন্থীরা শ্রমজীবিদের সংগঠিত করা এবং পিকিংপন্থীরা স্বায়ত্ত্বশাসন ও সরকার বিরোধিতার গুরুত্ব অনুধাবন করে।

আওয়ামী লীগের মধ্যেও উপলব্দির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে। এই প্রথম দলটি বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে স্বাধীন অবস্থান নেয়। মার্কিনীদের প্রতি মোহভঙ্গ হয়; তারা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পক্ষে মত প্রকাশ করে। স্বায়ত্ত¡শাসন, সমাজতন্ত্র ও মার্কিন বিরোধিতা-এই তিনটি প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও উভয় ন্যাপ কাছাকাছি হলেও উপলব্দিগত ফারাক বিদ্যমান থাকে। আনুষ্ঠানিক ঐক্য গড়ে না উঠলেও সমঝোতা স্থাপনের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরী হয়।  এটি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রাক-সময়কাল।

১৯৬৮ সালে মওলানা ভাসানী আইয়ুব বিরোধী যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, মাত্র এক সপ্তায় তা সর্বদলীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। কিন্তু প্রচন্ড সরকারী নির্যাতন ও দমন নেমে আসায় আন্দোলন খানিকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করার চিন্তা করে। ভাসানী ন্যাপ শহরভিত্তিক আন্দোলনে আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। শহরের জনগনের সাথে গ্রামীন মানুষের সংগ্রামকে সম্পর্কিত না করা গেলে আন্দোলন যৌক্তিক পরিনতির দিকে যাবে না- এই উপলব্দি মওলানা ভাসানীকে ২৯ ডিসেম্বর সারাদেশের হাট-বাজারে হরতাল পালনে উৎসাহিত করে, যা পরবর্তীকালে “হাট হরতাল” নামে খ্যাতি লাভ করে।

কিন্তু ডিসেম্বরের শুরুতে আন্দোলনের সাময়িক ব্যর্থতার কারণে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। এটি ইপিসিপি-এমএল-র মধ্যেও সংক্রমিত হয়। তারা বিশ্লেষণে ব্যর্থ হয়েছিল যে, একটি বিশাল আন্দোলন সংগঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে ২৯ ডিসেম্বরের হাট হরতালকে তারা অসময়োচিত ও অবিবেচনাপ্রসূত বলে আখ্যা দেয়। এসব সত্ত্বেও ভাসানী ন্যাপ প্রভাবিত এলাকায় হাট-হরতাল অত্যন্ত সফল হয়। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে প্রচার না হওয়ায় শহরাঞ্চলে ন্যাপ কর্মীদের মাঝে আন্দোলনের ভবিষ্যত নিয়ে হতাশা দেখা দেয়।

হাট হরতালকে কেন্দ্র করে পরবর্তী ১ জানুয়ারি হাতিরদিয়া বাজার ও নড়াইলে পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় আন্দোলন নতুনমাত্রা পায়। আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলগুলির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রের প্রকাশিত খবরে হাট হরতাল সম্পর্কে জনগন জানতে পারে এবং এটি যে এক অসামান্য প্রতিবাদ ছিল তা ক্রমশ: স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মওলানা ভাসানী আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন এবং বর্তমান শাসনতন্ত্রের আওতায় কোনভাবেই গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না বলেই স্পষ্ট জানিয়ে দেন।

এই ঘোষনাই ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ন্যাপের কার্যনির্বাহী সভায় সিদ্ধান্ত আকারে গৃহীত হয়। সভায় অভিমত প্রকাশ করা হয়, ১৯৬৪-৬৫ সালের নির্বাচনে পরিষ্কার হয়ে গেছে, বর্তমান শাসনতন্ত্রের আওতায় নির্বাচন হলে তা হবে পুনঃপ্রহসন। এ অবস্থায় নির্বাচনী ঐক্যজোট নয়, দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রামের সূচনা করতে হবে। অবশ্যই এই কর্মসূচিকে সাম্রাজ্যবাদ, নয়া ঔপনিবেশবাদ ও এর দোসর একচেটিয়া পুজিবাদ ও সামন্তবাদবিরোধী সংগ্রামের সাথে সমন্বিত করতে হবে।

পিকিংপন্থী ন্যাপের এরকম সিদ্ধান্ত নেয়ার কারনে অপরাপর দলগুলোর সাথে আইয়ুব সরকার বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে পার্থক্য রচিত হয়েছিল, পরবর্তীকালে রাজনীতি ও নির্বাচনে সূদুরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল। ন্যাপ (ভাসানী) ১৯৬৯ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে দাবি সপ্তাহ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েও পালনে খুব আন্তরিক ছিল না। অন্যদিকে ঐ সময় মওলানা ভাসানী ঢাকাকে প্রায় ত্যাগ করেছিলেন। দলের শীর্ষ নেতাদের নামে হুলিয়া থাকায় তারাও ছিলেন আত্মগোপনে। দাবি সপ্তাহের পক্ষে পার্টি নেতা হাজী দানেশের নামে দু’চারটে বিবৃতি ছাড়া কোন সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়নি।

আওয়ামী লীগ এ সময় খুবই সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১০ জানুয়ারি নান্দাইলের মধুপুরে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেন, “শুধু নির্বাচন বর্জন নয়, এর সাথে সাথে এমন গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে – যাতে সরকার নতি স্বীকারে বাধ্য হয়”। আওয়ামী লীগের এই ব্যাপক সাড়ার মধ্যে মওলানা ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। ফিরেই সাংবাদিকদের বলেন, “এমন গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যেন বর্তমান শাসনতন্ত্রের অধীনে কোন নির্বাচন না হয়। দেশের প্রতিটি মানুষকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামিল করতে হবে, যাতে তারা গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে”।

সাংবাদিকদের এসব কথা বললেও মওলানা ভাসানী কোন কর্মসূচি ঘোষণা করেননি। ১৪ জানুয়ারি হাতিরদিয়ায় এক কৃষক সভায় ডেমোক্রেটিক এ্যালায়েন্সের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে পল্টনে জোটের জনসভা ও মিছিল বন্ধে ১৪৪ ধারা জারির তীব্র নিন্দা জানান। অন্যদিকে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পল্টনে জনসভা ও মিছিল না করায় আট দলীয় এ্যালায়েন্স নেতাদের আপোষকামী চেহারা জনগনের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এরকম পরিস্থিতিতে উভয় গ্রুপ ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ নিয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐতিহাসিক ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। কর্মসূচির মধ্যে আওয়ামী লীগের ৬ দফা, ন্যাপের ১৪ দফা ও ছাত্র সমাজের ১৭ দফার কার্যকর সমন্বয় ঘটেছিল। পূর্বপাকিস্তানের জাতীয় প্রশ্নসহ পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠির আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল। পাশাপাশি কৃষক-শ্রমিক-নিম্নবিত্তসহ সকল নিপীড়িত শ্রেনীর দাবি, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও বৃহৎ পুজিপতিদের একচেটিয়া শোষন অবসানের দাবিও উত্থাপিত হয়েছিল।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ১১ দফা নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের সকল শ্রেনীর জনগন এটিকে গ্রহন করেছিলেন কারন এরমধ্যে কমবেশি সকলের দাবি বিবেচনা করা হয়েছিল। ফলে কোন বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়নি এবং ১১ দফা ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে মধ্য জানুয়ারি থেকে আন্দোলন তৎপরতা বৃদ্ধি করে। ২০ জানুয়ারির মধ্যে আন্দোলন জঙ্গীরূপ ধারন করে এবং ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) কেন্দ্রীয় নেতা আসাদুজ্জামান শহীদ হলে গণঅভ্যুত্থান ত্বরান্বিত হয়।

এ সময়ে ২৩ জানুয়ারি সংবাদপত্রে মওলানা ভাসানী এক দীর্ঘ বিবৃতিতে ২৪ জানুয়ারি ছাত্রদের আহুত হরতাল সমর্থন করেন এবং কার্যকর করতে দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান। কিন্তু আন্দোলনের চরম মুহুর্তে মওলানা ভাসানীর মত নেতার ঢাকায় অনুপস্থিত থাকা ছিল বিষ্ময় ও রহস্যের। এ পর্যায়ে ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) পক্ষ থেকে ন্যাপ নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে তারা সূদুর পাঁচবিবিতে অবস্থানরত ভাসানীকে আনতে গিয়ে তাঁর দেখাই পাননি।

যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন মওলানা ভাসানী, চূড়ান্ত মূহুর্তে তার স্বেচ্ছাগোপন নাকি স্বেচ্ছানির্বাসন- আজও রাজনীতির ইতিহাসে রহস্যময় ও অমীমাংসিত অধ্যায়। যদ্দুর জানা যায়, আগের ডিসেম্বরের আন্দোলন শেষের দিকে স্তিমিত হয়ে গেলে এর সম্ভাব্য বিজয় সম্পর্কে মওলানা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্ত মধ্য জানুয়ারি থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের তুঙ্গ সময়ে, এমনকি আসাদ শহীদ হবার পরে যখন তার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল, সে সময়েও বিবৃতি ছাড়া কিছুই আসেনি তার তরফে।

ফলে পিকিংপন্থী  ন্যাপ নেতারা উত্তাল সেই সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে মূলধারার রাজনীতিতে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে।

তথ্যসূত্রঃ

১. উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান, রাষ্ট্র সমাজ ও রাজনীতি : আজাদ, লেনিন

২. আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর : আহমদ, আবুল মনসুর

৩. সংগ্রামের তিন দশক, রায়, খোকা

৪. কয়েকটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত সাক্ষাতকার : শরদিন্দু দস্তিদার, নুরুল হুদা মীর্জা, আবুল বাসার, ফয়েজ আহমদ