Home » প্রচ্ছদ কথা » ২০১৬ : জঙ্গীবাদীরা যে বার্তাটি দিয়ে গেল

২০১৬ : জঙ্গীবাদীরা যে বার্তাটি দিয়ে গেল

আমীর খসরু ::

বিদায়ী বছরটি বাংলাদেশের জন্য আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিকভাবে তেমন ঘটনাবহুল ছিল না। এ বছরটিতে ক্ষমতাসীনরা আগের ধারাবাহিকতায়ই মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ধারা অব্যাহত রেখেই বিরোধী মত, পথ, পক্ষ এবং অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে দমনের কৌশল গ্রহণ আগের মতোই করেছিল। যে কারণে রাজনৈতিক নানা নিপীড়ন-নির্যাতন, নিখোজ করে দেয়া, গুম, আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর হাতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বেড়েছে। এই ধারা ভবিষ্যতেও জারী থাকবে কিনা- সে প্রশ্নটিই রেখে যাচ্ছে- ২০১৬। সরকারের অঘোষিত যে উদ্যোগ অর্থাৎ বিরোধী দলশূন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা-আপাতদৃষ্টিতে তা সফল হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। বিরোধী দলগুলো ক্রমাগত নির্জীব হয়ে যাচ্ছে; মানুষ রাষ্ট্রীয় নানা সন্ত্রাস, অনিয়মের বিরুদ্ধেও আর সোচ্চার নয়; সবাই যেন কেমন চুপচাপ হয়ে গেছেন; আর এমন এক নিদারুন অস্বস্তিকর চুপ থাকার বা চুপ করিয়ে দেয়ার নীতি একটি রাষ্ট্রের জন্য যে কতোটা ভয়ংকরভাবে ক্ষতিকর তা বোঝার বোধবুদ্ধিটুকুও এখন আর বাকি নেই। বাকি নেই বললে ভুল হবে, এটা লোপ পাওয়ানো হয়েছে বা পেয়েছে বহুকাল আগেই। আর বিষয়টি ইচ্ছাকৃত ও কৌশলগত। তবে একথাটি মনে রাখতে হবে যে, বিরোধী দল, মত, পথ, পক্ষকে আপাত দমন করা গেলেও, মানুষের মনোজগতকে কোনোভাবেই দমন করা যায় না এবং এর উপরে কোনো কর্তৃত্বই জারী করা নিস্ফল।

গণতন্ত্রের বদলে উন্নয়ন এবং অল্প-স্বল্প গণতন্ত্র আর বেশি বেশি উন্নয়ন অগণতান্ত্রিক শাসকদের শ্লোগান বটে; তবে তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ অর্থনীতিবিদ মানকুর অলসন তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Rise and Decline of Nations: Economic Growth, Stagflation and Social Rigidities-এ দেখিয়েছেন, আমাদের মতো রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো আসলে Distributional coalition অর্থাৎ একটি ভাগবাটোয়ারাকারী পক্ষই রাষ্ট্র যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে।

একথা জোর দিয়ে ২০১৬-তেও বারবার বলা হয়েছে যে, কি কি ব্যবস্থাবলী এবং প্রতিষ্ঠান জনকল্যাণে সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে; কতো কতো উন্নয়ন করা হয়েছে – তার ফিরিস্তিও সরকারের দিক থেকে দীর্ঘ। তবে এই প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি যে, এই উন্নয়ন আসলে কার জন্য? জনগণ কিভাবে এবং কতোটুকু উপকৃত হয়েছে সরকার গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে? যদি জনগণ উপকৃত না হয়ে থাকে তাহলে ২০১৬ সালেও সেই একই প্রশ্ন ছিল- উন্নয়নের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা কতোটুকু? বাস্তব জবাব কি হবে তা আমরা সবাই জানি। অর্মত্য সেন তার গ্রন্থ The Idea of Justice -এ বলেছেন, ‘‘আনুষ্ঠানিকভাবে কি কি প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কণ্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে’’।

জনগণের জন্য উন্নয়ন ভাবনার ক্ষেত্রে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক সামির আমিন বলেছেন, ‘‘উন্নয়নের প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে হলে প্রাথমিকভাবে জন-উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তাহলো- রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন’’।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এসব কথা যাদের কাছে পৌছানো প্রয়োজন তাদের কাছে তা পৌছেনা অথবা যতোটা দেখা যাচ্ছে, তারা এতে আদৌ বিশ্বাসী নন।

বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো কার্যত স্থগিত রেখে; একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের অনুপস্থিতিতে জনগণের উন্নয়ন বাস্তবে কতোটা সম্ভব সে প্রশ্ন ২০১৬ সালের শেষ প্রান্তে এসে আবারও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রকট হয়েছে- জনগণের সাথে রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে সম্পর্ক তা কতোটা শিথিল হয়েছে-সে প্রশ্নটিও। এ কথাটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন, সচল-সজীব জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায় জনগণ ভোটাধিকারের প্রথম ধাপটি পার হয়ে একে একে অন্যান্য অধিকারগুলো ভোগ করবেন-এটাই হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম। কিন্তু সে ব্যবস্থাটি পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকায় জনগণ এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে, রাষ্ট্রের সাথে তাদের হয় বৈরিতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে অথবা অবস্থাটা দাড়িয়েছে এমন যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি কোনোভাবেই জনগণের সাথে যে চুক্তিতে আবদ্ধ-তার বরখেলাপ হয়ে গেছে। আর এটি করা হয়েছে জনগণকে বিতাড়িত করার জন্য অত্যন্ত কৌশলে।

সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, তারা নিজেদের পুরো মাত্রায় অপ্রাপ্তির বেদনায় পরাজিত বলে মনে করছে। কারণ তেল-গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিই হোক বা তাদের নামে উন্নয়নের বিষয়ই হোক- তা সবই হচ্ছে তাদেরকে না জানিয়ে, জন-আকাংখাকে পাত্তা না দিয়ে। অথচ সবই হচ্ছে তাদেরই নামে। রাষ্ট্রের পরিচালকেরা রাষ্ট্রের সাথে জনগণের তফাতের ওই সম্পর্কটি তৈরি করে চলছে, ওই পরাজিত মনে করার মনোবৃত্তিটি সৃষ্টির লক্ষ্যে। জনমনে সৃষ্ট এই মনোবৃত্তি আসলে পুরো রাষ্ট্রের জন্যই সৃষ্টি করে নানা ধরনের বৈকল্য, ব্যাধি, সামাজিক অনাচার।

বিদায়ী বছরটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল জঙ্গীবাদ। ২০১৬-তেই যে জঙ্গীবাদ বাংলাদেশে রাতারাতি আবির্ভূত হয়েছে বা এর অভ্যুদ্বয় ঘটেছে তা নয়। এর ইতিহাসটি বেশ দীর্ঘ না হলেও বেশ কয়েক বছরের। বিএনপির সময়ে ২০০৫ সালে দেশে একযোগে ৬০টি জেলায় বোমা হামলাসহ নানা ঘটনা ঘটেছিল। এরপরে ওই ঘটনার নায়ক শায়খ রহমান, বাংলাভাইসহ বেশ কয়েকজনকে ফাসি দেয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময়ের জঙ্গীবাদীরা ছিল কম মাত্রার ‘রেডিক্যালাইজড’। আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিহীন, স্থানীয় অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটেছিল তখন। তবে তখন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে ওই সময়ের জঙ্গীবাদ বর্তমানের মতো কৌশলগতভাবে ততোটা উন্নত ছিল না। তাছাড়া উচ্চবিত্তের সন্তান, ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে তারা কোনোভাবেই আকৃষ্ট করতে পারেনি। ওই সময়ের জঙ্গীবাদ সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের অর্থাৎ বড়জোর মাদরাসা পড়ুয়া কিছু মানুষের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল। যতোদূর বোঝা যায় তাতে, তাদের উদ্যোগটি ভিন্ন ধারার ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল এবং তা ছিল স্থানীক বা এলাকাভিত্তিক।

ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা যখন জঙ্গীবাদী দলগুলোতে ঢুকে পড়েছে এবং একের পর এক ব্লগারসহ ভিন্ন চিন্তা ও মাত্রার মানুষদের উপর হামলা ও হত্যাকান্ড চালাতে থাকে- তখন সরকার একে প্রথমে অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল, পরে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে প্রচার এবং আরও পরে স্থানীয় জঙ্গীদের কাজ বলে চালিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বেশ জোরেসোরেই তখন বলা হচ্ছিল- দেশে কোনো জঙ্গীবাদ নেই। যখন এসব কথা বলা হয়, ইতোমধ্যে ডজনেরও বেশি ব্লগার, প্রকাশক, লেখক এবং ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যার ঘটনা ঘটে গেছে। অথচ সরকার তখনো ছিল গণতন্ত্র না উন্নয়ন বিতর্কে বিভোড় এবং গণতন্ত্রের ছিটেফোটাটুকুতেও বাধাসৃষ্টিতে উদগ্রীব। গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি যে জঙ্গীবাদের উত্থানের ক্ষেত্র ও চারণভূমি-তা যতোই বলা হয়েছে-সরকার তা শোনেনি; শুনতে চায়নি। দেশে একদিকে রাজনীতিহীনতা, দুর্নীতি, হত্যা, গুমসহ অপশাসনের পরিস্থিতি চলতে থাকে; সাথে সাথে বেড়ে উঠতে থাকে জঙ্গীবাদ। আর এসব জঙ্গীরা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য স্বাভাবিক কারণেই আন্তর্জাতিক সংযোগ খুজতে থাকে। সরকারের দিক থেকে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়টি কবুল করা হয়নি যে, বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট বা আইএস এবং আল কায়েদা রয়েছে। তবে ওই দুই আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠী বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রমের কথা জানান দিয়েছে। এসব পাল্টাপাল্টি অবস্থার মধ্যে একজন ইতালীয় ও একজন জাপানী নাগরিক এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যার কাজটি সম্পন্ন করে ফেলেছে জঙ্গীরা। এমনই অবস্থায় ২০১১৬-র পহেলা ও ২ জুলাই ঘটে যায় গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরার দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। এই ঘটনা অনেকেরই নানা ধারণা পাল্টে দিয়েছে। যারা প্রচার করেছিল দেশে জঙ্গীবাদ নেই বা থাকলেও তা ততোটা প্রবল নয়-জঙ্গীরা তাদের কাছে ওই ঘটনার মধ্যদিয়ে ভিন্ন বার্তা পৌছে দিয়েছে। এছাড়া শুধুমাত্র কিছু মাদরাসা পড়ুয়া হতদরিদ্র মা-বাবার সন্তানরাই যে জঙ্গী হয়- এতো দিনের সে ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। আবারও সেই কথাটি প্রমাণিত হয় যে, গণতন্ত্রই রুখে দিতে পারে জঙ্গীবাদ।

জঙ্গীবাদ স্থায়ীভাবে রুখে দেয়ার ব্যাপারে এরপরেও সরকার ভিন্নমত পোষণ করে, ভিন্ন পথ গ্রহণ করেছে। জনগণ এবং অপারপর দল, মত, পক্ষকে আস্থায় এবং সাথে নিয়ে জঙ্গীবাদ, উগ্রবাদ দমনের পথ পরিহার করে, স্বভাবসিদ্ধ রীতি অনুযায়ী তাদের নির্ভরতার স্থান হয়ে দাড়ায় আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনী। এতে বিভিন্ন সময়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার নানা ঘটনা বিভিন্নভাবে শোনা যেতে থাকে। শুনতে হয় পোশাকধারীদের পরিচয়ে কথিত জঙ্গী গ্রেফতারের নামে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা। আইন-শৃংখলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কিন্তু এর সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে, জঙ্গীবিরোধী অভিযানের নামে কথিত নিখোজদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। আগে অভিভাবকগণ মুখ না খুললেও এখন তাদের সন্তানদের খবরাখবর জোগাড়ের চেষ্টা করছেন; বিভিন্ন বাহিনীর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন; করুণ আকুতি নিয়ে দাবি জানাচ্ছেন সন্তান ফেরত পাওয়ার জন্য।

এসব যখন চলছে ঠিক তখনই আইএস এবং আল কায়েদা সিরিয়া, ইরাক থেকে নিজেদের বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে দেয়ার যে নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছে-সে বিষয়ে বাংলাদেশের করণীয় কী- তা চাপাই পড়ে যাচ্ছে।

আপাত একটি স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করলেও এই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, সত্যিকারেই কি জঙ্গী দমন সম্ভব হয়েছে? উত্তরটি নিশ্চয়ই হবে নেতিবাচক। কারণ গণতন্ত্রবিহীন সমাজে জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদ সমূলে উৎপাটন এবং নির্মূল সম্ভব নয়। ২০১৬ সাল এটাই শিক্ষা দিয়ে বিদায় নিয়ে যাচ্ছে।