Home » বিশেষ নিবন্ধ » প্রতিভাবান প্রচারবিমুখ একজন শিল্পীর স্মরণে

প্রতিভাবান প্রচারবিমুখ একজন শিল্পীর স্মরণে

হায়দার আকবর খান রনো ::

আমার একথা বলতে ভালো লাগছে যে, অসামান্য শিল্পী এহসানুল আলম খোকন আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আমার চেয়ে এক ক্লাস নিতে পড়তেন, একই স্কুলে। সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল। বয়সে আমার চেয়ে এক বছরের ছোট। জন্ম ১৯৪৩ সালের ৮ মে (২৫ বৈশাখ)। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। পাঠ্য পুস্তকের বাইরে নানা ধরনের বইপড়ার ওপর আগ্রহ ছিল খুব বেশি। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, বিজ্ঞান বহুবিধ বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল অগাধ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ঝোঁক ছিল ছবি আঁকার প্রতি।

এহসানুল আলম খোকন ১৯৫৯ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৬১ সালে আইএসসি, ১৯৬৩ সালে বিএসসি এবং ১৯৬৫ সালে এমএসসি পাস করেন। কিছুদিন অনিচ্ছা সত্তে¡ও ব্যাংকে চাকরি করেছিলেন। তারপর চাকরি ছেড়ে বাকি জীবন ছবি আঁকা ও শিল্প সাধনায় কাটিয়েছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশের ভিতরে অবস্থান করে নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন।

তাঁর শেষ জীবন বেশ দু:খজনক অসুস্থ হয়ে চার বছর অচেতন অবস্থায় থেকে ২০০৪ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তিনি ছিলেন চিরকুমার। তাঁর চার বোন সেতারা, শিউলি, জুয়েলা, সালমা।

এহসানুল আলম খোকন ছিলেন রাজনৈতিক সচেতন প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী এক বিরল শিল্প প্রতিভা। তাঁর প্রতিভার কিছু দিক একেবারেই নিজস্ব। আর কিছু গুণ তিনি অর্জন করেছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তাঁর পিতা মোশাররফ উদ্দিন আহমদ ছিলেন নামকরা প্রকৌশলী। পঞ্চাশের দশকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরিরত অবস্থায় তিনি ছিলেন গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের (সেচ প্রকল্প) পরিকল্পনাকারী ও নির্মাতা। ভাষা আন্দোলনেও তার অবদান ছিল। ভাষা আন্দোলনের অনেক গান তিনি রচনা করেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির পর ভাষা আন্দোলনের উপর প্রথম গানটি তিনিই রচনা করেছিলেন।

মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল

ভাষা বাঁচাবার তরে

আজিকে স্মরিও তারে…

স্বাধীন বাংলাদেশে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছিল ২০১১ সালে।

খোকন যখন স্কুলে পড়েন, তখনই তার পিতা অকস্মাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন ১৯৫৬ সালে।

খোকনের মা শামসুর নাহার আহমদ ছিলেন এক মহিয়সী নারী। শুধু একজন আদর্শ মাতাই নন, একই সঙ্গে তিনি ছিলেন রাজনীতি সচেতন সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। তাছাড়া বন্যাপীড়িতদের জন্য রিলিফের কাজের মতো নানা ধরনের সমাজসেবামূলক কাজে তিনি প্রায়ই জড়িত থাকতেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি ছিলেন ভাসানী রিলিফ কমিটির সাধারণ সম্পাদিকা।

খোকনদের বাড়িতে একদিকে রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের অন্যদিকে কবি লেখক গায়ক শিল্পী ও সাংস্কৃতিকর্মীদের যাতায়াত ছিল। খোকনের চাচা প্রয়াত মহিউদ্দিন আহমদ একজন সুপরিচিত রাজনৈতিক নেতা। খোকনের মা-বাবার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমি ১৯৫৫ সালের দিকে আজিমপুরে খোকনদের বাসাতেই প্রথম মওলানা ভাসানীকে দেখেছিলাম।

খোকনের মানসিক গড়নের ক্ষেত্রে তার বাবা-মার অবদান আছে। শৈল্পিক মন ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তা খোকন সম্ভবত: উত্তরাধিকার সূত্রেই অর্জন করেছেন।

শিল্পী খোকন কয়টা ছবি এঁকেছেন, তা ঠিক আমার জানা নেই। সম্ভবত অনেক আঁকা ছবি হারিয়েও গেছে। খোকন ছিলেন প্রচারবিমুখ। তাই ঢাকায় তাঁর ছবির কোনো প্রদর্শনী হয়নি। তবে আমেরিকায় বোন জুয়েলার বাসায় থাকার সময়ে খোকনের অনিচ্ছা সত্তে¡ও জুয়েলার উদ্যোগে তাঁর সেই সময়ের আঁকা কিছু ছবি প্রদর্শনী হয়েছিল এবং তা যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করেছিল।

খোকন ছিলেন আমাদের সবার থেকে ভিন্ন। বিত্ত-বৈভব নাম সম্মান কোনো কিছুই তাঁকে আকর্ষণ করতো না। তিনি যেন আরেক জগতের মানুষ, শিল্পের জগৎ যেখানে পার্থিব জগতের ক্ষুদ্রতার অনেক ঊর্ধ্বে মানবিকতার বিকাশ সম্ভব হয়। খোকনের ছিল সাহিত্যানুরাগ। তিনি বাংলা-ইংরেজি কবিতা পড়তে ভালবাসতেন। কবিতা লিখতেনও। গানও ভালোবাসতেন। খোকন ছিলেন বন্ধুবৎসল। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন প্রাণ খুলে। তাঁর চমৎকার ব্যক্তিত্ব সকলকে আকৃষ্ট করত। এমন এক প্রতিভাবান হৃদয়বান মানুষ বেশ অপরিণত বয়সেই চলে গেলেন। জীবদ্দশায় তাঁর ছবি ঢাকায় প্রদর্শিত হয়নি। এবার তাঁর বোনদের প্রচেষ্টায় তাঁর আঁকা ছবির ফটো দিয়ে অ্যালবাম প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হলো। নতুন প্রজন্ম চিনুক, জানুক এই মহান শিল্পীকে।