Home » আন্তর্জাতিক » নেপাল নিয়ে চীন-ভারত লড়াই

নেপাল নিয়ে চীন-ভারত লড়াই

কমল দেব ভট্টরাই ::

অনুবাদ : আসিফ হাসান

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ঘোষণা করে, প্রথমবারের মতো তারা নেপালের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে নেপালে চীনা সামরিক সহযোগিতা বাড়লেও চীন এই প্রথম যৌথ মহড়ার প্রস্তাব দিল এবং নেপালও তা গ্রহণ করল।

ভারতের সঙ্গে ১৯৫০ সালে করা শান্তি ও মৈত্রী চুক্তিটি কিছু ধারা পরিবর্তনের জন্য নেপাল ওই প্রস্তাব করার প্রেক্ষাপটে যৌথ মহড়ার আয়োজন চলছে। অথচ ভারতের সঙ্গে চুক্তিতে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগে ভারতকে জানাতে হবে অথবা ভারতের সম্মতি নিতে হবে নেপালকে।

সামরিক সরঞ্জাম কেনাসহ নিরাপত্তা ইস্যুগুলো নিয়ে স্বাধীনভাবে যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়- এমনভাবে চুক্তিটিতে সংশোধন চাইছে নেপাল। এখনো অবশ্য নেপাল সেনাবাহিনীর সামরিক সরঞ্জামের বৃহত্তম সরবরাহকারী দেশ ভারত। ১৯৫০ সাল থেকে দুই দেশের সেনাপ্রধানদের একে অন্যকে সম্মান প্রদর্শনের রীতি প্রচলিত রয়েছে। এটা দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তাৎপর্য বহন করে।

এই ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটা পরিষ্কার যে, ভারতের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কে পরিবর্তন আনতে চায় নেপাল। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় যৌথ সামরিক মহড়াটির কথা চীন যখন ঘোষণা করে, তখন এ নিয়ে ভারত তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। তবে এ নিয়ে ভারতের দিকথেকে এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো অসন্তোষ প্রকাশ করা না হলেও, ভারতীয় মিডিয়ার খবর ও বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, নয়া দিল্লি এমন সিদ্ধান্তে খুশি নয়।

নেপাল-চীন সামরিক মহড়ার বিষয়ে ভারতের উদ্বিগ হওয়ার কোনো কারণ নেই। নেপালের সাথে কেবল চীনেরই সামরিক মহড়া হয়, বিষয়টি কোনোভাবেই এমন নয়। নেপাল ও ভারতের মধ্যে সেনাবাহিনীর বার্ষিক মহড়া হয়ে থাকে। একইভাবে বার্ষিকভিত্তিতে নেপাল-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক মহড়াও হয়ে থাকে। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে (এক্ষেত্রে চীন) নেপাল কোনো সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে পারবে না- এমনটা বলার অধিকার নেই ভারতের। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার সার্বভৌম অধিকার আছে নেপালের।

উপরন্তু চীনের সঙ্গে নিজস্ব যৌথ সামরিক মহড়া চালায় ভারত। এমনকি পরমাণু সরবরাহ গ্রুপে ভারতের যোগ দেওয়ার ভারতের চেষ্টায় সমর্থন দিতে চীনের অনীহাসহ বিভিন্ন কারণে ২০১৬ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হলেও দু’দেশই ২০১৬ সালের নভেম্বরে ১৩ দিনের যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। এটা চীন-ভারতের ৬ষ্ঠ সামরিক মহড়া। চীনের সাথে ভারতের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এই দৃঢ়বিশ্বাস সৃষ্টি করে যে, যৌথ মহড়া একই ধরনের কৌশলগত স্বার্থের ইঙ্গিত নয়।

তবুও ভারতের বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন। নয়াদিল্লিতে চীনা বিশেষজ্ঞ জয়দেব রানাদে সম্প্রতি ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেন, নেপাল-চীন সামরিক মহড়ার তাৎপর্যের প্রতি ভারতের উচিত সতর্ক দৃষ্টি রাখা; দেখতে হবে এটা সেনাবাহিনী-সেনাবাহিনীর মধ্যকার সম্প্রসারিত মাত্রার সম্পর্ক সৃষ্টি করছে নাকি এই মহড়াতেই সবকিছুর ইতি ঘটছে।

ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মহড়াটি নয়া দিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ ভারত মনে করছে, তাদের দোরগোড়ায় চীন ঢুকে পড়ছে। ভোয়াকে রানাদে বলেন, ‘আমরা [ভারত] নেপালকে দেখি আমাদের কৌশলগত দেশ ও স্থান হিসেবে; আর সেখানেই কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।’

ভারত চায় নেপালকে তার ‘প্রভাব বলয়ে’ রাখতে, আর চীন চায় তার শক্তি বাড়াতে । ভারতের দৃষ্টিতে নেপালে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব শুধু ব্যবসা বাণিজ্যের সাথেই সম্পর্কিত নয়, বরং তা দক্ষিণ এশিয়াকে বৃত্তাবদ্ধ করার তাদের বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্যের অংশবিশেষ।

সত্যিকার অর্থেই সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোতে নেপালে ভারত ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে নেপালে ভারত প্রায় বিশেষ প্রভাব উপভোগ করেছে। অবশ্য গত দশকে, প্রধানত ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলোপের পর, অন্যান্য আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়, বিশেষ করে চীন, প্রধানত রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নেপালে তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে।

একই সময়ে নেপালে চীন তার কূটনীতিকে ‘নীরব কূটনীতি’ থেকে ‘সরব’ কূটনীতিতে নিয়ে গেছে। নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি নিয়ে চীন তাদের উদ্বেগ ক্রমবর্ধমান হারে প্রকাশ করছে, ঠিক যেভাবে ভারত দীর্ঘ দিন করেছে। গত বছর নেপালের সরকার পরিবর্তন খেলায় চীনকেও টেনে আনা হয়েছিল।

২০১৫ সালে নেপাল তার সংবিধান চূড়ান্ত করে এবং ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে নেপাল ও চীনের মধ্যকার লেনদেন ও আদানপ্রদান ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নেপাল-ভারত সীমান্তে ভারতের অবরোধ আরোপ করার অভিযোগের পর (ভারত তা অস্বীকার করে) নিত্যপণ্যের প্রয়োজন মেটানোর জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠে, যদিও চীনের সাথে তার বাণিজ্য পর্যাপ্ত নয়।

নেপাল ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনার ফলে বিশেষ করে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করে চীনের জন্য। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফাইড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট) অথবা সিপিএন-ইউএমএল চেয়ারম্যান কে পি ওলি’র নেতৃত্বাধীন নেপাল সরকার চীনের সঙ্গে ব্যবসা ও  ট্রানজিটবিষয়ক চুক্তি সই করে। এর মধ্য দিয়ে তারা নেপালের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটায়।

একইভাবে নেপাল-ভারত যৌথ উদ্যোগে রেলওয়ে সম্প্রসারণ ও সড়ক সংযোগসহ বেশ কিছু প্রকল্প গতি পায়। ওলি সরকারের সঙ্গে কাজ করে স্বস্তিতে ছিল চীন সরকার। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত দ্য গ্লোবাল টাইমসসহ চীনা মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায়। ওলির নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর এবং পুস্প কমল দাহাল ওরফে প্রচন্ডের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর চীনা মিডিয়ায় ওলির আমলে করা চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

এদিকে, ভারত আশা করে, প্রচন্ডের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের প্রতি আরো বেশি অনুকূল হবে। একইভাবে তারা আশা প্রকাশ করে, নেপালে চীনের প্রভাবও কমে গিয়ে ভারতকে তার আগের প্রভাবমূলক অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেবে। তবে ক্ষমতায় এসেই প্রচন্ড ঘোষণা করেন, তিনি ভারত ও চীনের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখবেন। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ে বিশেষ দূত পাঠিয়ে তার সরকারের অগ্রাধিকার এবং সেইসাথে উভয়ের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার আকাক্সক্ষা সম্পর্কে দু’দেশের সরকারকে অবহিত করেন।

কিন্তু এ ধরনের বাগাড়ম্বরতার মধ্যেও প্রচন্ডের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের ঝুঁকছে বলে অভিযোগের মুখে পড়ে। নতুন সরকার গঠনের এক মাস পর তিনি রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত যান। তার এই সফরের পর পরই ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী নেপাল সফর করেন। ১৮ বছরের মধ্যে তিনিই প্রথম ভারতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নেপাল সফর করলেন।  তবে নেপালে নতুন সরকার গঠনের পর থেকে নেপাল ও চীনের মধ্যে এমন উচ্চপর্যায়ে কোনো সফর হয়নি। নেপালের প্রধানমন্ত্রী প্রচন্ডের চীন সফর ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের নেপাল সফরের বিষয়টি অচলাবস্থায় রয়েছে।

২০১৬ সালে নেপাল সফরে আসার কথা ছিল শি জিন পিংয়ের। কিন্তু হিমালয় রাষ্ট্রটিতে ‘এক অঞ্চল -এক সড়ক’ (ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড) উদ্যোগটি বাস্তবায়ন না করায় সফরটি হয়নি। পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত চীনের এই বিশাল কানেকটিভিটি প্রকল্পটি নিয়ে কয়েকটি চুক্তিতে সই করার জন্য পরে চীন চাপ দিতে থাকে। তবে এক্ষেত্রে ভারতের সাড়া ইতিবাচক নয়।

এ সমস্যা কেবল প্রচন্ডের জন্য নয়। নেপালের সাম্প্রতিক সব প্রধানমন্ত্রীই এ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, নেপালের প্রধানমন্ত্রী এবং রাজনীতিবিদেরা অল্প সময়ের মধ্যেই হয় চীনপন্থী কিংবা ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন। অথচ দেশের সমৃদ্ধির জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক কল্যাণ হাসিল করতে উভয় প্রতিবেশীর সাথেই আন্তরিক সম্পর্ক সৃষ্টি করা উচিত।

(কমল দেব ভট্টরাই : নেপালি সাংবাদিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ক বিশ্লেষক। নিবন্ধটি দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেয়া)