Home » বিশেষ নিবন্ধ » চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৫ : চীনে হেনরী পলসনের উর্বর সময়

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৫ : চীনে হেনরী পলসনের উর্বর সময়

আনু মুহাম্মদ ::

ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পিপিপি) হিসাবে চীন ২০১৫ সালে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাধারণ জিডিপির হিসাবে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। চীনের ইতিহাসে বৃহত্তম অর্থনীতির অবস্থানএটিই নতুন নয়। অর্থনৈতিক ইতিহাসের পন্ডিত এ্যাঙ্গুস মেডিসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ২ সহস্রাব্দকাল জুড়ে চীন বিশ্বের  বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবেই অবস্থান করছিলো। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে চীন আর সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। মেডিসন একইসঙ্গে বলেছেন, বৃহত্তম অর্থনীতি হলেও সেইসময় বৈদেশিক বাণিজ্যে চীনের অংশগ্রহণ ছিল শতকরা মাত্র ০.৬ ভাগ। তখন চীনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আফিমই ছিলো মোট আমদানির এক চতুর্থাংশ। বর্তমানে চীন বৈদেশিক বাণিজ্যে শীর্ষস্থানে আছে। বিশ্বের সকল রফতানিকারকদের জন্য চীন এখন বৃহত্তম বাজার, বিনিয়োগকারিদের জন্য সবচাইতে বড় বিনিয়োগক্ষেত্র। চীনের অর্থনীতির এই শক্তিই  বিশ্বের পুঁজির কেন্দ্র সংস্থাগুলোকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করছে। বিশেষ করে ৯০ দশকের শুরু থেকে এসব সংস্থার লবিস্টদের সক্রিয়তা তাই চীনকে ঘিরে নতুন মাত্রা লাভ করেছে, বেড়ে গেছে বহুগুণ।

চীন সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী হেনরী পলসনের ভূমিকা ও অভিজ্ঞতার বর্ণনায় এই পর্বের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। হেনরী পলসন ছিলেন অর্থকরী খাতের, বিনিয়োগ বাজারের সহযোগী অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের  গোল্ডম্যান স্যাকস এর প্রধান নির্বাহী। এই অবস্থান থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী (যা মার্কিনী রীতি অনুযায়ী ট্রেজারি সেক্রেটারি নামে অভিহিত) হন। ওয়াল স্ট্রীটের কর্তাব্যক্তি মার্কিন নীতি নির্ধারণী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া বহুবছর ধরেই একটা সাধারণ নিয়ম। ওয়াল স্ট্রীট এবং হোয়াইট হাউজ সেজন্য সবসময়ই একাকার। গোল্ডম্যান স্যাকস গৃহায়ন খাতে বিশাল ঋণ-বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থাকায় তার ধ্বসে ২০০৮ সালের মার্কিন আর্থিক সংকটের সময় এই সংস্থাও চরম সংকটে পতিত হয়। হেনরী পলসন তখন প্রেসিডেন্ট বুশের সহযোগিতায় মার্কিন আর্থিক সংকটের জন্য দায়ী এসব সংস্থার বড় কর্মকর্তাদের রক্ষা ও উদ্ধারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। সরকারের (জনগণের) বিপুল অংকের অর্থ দিয়ে ধ্বসে পড়া এসব সংস্থা উদ্ধার করা হয়। পলসন নিজেও ব্যক্তিগতভাবে বুশ সময়কালের বিভিন্ন নীতির কারণে বিপুলভাবে লাভবান হয়েছেন।

গোল্ডম্যান স্যাকস-এর কর্মকর্তা হিসেবে দ্রুত পদোন্নতি এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভের পেছনে চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে পুঁজিবাজারে আনায় তার সাফল্যকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। চীনে তিনি কীভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর লবিস্ট হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন, তদ্বিরে সাফল্য পাবার জন্য বিভিন্ন যোগাযোগ তৈরি করেছেন, বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যবহার করেছেন তার বিশদ বর্ণনা দিয়ে পলসন একটি বই লিখেছেন, সম্প্রতি তা প্রকাশিত হয়েছে।[i]

এই বইতে বর্তমান চীন সম্পর্কে পলসন লিখছেন, ‘খুব বেশিদিন বাকি নাই, যে স্থান আমরা গত ১৫০ বছর ধরে দখল করে আছি চীন আমাদের সেই অবস্থান ছাড়িয়ে, বিশ্বের  প্রধান  অর্থনীতিতে পরিণত হবে।…চীন এখন সবকিছুতে শীর্ষস্থানের ভূমি। এটি বিশ্বের সবচাইতে দ্রুত গতিসম্পন্ন সুপারকম্পিউটারের দেশ, সবচাইতে বড় বায়ু বিদ্যুতের কেন্দ্র স্থাপনার দেশ, দীর্ঘতম সমুদ্র সেতুর দেশ। এই দেশ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কয়লা, সিমেন্ট, লৌহপাত, শতকরা ৪০ ভাগ এলুমিনিয়াম ও কপার ব্যবহার করে। পৃথিবীতে যতো  নির্মাণকাজ হচ্ছে তার প্রায় অর্ধেকই এখন চীনে।…আজ আমরা খবরে পড়ছি নিকারাগুয়ার ভেতর দিয়ে পানামা খালের দ্বিগুণ আয়তনের পথ তৈরি করতে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্পের কথা, পরদিন পড়ছি চীনা নির্মাতারা আইসল্যান্ডের একাংশ কিনে নিতে চায়, তারপর আমরা আবার পড়ছি ছয়মাসে পৃথিবীর উচ্চতম ভবন নির্মাণে তাদের পরিকল্পনার কথা।… ৪০ বছর আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকানরা চীনের কাছ থেকে এক সেন্ট ঋণ করবার কথাও ভাবতো না, এখন সেই চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতা, আমাদের ঋণের মধ্যে প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার চীনের পাওনা।’

এই চীনকে নিয়ে তাই পলসনের অস্থির তৎপরতা এবং তাতে সাফল্যের মধ্য দিয়ে নিজের ও ব্যবসায়িক সংস্থার সাফল্য খুবই বোধগম্য।  তিনি তাঁর সফর সম্পর্কে জানিয়েছেন, ‘ব্যবসায়ী হিসেবে আমি চীনের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। ২৫ বছর ধরে ১০০বারেরও বেশি সফরের মধ্য দিয়ে আমার পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসে থাকাকালে এর ব্যবসা বাণিজ্য এবং ট্রেজারি সেক্রেটারি থাকাকালে চীনেরসামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ে জানা সম্ভব হয়েছে।’ পলসনের বই থেকেই জানা যায়, গোল্ডম্যান স্যাকস, জেপি মরগ্যানসহ তাদের বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীরা কীভাবে শতশত লোক লাগিয়ে ছুটাছুটি করছে বেইজিংসহ নানা শহরের বিভিন্ন দফতরে, সুবিধামতো লোক নিয়োগ দিচ্ছে, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাচ্ছে, উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পটানোর জন্য নানাভাবে যোগাযোগ স্থাপন করছে। এটাও বোঝা যাচ্ছে নানা বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে পলসন কীভাবে অন্যদের থেকে এগিয়ে যাচ্ছেন!


[i] Henry M Paulson, JR: Dealing With China, An Insider Unmasks the New Economic Superpower, Twelve, NY, 2015.