Home » প্রচ্ছদ কথা » উন্নয়নের সহিংসতা

উন্নয়নের সহিংসতা

আনু মুহাম্মদ ::

‘উন্নয়ন’ শব্দটি সকলের জন্য একই অর্থ বহন করে না। উন্নয়ন কি সকলের জীবনকে সমৃদ্ধ করবে নাকি বহুজনের জীবন ও প্রকৃতির বিনিময়ে কতিপয়কে দানব বানাবে, তা নির্ভর করে উন্নয়নের গতিপথ কারা নির্ধারণ করছে তার ওপর। পুঁজির শাসনের মধ্যে যখন আমরা বাস করি, তখন যে কোনো উপায়ে পুঁজির সংবর্ধনকেই ‘উন্নয়ন’ নাম দিয়ে আমাদের সামনে হাজির করা হয়। তার পরিণতি যা-ই হোক না কেন, প্রচারণায় তৈরি করা একটা আচ্ছন্নতার কারণে উন্নয়নের সাথে ধ্বংস বা বিপন্নতার পার্থক্য ধরতে সমাজ অনেক সময়ই ব্যর্থ হয়।

বর্তমান সমাজে ‘উন্নয়ন’ নামে কতিপয়ের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভবন প্রক্রিয়াটি অন্তর্গতভাবেই সহিংস। পাওলো ফ্রেইরির ভাষায়, ‘Every relationship of domination, of exploitation,of oppression,is by definition violent, whether or not the violence is expressed by drastic means. In such a relationship, dominator and dominated alike are reduced to things – the former dehumanized by an  excess of power and later by lack of it.’ (The Practice of Freedom,1973) । অর্থাৎ এ রকম সমাজে প্রতিটি আধিপত্যের সম্পর্ক, প্রতিটি শোষণ ও নিপীড়নের সম্পর্ক নিজে থেকেই সহিংস; তাতে সহিংসতা খোলাখুলি ভয়াবহ চেহারায় দেখা যাক বা না যাক। এ রকম সম্পর্কের মধ্যে আধিপত্যকারী এবং আধিপত্যের শিকার-দুই পক্ষই বস্তুতে পরিণত হয়। প্রথম দল ক্ষমতার আতিশয্যে অমানুষ হয়, দ্বিতীয় দল মানুষের জীবন থেকে ছিটকে পড়ে ক্ষমতার অভাবে।

২. বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক গড় আয় মাথাপিছু এক হাজার ডলার অতিক্রম করায় বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আসলে সঠিকভাবে পরিমাপ করলে বাংলাদেশের জিডিপি এবং মাথাপিছু আয় আরো বেশি হবে। কারণ বাংলাদেশে হিসাব বহির্ভূত আয়ের অনুপাত হিসাবকৃত জিডিপির শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি। এর একটি বড় অংশ চোরাই অর্থনীতি, যা তৈরি হয় ঘুষ, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, কমিশন, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প সম্পদ লুণ্ঠন, মাদক ব্যবসা, মানব পাচার, নিপীড়নমূলক যৌন বাণিজ্য ইত্যাদি অপরাধমূলক তৎপরতা থেকে।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিমাপ করার অনেকগুলো সমস্যা আছে। একটি দেশে জিডিপি অনেক বেশি হলেও টেকসই উন্নয়ন দুর্বল হতে পারে। কেননা জিডিপি বৃদ্ধি এমন সব উপায়ে হতে পারে যাতে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে আরও বিপন্ন হয়। সে জন্য জিডিপির গুণগত দিকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তাছাড়া মাথাপিছু আয় একটি গড় হিসাব। এ থেকে সমাজে আয় বিতরণের বা বৈষম্যের কোনো চিত্র পাওয়া যায় না। সে জন্য যে সমাজে বৈষম্য বেশি সেখানে মাথাপিছু আয় বাড়লেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় অনেক নিম্ন পর্যায়ে থাকতে পারে, যেমন বাংলাদেশে আছে।

সে জন্যে মাথাপিছু আয় বেশি হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন হতে পারে। আফ্রিকার বহু দেশে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন। মিয়ানমারে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের সমান, অর্থাৎ তারাও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। এছাড়া আছে ভারত, পাকিস্তান, সেনেগাল, জিবুতি, সুদান। নাইজেরিয়া একই গ্রুপে হলেও তাদের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ ভালো, এটা বলা যাবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং আরো খারাপ।

৩. তাই জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব এবং সেতু, সড়ক, ফ্লাইওভার, বহুতল ভবন ইত্যাদির তালিকার পাশাপাশি কত নদী-খাল-জলাশয় নর্দমায় পরিণত হলো, এর কত ভাগ দখল হয়ে গেল, কত নদী মরে গেল, কত পাহাড় ব্যক্তি দখলে গেল, কত পাহাড় সমতল বানিয়ে ভবন হলো, কত বন উজাড় হলো, বাতাস কত দূষিত হলো, ভূগর্ভের পানি কত নিচে নামল, নদীর পানি কত দূষিত হলো, বায়ু কত বিষাক্ত হলো, ফল সবজি মাছ মাংস কত বিষমুক্ত হলো, শিক্ষা চিকিৎসার ব্যয় কত বাড়ল, দেশ কত ঋণগ্রস্ত হলো, কত হাজার লাখ কোটি টাকা লুট ও পাচার হলো, কত জমি দখল হলো, খুন গুম হলো কত মানুষ, নিরাপত্তাহীনতা কত বাড়ল, ভর্তি নিয়োগ বাণিজ্য কত বাড়ল, ঘুষ দুর্নীতি কমিশন কত বাড়ল, নারী নির্যাতন খুন ধর্ষণ পাচার কত বাড়ল, প্রতিষ্ঠান কত বিপর্যস্ত হলো-এই তালিকাও রাখতে হবে। তাহলে উন্নয়নের চরিত্র বোঝা যাবে; এটি আদৌ টেকসই কিনা, এর সুফলভোগী কারা, এর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সমৃদ্ধি না বিপন্নতা তৈরি হচ্ছে তা বোঝা সম্ভব হবে।

৪. পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তি, সহিংসতার শুরু হয়েছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প দিয়ে। মানুষকে কিছু না জানিয়ে, মানুষ ও প্রকৃতির কথা না ভেবে, বিদেশী ঋণ নিয়ে কাজ শুরু হলো। এক রাতে এই প্রকল্পের ‘শুভ উদ্বোধনে’ গ্রাম শহর ডুবে গেল, লাখো মানুষ ভেসে গেল। এভাবেই বৈরিতা আর সহিংসতার বীজ বপন ঘটল। এটা পাকিস্তান আমলের ঘটনা। বাংলাদেশ একটুও বদলায়নি, তার ওপর ভর করেই এগিয়েছে। সরকার পরিবর্তনেও ধারার পরিবর্তন ঘটেনি। চার দশক ধরে সহিংসতা, সামরিকীকরণ, জবরদস্তি, নির্যাতন, দখল, জাতিগত অস্তিত্বের অস্বীকৃতি ও অবমাননা-এ সবই পার্বত্য চট্টগ্রামের দিনের পর দিনের কাহিনী। কত লাখ কোটি টাকা এর কারণেই অপচয় হলো, তার হিসাব নেই।

৫. ভবদহ এলাকার দরিদ্র, জলাবদ্ধতা-জর্জরিত কয়েক হাজার নারী-পুরুষ তাদের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাতে এসেছিল; বিনিময়ে পুলিশ এই দুর্বল মানুষদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে। বছরের পর বছর এই জলাবদ্ধতা কেন তা একটু জানতে চেষ্টা করলেই পরিস্কার হবে এটা প্রাকৃতিক কারণে হয়নি, হয়েছে  ‘উন্নয়ন’ নামের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের কারণে। দেশের বহু নদী মারা গেছে এসব প্রকল্পের কারণে। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা আরেকটি ফলাফল। বহু মানুষ যে নদী ভাঙন ও জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে শহরে উদ্বাস্তু, তারও বড় কারণ এই সব প্রকল্প। সরকার পরিবর্তনে এর ধারাবাহিকতার কোনো পরিবর্তন হয় না; কারণ এর সুবিধাভোগী অভিন্ন। এসব প্রকল্পে লাভবান হয় দেশ-বিদেশের কতিপয় গোষ্ঠী। তার মধ্যে বহু ‘বিশেষজ্ঞ’ও আছে, যারা এগুলোর কোনো দায়দায়িত্ব নেয় না। কিন্তু ভোগান্তি বহন করতে হয় মানুষকে, প্রতিবাদ করলেও যাদের আঘাত পেতে হয়। উন্নয়ন নামের এসব প্রকল্পের যথেষ্ট বিরোধিতা হয়নি বলেই দেশে নদী পাহাড় জমি জলাশয় এবং শেষ বিচারে অসংখ্য মানুষ দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে।

৬. টাম্পাকো নামের কারখানা মুহূর্তে শ্মশানে পরিণত হয়েছে। দুনিয়া ভেঙে পড়ার এই আর্তি, এই হাহাকার, এই পোড়া মানুষের ভার কে বহন করবে? ৩৫ জন শ্রমিকসহ মোট ৩৯ জন পুড়ে মরলো আবারও। নিমতলী, তাজরীন, রানা….একই মডেল। যারা বেঁচে কাতরাচ্ছে, তাদের জীবন হবে দুর্বিষহ। প্রতিটি লাশের পরিবারের জন্য সরকার দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে খালাস। জনগণের টাকা দিয়ে সরকারের এই ‘মহানুভবতা’ কেন? মালিক কই? পুলিশ এখন মালিককে খুঁজে পাচ্ছে না। এমপি সাহেবের কারখানায় এই মৃতের সারি তো কোনো দুর্ঘটনা নয়-হত্যাকান্ড। জানা ছিল সমস্যা, সাপ্লাই ঠিক রাখার জন্য মেরামত করার সময় মেলেনি মালিকের। মুনাফা উঁচুতে রাখার অন্যতম উপায় খরচ কমানো। খরচ কমানোর অন্যতম উপায় মজুরি কম দেয়া বা না দেয়া, আর কারখানার মধ্যে কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ না করা। মুনাফার প্রবাহ বাড়াতে জেনেশুনে তাই মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

কোনো কারখানার যন্ত্রপাতি যদি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়, কোনো কারখানা ভবন যদি ত্রু টিপূর্ণ হয়, তার দেখাশোনার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু তাদের কাছে মালিকের মুনাফাই প্রধান বিবেচ্য। বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শনে মুনাফার কাছে মানুষ আর পরিবেশ সব তুচ্ছ। মুনাফা কম হলে বিনিয়োগের উৎসাহ পাবে না মালিকরা, বিনিয়োগ না হলে জিডিপি বাড়বে না। রাষ্ট্র তাই জিডিপি বাড়ানোর জন্য, কিছু লোকের বিত্তবৈভব বাড়ানোর জন্য কোরবানি দিচ্ছে মানুষ আর পরিবেশকে। মুনাফা উঁচুতে রাখার অন্যতম উপায় খরচ কমানো : কাজের পরিবেশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার খরচ না করা, পানি নদী বায়ু দূষণ রোধের যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা। এতে শ্রমিকের জীবন গেল, নদী বন খুন হলো, তাতে কোনো সমস্যা নেই। শ্রমিকের সংগঠন নেই বলে প্রতিরোধ নেই, তাই মালিকের যথেচ্ছাচারের সুবিধা আরো বেশি। আর মজুরি চাইলে, নিরাপত্তা চাইলে পুলিশ তো আছেই। যখন এক কারখানায় পুড়ে ছাই বা ধসে পিষ্ট শ্রমিকরা, তখন অন্য অনেক কারখানায় বকেয়া মজুরি আর ঈদ বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা মিছিল করছে। পুলিশ তাদের ওপরও চড়াও হচ্ছে। থানা আর মাস্তানদের অর্থ দিয়ে যদি সব ঠান্ডা রাখা যায়, মজুরি আর বোনাস দেবার কী দরকার? নিরাপত্তার জন্য খরচেরই বা কী দরকার? এই হত্যাকান্ডের দায়ভার প্রথমত মালিকের, দ্বিতীয়ত সরকারের। আর দুজনই একাকার।

৭. ১৯৯৭ সালে মার্কিন কোম্পানির হাতে মাগুরছড়া বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এতে সরকারি দলিল অনুযায়ীও নষ্ট হয়েছে এমন পরিমাণ গ্যাস, যা প্রায় এক বছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের সমান। এর ক্ষতিপূরণ না দিয়ে অক্সিডেন্টাল নিজে লাভ করে নিয়ে আরেকটি মার্কিন কোম্পানি ইউনোকলের কাছে ব্যবসা বিক্রি করে চলে যায়। ইউনোকল গ্যাস ‘রপ্তানি’র নামে পাচারের জন্য অনেক দৌড়ঝাঁপ করে, কিন্তু জনপ্রতিরোধের কারণে ব্যর্থ হয়। তার পরও অনেক মুনাফা নিয়ে এটিও ব্যবসা বিক্রি করে চলে যায়। আসে শেভরন। একের পর এক কেনাবেচা হয়, সরকার বদলায়, কিন্তু এদের কারো গলায়ই ক্ষতিপূরণের কথা ওঠে না। এখন শেভরন অতিরিক্ত গ্যাস তুলে, লাউয়াছড়ার বিনাশ করে বিপুল মুনাফা পকেটে নিয়ে আরো অর্থ কামাইয়ের জন্য এই ব্যবসা বিক্রি করে চলে যাওয়ার আয়োজন করছে। বিভিন্ন মিডিয়া তাদের বিনিয়োগের কথা বলে ধন্য ধন্য করে, তার চেয়ে বেশি যে ক্ষতিপূরণের টাকা তাদের কাছেই আমাদের পাওনা, সেই কথার কোনাও শোনা যায় না। ক্ষতিপূরণ হিসাব করতে হবে যে পরিমাণ অনবায়নযোগ্য গ্যাস তারা নষ্ট করেছে, তা বর্তমানে বিশ্ববাজার থেকে আমদানির দাম ধরে। তার পরিমাণ কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

৮. ২০০৫ সাল থেকে আমরা ফুলবাড়ীতে জালিয়াত কোম্পানি এশিয়া এনার্জির (জিসিএম) উন্মুক্ত খনি প্রকল্পের বিরোধিতা করেছি। যথারীতি ‘উন্নয়নবিরোধী’সহ নানা অপবাদে ভূষিত হয়েছি, যুক্তি-তথ্য আর দেশের স্বার্থ না মেনে তখনকার চারদলীয় জোট সরকারও একদিকে কুৎসা অপপ্রচার, অন্যদিকে দমন-পীড়নের পথ নিয়েছে। বিশাল জনপ্রতিরোধক গুলি করে থামাতে চেয়েছে। খুন করেছে, পঙ্গু করেছে; কিন্তু টলাতে পারেনি মানুষকে। একপর্যায়ে সরকার নতি স্বীকার করে জনগণের সাথে চুক্তি করেছে ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট, ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ তার নাম। এরপর আরো দু-তিন সরকার এলো। অঙ্গীকার সত্ত্বেও  চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি, বারবার চেষ্টা হয়েছে এশিয়া এনার্জিকে পুন:প্রতিষ্ঠার। ফুলবাড়ীর কয়লা দেখিয়ে শেয়ার ব্যবসা করে কোম্পানি টাকা কামায়, কোনো সরকার আপত্তি করে না। শুধু ভাগ বসায় নিজের পকেটের জন্য। সন্ত্রাসী নিয়োগ, হামলা, মামলা, প্রচারণা চলে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে।

কোম্পানির টাকায় মন্ত্রী, এমপি, কনসালট্যান্ট, আমলা বিদেশে যায়। এসে বলে-কোনো ক্ষতি হবে না, দেখে এলাম জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া। আমরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বলি, এই দেশ ভিন্ন, এখানে পানিসম্পদ সমৃদ্ধ, এখানে আবাদি জমি, এখানে ঘন জনবসতি। তা ছাড়া এই সম্পদ কেন বিদেশি কোম্পানি পাচার করতে পারবে? সব সম্পদ এই দেশের মানুষের কাজে লাগাতে হবে। অনেক ছলাকলা আর জোর-জবরদস্তি সত্ত্বেও   ফুলবাড়ী প্রতিরোধ কখনো দুর্বল হনি। তাই শেষ চক্রান্ত হয়েছে বড়পুকুরিয়া নিয়ে। সেখানে শুরু করে ফুলবাড়ীতে আসার ক্ষেত্র তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষে কোনোভাবেই প্রমাণ করা গেল না যে এটি বাংলাদেশে সম্ভব, বরং বারবার এটাই প্রমাণ হলো যে ভয়ংকর সর্বনাশ হবে।

যদি জনপ্রতিরোধ তৈরি না হতো, যদি অপমান অপবাদ নির্যাতন হামলা মামলা মোকাবেলা করে এই বিরোধিতা অব্যাহত না থাকত, তাহলে এত দিন উত্তরবঙ্গ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ পানির সর্বনাশ হতো সবচেয়ে বেশি, আর কয়লা সম্পদও কোম্পানির পকেট ভারী করে বিদেশে চলে যেত। তখন কি যারা একে উন্নয়ন দেখিয়ে দেশের সর্বনাশে উদ্যত হয়েছিল তাদের পাওয়া যেত?  না। আজ যখন এই আন্দোলনের ন্যায্যতা সরকারি গবেষণায়ই প্রমাণিত হচ্ছে, তখন তো এই মন্ত্রী এমপি আমলা ‘বিশেষজ্ঞ’দের নাম বিচারের তালিকায় স্পষ্ট করে লিখতে হবে। এদের খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, কারণ এসব লোকই এখন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে ওকালতি করছে। ফুলবাড়ীর মতো সুন্দরবন রক্ষার লড়াইও দাঁড়িয়ে আছে বৈজ্ঞানিক যুক্তি-তথ্য আর সর্বজনের সর্বপ্রাণের শক্তির ওপর। ইতোমধ্যেই আন্দোলনের নৈতিক বিজয় হয়েছে, প্রলাপ চলছে সুন্দরবনবিনাশী অসুরদের।

৯. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বহু সমস্যার একটি আবাসিক হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ভবন ও স্থান এখন সরকারি দলপুষ্ট লোকজনের দখলে। কোথায় তাহলে থাকবে শিক্ষার্থীরা? মেস করে থাকা ব্যয়বহুল এবং এখন নিরাপদও নয়। শিক্ষার্থীরাই সরকারকে সমাধান দিয়েছে, পুরনো কারাগারের স্থানে হল নির্মাণ করা হোক। এই প্রস্তাবই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত। আরেকটি সমাধান হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ভবন দখলমুক্ত করে আবাসিক সমস্যার সমাধান এবং পুরনো কারাগারের স্থানে রমনা পার্কের মতো শ্বাস নেবার জায়গা বানানো। কোনোভাবেই আবাসিক হলের চেয়ে শপিং মল গুরুত্ব পেতে পারে না। এই জমির দিকে নজর আছে ভূমিদস্যু, দখলদারদের। একদিকে সর্বজনের শিক্ষার দাবি, অন্যদিকে সর্বজনের জমিতে কতিপয় গোষ্ঠীর ব্যবসার দাবি। সরকার যে দ্বিতীয় পক্ষের নানা প্রস্তাব নিয়েই বেশি আগ্রহী তা গত ২২ আগস্ট শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা থেকেই স্পষ্ট হলো।

১০. ফরসা হবার ক্রিম, টুথপেস্ট, সাবান বা পাউডার, হরলিকস, গুঁড়া দুধ, কোক-পেপসি-টাইগার-ফ্রুটিকাসহ নানা নামের তথাকথিত এনার্জি  ড্রিংক ইত্যাদির বিজ্ঞাপনে অ্যাপ্রন পরা বিশেষজ্ঞ বা ডাক্তার দেখা যায়। তারা আমাদের জানায় যে এগুলো খুবই কার্যকর বা স্বাস্থ্যকর বা শক্তিবর্ধক বা সৌন্দর্যবৃদ্ধির অমোঘ উপায়। আর বিজ্ঞানীর একটু অনুসন্ধানেই বের হয় ইউনিলিভারসহ বিভিন্ন কোম্পানির সব প্রসাধন সামগ্রীতে ভয়াবহ প্লাস্টিক  কণা, কোক-পেপসি-ফ্রুটিকাসহ এনার্জি ড্রিংকে বিষ, হরলিকসে বিপজ্জনক উপাদান। বিজ্ঞান যেগুলোকে সর্বনাশা বলে, বিজ্ঞাপন সেগুলোকে মানুষের সামনে মনোহর করে হাজির করে। ক্রিম মেখে ফরসা হবার, বিষাক্ত জিনিস খেয়ে স্মার্ট হবার উন্মাদনা তৈরি হয়। বাজার বিস্তৃত হয়। জিডিপি বাড়ে। ঘরে ঘরে সর্বনাশ ঘটতে থাকে।

সুন্দরবন, বড়পুকুরিয়া, বাঁশখালী, রূপপুরসহ তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের পক্ষে ওকালতি করার জন্য আমরা যেসব বিশেষজ্ঞ দেখি, তারা ওই রকম বিজ্ঞাপনের অ্যাপ্রন পরা ডাক্তার/বিশেষজ্ঞের মতোই, অর্থের বিনিময়ে তারা বিষকে মধু হিসেবে হাজির করে। মুনাফার উন্মাদনায় কোম্পানি আর ‘সরকার’ একাকার হয়ে মানুষের শরীর ও জগৎকে বিষময় করতে করতে উন্নয়নের বাদ্য বাজায়।

১১. বিজ্ঞাপনী সংস্থা ভাড়া করা হয়েছে রামপাল প্রকল্পের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য। প্রচার ডিজাইনের অংশ হিসেবে আমদানি করা ভাড়াটে ‘বিশেষজ্ঞ’রা বেশ তৎপর। ভাড়াটে কথায় কোনো লাগাম থাকে না, তাই তারা বলতে পারে : ‘এমন এক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে, যাতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনোই বায়ুদূষণ হবে না, বরং দূষণ আরো কমে যাবে, সুন্দরবন আরো সুরক্ষিত হবে। পানি এতই বিশুদ্ধ করা হবে যে তা পান করাও সম্ভব হবে?’

এ দেশের নদী ও বনবিনাশী বিভিন্ন প্রকল্প, সড়ক-সেতু-ভবন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি, মানুষের জীবন ও সম্পদ নিয়ে ভয়াবহ সব চুক্তি, ঋণনির্ভরতা সৃষ্টি, জাতীয় সক্ষমতার ক্ষয় ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নামের কনসালট্যান্টদের ভূমিকা নীতি-কাঠামো প্রণয়ন ও যৌক্তিকতা নির্ধারণের, আমলাদের ভূমিকা তার বাস্তবায়নের পথ তৈরি। আর ক্ষমতায় থাকা সামরিক-বেসামরিক রাজনীতিবিদদের ভূমিকা ক্ষমতা খাটিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন। সবার সুবিধা যোগসাজশেই এগুলো হয়। কোনো কোনো অপকর্মের জন্য রাজনীতিবিদদের শাস্তি হয়, কখনো কখনো প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, ক্ষমতায় থাকা জেনারেলদেরও বিচার হয়; বিচার না হলেও জনগণের বিচারে তাদের পরিচয় নির্দিষ্ট হয়, কেউ চোর, কেউ প্রতারক, কেউ জালিয়াত ইত্যাদি। কিন্তু যে সব কাজের জন্য এসব তিরস্কার, সেগুলোর সাথে যুক্ত থেকেও ধরাছোঁয়ার বাইরে, এমনকি জনধিক্কারেরও বাইরে থাকে বিশেষজ্ঞ নামের কনসালট্যান্ট বা লবিস্টরা, মিডিয়া আর সংশ্লিষ্ট আমলারা। অথচ তারাই তৈরি করে সর্বনাশের ভিত। (সৌজন্যে : সর্বজনকথা)