Home » আন্তর্জাতিক » ২০১৭-এর বিশ্ব রাজনীতি : ১০টি ভবিষ্যদ্বাণী

২০১৭-এর বিশ্ব রাজনীতি : ১০টি ভবিষ্যদ্বাণী

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

১.সত্য-পরবর্তী বিশ্ব – সংকটে গণতন্ত্র : অব্যাহত বৈষম্য, ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ, ‘ভুয়া খবরের’ সয়লাব এবং লোকরঞ্জক প্রার্থীরা বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। এই ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা আরো কঠিন করে দেবে। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশগুলো কেবল তাদের ‘সফট পাওয়ার’ আরো খানিকটা হারিয়েই ফেলবে না, সেইসাথে রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ানোর উৎস হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। লোকরঞ্জকেরা সাধারণভাবে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রপন্থী গ্রুপগুলোকে সমর্থন দেওয়ার খাতে আরো কম অর্থ ব্যয় করবে এবং স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর ওপর চাপও হ্রাস করবে।

২. পাশ্চাত্য-পরবর্তী বিশ্বে বিভক্ত পাশ্চাত্য : বহুমুখী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্ষমতার পরিবর্তনের সময়টাতে বেক্সিট- যেভাবেই তা হয়ে থাকুক না কেন- ইউরোপের রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং পাশ্চাত্য-পরবর্তী বিশ্বের বৈশ্বিক বিষয়াদি গঠনে ও এর সামর্থ্য কমিয়ে দেওয়ায় পাশ্চাত্য কৌশলগত স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হবে। অধিকন্তু যুক্তরাষ্ট্রে  ট্রাম্পের বিজয়  ট্রান্স-আটলান্টিক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতা দুর্বল করে দেবে। ব্রিটেন ও ইউরোপ মহাদেশীয় অঞ্চলের মধ্যকার ‘উইন-উইন’ সম্পর্ককে বেক্সিট ‘জিরো-সাম গেইমে’ পরিণত করে ফেলেছে। এটা ফ্রান্স এবং আরো কয়েকটি দেশের ইউরোপ থেকে সরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

আগামী দশকগুলোকে ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের নেতৃত্বে দুই মেরুর বিশ্বব্যবস্থা দেখা যাবে এবং আটলান্টিকের চেয়ে এশিয়াতেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বেশি নিহিত রয়েছে- এমন বিবেচনা মাথায় রেখে বলা যায়, ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বৈশ্বিক বিষয়াদিতে ইউরোপের ভূমিকা আরো কমে যাবে। চীন ‘সমান্তরাল-ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হতে থাকায় বর্তমানের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প তৈরি হতে পারে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাশ্চাত্যের জন্য নতুন নতুন অংশীদারিত্বের উত্থান ঘটতে পারে। দিল্লী ও টোকিও যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে কম প্রভাবশালী দেখবে, তখন তাদের মধ্যকার সম্পর্ক আরো বিকশিত হবে। চীন অবাধ বাজারব্যবস্থার প্রধান ধারক ও বাহক হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ঝুঁকবে সংরক্ষণবাদের দিকে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা চীনকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে দেখার আশা করতে পারি।

৩. যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে জটিলতা : হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নমনীয়ও হন, তবুও বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কটি সাবলীল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বাণিজ্য, তাইওয়ান এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা ইস্যুতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কণ্টাকীর্ণই থাকবে। বেইজিংয়ে নিযুক্ত ট্রাম্পের রাষ্ট্রদূত যদিও তুলনামূলকভাবে শি জিন পিংয়ের ঘনিষ্ঠ বলে কথা চালু আছে, তবুও অভ্যন্তরীণ কারণে হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে চীনা হুমকিকে সজীব রাখার প্রয়োজনীয়তা থাকবে। তবে মনে রাখতে হবে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নজিরবিহীন উত্তেজনার ব্যাপক ঝুঁকি রয়েছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, কিংবা সামরিক সঙ্ঘাত – যাই হোক না কেন, তাদের মধ্যকার বৈরিতার বৈশ্বিক প্রভাব সাথে সাথে দেখা যেতে বাধ্য।

৪. চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার পথ : নীতিনির্ধারকেরা তাদের বাজারগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব কিভাবে মোকাবিলা করা হবে তা নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক শুরু করে দিয়েছেন। ওবামার মতে, চীনের নেতৃত্ব গ্রহণ একটি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি। ল্যাতিন আমেরিকাতেও এ ধরনের বিতকের্র সৃষ্টি হয়েছে; সেখানেও চীনের প্রভাব বাড়ছে। ভেনেজুয়েলাতে তো ওয়াশিংটনের চেয়ে বেইজিংয়ের প্রভাব অনেকগুনে বেশি। চীন বিনিয়োগ ও অর্থ সহায়তার প্রদানের নীতি অবলম্বন করছে; আর তা গ্রহণ থেকে বিরত থাকা খুবই কঠিন ব্যাপার।

৫. উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য খারাপ খবর : এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও অত্যন্ত চটুল ও পরস্পরবিরোধী কথাবার্তার জন্য বেশ পরিচিত,  তারপরও ক্রমবর্ধমান হারে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, ব্যাপকভিত্তিক কর হ্রাস এবং সরকারি ব্যয় বাড়ানোর ফলে বড় রকমের মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে। এর ফলে উদীয়মান বাজারগুলো থেকে উপচেপড়া পুঁজি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ছুটবে। ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের পতন রুখতে বেইজিংকে বেশ কষ্ট করতে হবে। অবশ্য এতে করে চীনা কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণ বা প্রবৃদ্ধিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। ২০১৭ সালটি ল্যাতিন আমেরিকার জন্য কেমন হবে? স্বল্প প্রবৃদ্ধি, জনসাধারণের মধ্যে নিজ দেশ সম্পর্কে স্বল্প আশাবাদ এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যাপক এবং অনেক বিক্ষোভ দেখা দেবে সেখানে।

৬. বিশৃঙ্খল মধ্যপ্রাচ্য, পাশ্চাত্য প্রভাবে ধ্বস : আলেপ্পোর পতনে সবচেয়ে বড় যে ইঙ্গিতটি দিচ্ছে তা হলো- ২১ শতকের সবচেয়ে রক্তাক্ত সঙ্ঘাতে পরিণত হওয়া ঘটনাবলীতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা পাশ্চাত্যের শক্তিগুলোর হ্রাস পাওয়া। এর বিপরীতে মাত্র কিছু দিন আগেও অসম্ভব বিবেচিত আসাদকে ক্ষমতায় রাখাটা তার মিত্র রাশিয়া ও ইরান প্রায় সম্ভব করে ফেলেছে। অবশ্য ২০১৭ সালেও সিরিয়া যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবেই থাকবে। অন্যদিকে, রুশ বিমানবাহিনী এবং আসাদ সরকারের নির্বিচারে বেসামরিক লোকজন হত্যা করার পরিণতিতে ইসলামিক স্টেটের বা আইএস-র সমর্থন বাড়ানোর ক্ষমতা অটুট রাখবে। এছাড়া ইরাক, লিবিয়া ও ইয়েমেনের সঙ্ঘাত অব্যাহত থাকবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের উদ্বাস্তু সঙ্কটটি আরো দীর্ঘায়িত করবে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার শুদ্ধি অভিযান বহাল রাখবেন, তুরস্কে পাশ্চাত্য প্রভাব আরো কমতে থাকবে। তুরস্কের ভেতরে এবং পুরো অঞ্চলে থাকা কুর্দি গ্রুপগুলোর সাথে তুরস্কের সহিংসতা আরো তীব্র হবে। ডেভিড ফ্রিডম্যানকে ইসরাইলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক ভূমিকা পালনের যেকোনো সম্ভাবনা কার্যত শেষ করে দিয়েছে।

৭. মানবাধিকারের ওপর বৈশ্বিক দমন-পীড়ন : ২০১৬ সালে বেশ কিছু খারাপ খবর দেখা গেছে। বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক ও ব্লগারকে আটক করা হয়েছে; তারা আক্রান্ত হয়েছে। অনেক এনজিও হয়রানির শিকার হয়েছে, বিপুলসংখ্যক বিরোধী রাজনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্ট বা সক্রিয়বাদী  নিহত হয়েছেন। আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক সরকার ২০১৭, দমনমূলক আইন করবে, নাগরিক সমাজগুলোকে হুমকি দেবে। এর মধ্যে  অনেক গণতান্ত্রিক সরকারও রয়েছে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক দেশই লাখ লাখ সংগঠনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে; এটা আরো বাড়তে পারে। এটা বিশ্বের কোনো এক অঞ্চলে সীমিত থাকবে না। তবে কয়েকটি স্থানে সত্য কথা বলাটাও হবে সবচেয়ে বিপজ্জনক।

৮. সাইবার হামলা : সাইবার হামলা গত বছর বেশ আলোচিত ছিল। সাইবার হামলায় মার্কিন নির্বাচন প্রভাবিত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে বিষয়টি আরো নতুন মাত্রা পাবে। নতুন নতুন স্থান এতে আক্রান্ত হবে।

৯. আফগানিস্তান – সবসময়ের দুঃস্বপ্ন : গত কয়েক শতাব্দী ধরে আফগানিস্তান যে ধরনের দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, তার নজির খুবই কম। এই দুর্ভোগের অবসান ঘটবে- এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বরং মার্কিন নেতৃত্বাধীন হামলার পর ২০১৭ সালটিতে সহিংসতা বাড়বে বলেই আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে। তালেবান হামলায় সরকারের পতন পর্যন্ত ঘটতে পারে। আফগানিস্তান ছাড়াও আরো কয়েকটি দেশ আক্রান্ত হতে পারে। এতে করে চীনের ‘এক অঞ্চল, এক সড়ক’ (ওয়ান বেল্ট- ওয়ান রোড) উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কাবুলের ব্যাপারে পাকিস্তান প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রাখবে। জার্মানিতে আফগান উদ্বাস্তুদের ভিড় বাড়তে থাকতে পারে।

১০. অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় : অপ্রত্যাশিত অনেক বিপর্যয় ঘটতেই পারে। অতীতে অনেকবারই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। জাপানের পার্ল হার্বার আক্রমণ, আফ্রিকার উপনিবেশমুক্ত হওয়া, ইরানি বিপ্লব, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, নাইন ইলেভেন কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন একেবারেই অপ্রত্যাশিত বিবেচিত হতো। ২০১৭ সালে অপ্রত্যাশিতভাবে কোন কোন ঘটনা ঘটার প্রত্যাশা করা যেতে পারে?  চীনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সম্ভানবনা রয়েছে; আর এর ফলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সৌদি রাজপরিবারের পতন এবং সেখানে কট্টর ইসলামপন্থীদের উত্থানের  মতো নাটকীয় ঘটনার সম্ভাবনা আছে। এটাই যদি হয় তবে তা হবে ১৯৭৯ সালের ঘটনার মতোই। ইতালির ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়ায় ইউরোর পতন ঘটতে পারে। এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট ট্রায়ালও দেখতে হতে পারে এই ২০১৭-তে! (সূত্র : পোস্টওয়েস্টার্নওয়ার্ল্ড ডটকম)