Home » বিশেষ নিবন্ধ » ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সম্পর্কে এক অনন্য চলচ্চিত্র – বিয়ন্ড দ্য হিল

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সম্পর্কে এক অনন্য চলচ্চিত্র – বিয়ন্ড দ্য হিল

ফ্লোরা সরকার ::

আপাত নিরীহ অত্যন্ত ধীর গতির ছবি , ‘বিয়ন্ড দ্য হিল’ দেখলে মনেই হয়না সেখানে এতো শঙ্কা, সন্দেহ আর উদ্বেগ থাকতে পারে। সারা ছবি জুড়ে বিশাল পাহাড় ঘেরা মনোরম প্রকৃতিক দৃশ্য, নিবিড় বন আর এক্সট্রিম লং শটগুলো যেন একের পর এক চিত্রকর্ম এঁকে যায়। যেন ভাবনাহীন এক অনন্ত জীবনের গল্প আমরা দেখতে বসেছি। যেকোনো শহরে গেলে, তার বাইরের শান্তশিষ্ট রূপ দেখে যেমন সেই শহরের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব জটিলতাগুলো বোঝা যায়না ঠিক তেমনি তুরস্কের পরিচালক এমিন আলপার নির্মিত ‘বিয়ন্ড দ্য হিল’ ছবির আপাত নিরীহ গল্প দেখে ঠিক সেরকম মনে হয়। ছবির শুরু থেকে যে ধীর গতি আমরা লক্ষ্য করি ছবির শেষ পর্যন্ত তা একই ছন্দে চলে। অথচ টানটান উত্তেজনা ছবির শুরু থেকেই আমরা অনুভব করি। সাধারণ এক পরিবারের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে পরিচালক আলপার আমাদের নিয়ে যান যেকোনো দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের রাজনীতির ময়দানে। আর তাই ছবিটি বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, সিনেফোরাম এশিয়া ও আরব সিনেমা ফেস্টিভাল, ইস্তাম্বুল চলচ্চিত্র উৎসব সহ আরও অনেক উৎসবে ছবিটা পুরস্কৃত ও আলোচিত হয়।

ফাইখ নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত বনকর্মকর্তা স্থায়িভাবে আনাতলিয়ার একটা প্রত্যন্ত গ্রামে থাকেন। জমিদারি আভিজাত্যের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তার চরিত্রে পুরোদমে উপস্থিত। ফাইখের জমিজমা দেখাশোনা করার জন্য এবং কিছু জমি ভাড়া নিয়ে মোমেত নামের একজন মধ্যবয়সি তার পরিবার (বউ মরিয়ম এবং কন্যা সুলু) নিয়ে সেখানে বসবাস করে। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি ব্যক টু ক্যামেরায় একজন লোক প্রচন্ড শক্তিতে বনের পপলার গাছগুলো কাটতে কাটতে সামনে এগিয়ে যায়।  দৃশ্যটা পরিচালক পুরো ছবিতে বেশ অনেকবার দেখান। ছবির টেনশান বলা চলে এই গাছ গাটা থেকেই শুরু হয়ে যায়। কেননা, একটু পরেই আমরা জানতে পারি, ফাইখের ক্রমশই বিশ্বাস জন্মাচ্ছে, পাহাড়ের ওপারে অযাচিত কিছু যাযাবরের আগমন ঘটেছে- যারা তার অধিকারে থাকা এই গাছগুলো কেটে ফেলছে। অথচ যে লোকটা গাছগুলো কাটে তাকে সামনে থেকে আমরা কখনোই দেখতে পাইনা। কেনো তাকে দেখা যায়না বা দেখানো হয়না  ছবিতে। ছবির গল্প এগিয়ে গেলে আরও কিছু চরিত্রের আর্বিভাব ঘটে। শহর থেকে ফাইখের তালাকপ্রাপ্ত বড় ছেলে নুসরেত এবং নুসরেতের দুই ছেলে জাফের এবং কানের, ফাইখকে দেখতে এসে কিছুদিন সেখানে অবস্থান করে। ছবির গল্প তাদের এই অবস্থান এবং এই কয়জন চরিত্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়।

ফাইখের ছেলে আর নাতি আসার পর ফাইখের ভেতর পপলার গাছ উজাড় করার সন্দেহটা আরও বেড়ে যায়। অন্যদিকে নুসরেতের বড় ছেলে, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা জাফের, ছবির অত্যন্ত একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। যে চরিত্রের মধ্যে দিয়ে পরিচালক আমাদের কোনো সংলাপ ছাড়া, মাত্র একটা দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে, কীভাবে একটা দেশে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ধীরে ধীরে দানা বাঁধে, অত্যন্ত মুন্সিয়ানায় তা পরিচালক দেখিয়ে দেন। ছবির প্রানোচ্ছল একটা মুহূর্ত্তে, জাফের তার ছোটা ভাই কানেরের খুনসুটির পর জাফের মহা-আনন্দে নদীতে গোসল করতে নামে। গোসলের একটা পর্যায়ে জাফের ডুব দিয়ে উঠেই যে দৃশ্যটা দেখে সেটা দেখে, জাফেরের সঙ্গে দর্শকও ভয়ে আঁতকে উঠে। জাফেরের ব্যাক টু ক্যামেরায় আমরা দেখি একজন একজন করে বেশ কিছু সংখ্যক সেনা মার্চ করে নদী পার হয়ে চলে যায়। দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে ‘আংকল বুনমি হু ক্যান রিকল হিজ পাস্ট’ ছবির একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে আমরা দেখি অসুস্থ বুনমি কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে শহরতলীর একটা নিরিবিলি জায়গায় এসে অবস্থান করে । রাতের খাবার খেতে বসলে তার প্রয়াত বউ এবং ছেলে সেখানে এসে হাজির হয়। সারা ছবিতে বুনমি তাদের সঙ্গে কথা বলে যায় এবং মৃত মানুষগুলোকে অসম্ভব রকম জীবন্ত মনে হতে থাকে। জাফেরের সামনে দিয়ে যখন সেনাদল চলে যেতে থাকে এবং সেই সেনাদলের একজনও যখন ভুল করেও জাফেরের দিকে তাকিয়ে দেখেনা, এই অসম্ভব বিষয়টাও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে দর্শকের কাছে। শুধু একবার না, ফাইখের বন উজাড় করা দৃশ্যের মতো জাফেরের এই সেনাদলকে বেশ কয়েকবার দেখা যায়। আসলে ফাইখ এবং জাফের দুজনই কাল্পনিক শত্রুর অস্তিত্বের সন্দেহে ঘুরপাক খায়। ফাইখ মনে করে পাহাড়ের ওপারে কোনো যাযাবর জাতি তার বাগানের পপলার গাছগুলো কেটে তার ভূমি দখল করে নেবে। সেজন্য তার পরিবারের মানুষেরাও হয়তো তাদের সহায়তা করতে পারে। কাল্পনিক শত্রুকে মোকাবিলার জন্য, ফাইখ সবাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে কিছু দূরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে রাত কাটায়। অন্যদিকে, জাফের মনে করে তার দাদা (ফাইখ) যদি তাকে তার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে তাহলে সে সেই সেনাবাহিনীর সাথে যোগদান করবে কিনা। এমনকি মোমেতের বউ মরিয়মের পর্যন্ত বিশ্বাস পাহাড়ের ওপারে শত্রু আছে, যারা তাদের সম্পত্তি দখল করে নিতে পারে। এভাবে ছবির প্রায় সবগুলো চরিত্রের মধ্যে এক অজানা, অচেনা কাল্পনিক শত্রুর অস্তিত্বের সন্দেহের বীজ বুনে চলেন পরিচালক। আকাশের নিচে রাত কাটানো, বন উজাড়া করার দৃশ্য, সেনাবাহিনীর দৃশ্য, মরিয়মের বিশ্বাস এইসব কিছু ছবিতে চমৎকার মেটাফোরিক্যালি সাজানো হয় সেই ষড়যন্ত্র তত্তে¡র উপস্থিতি বোঝানোর জন্য। অথচ ছবির চরিত্র সেই ছোট্ট মেয়ে সুলুর মনে কিন্তু‘ এই ধরণের কোনো সন্দেহ দেখা দেয়না। ছবির একটা দৃশ্যে সে তার বাবাকে বলে, ‘পাহাড়ের ওপারে কোনো যাযাবর নেই’।

মনে হতে বাধ্য, ছবির এই ছোট্ট মেয়েটি যেন যে কোনো দেশের নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে। নজরদারির নামে রাষ্ট্র যেসব সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনী, গোয়েন্দাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী নিরন্তর নিয়োজিত রাখে, নাগরিকদের তাতে কিছুই যায় আসেনা। কেননা তাদের ভেতর কোনো ষড়যন্ত্র তত্তে¡র কোনো শঙ্কা কাজ করেনা। রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিত ফাইখ, জাফেরের মতো রাজ-প্রতিনিধিরাই কেবল ষড়যন্ত্র তত্তে¡র গন্ধ পায়। অজানা শত্রুকে (দেশি-বিদেশি) মোকাবিলা করতে গিয়ে একতার চেয়ে বিচ্ছিন্নতা, বিশ্বাসের চেয়ে সন্দেহ, মঙ্গোলের চেয়ে অমঙ্গোলই ডেকে আনা হয় বেশি। এতে করে সমাজ বা রাষ্ট্র শুধু বিভক্ত হয়েই পরেনা, পারস্পরিক শত্রুতে পরিণত হয়। পরিচালক এমিন আলপার আমাদের সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। ছবির বিশাল বিশাল ল্যান্ডস্কেপ, যা অধিকাংশই আমরা দেখি একস্ট্রিম লং শটে সেসব যেন একটা দেশের বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত বহন করে। যদিও শেষ পর্যন্ত একটা ধনাত্মক সমাধানে পরিচালক আমাদের পৌঁছে দেন, পরিবারের সবার বোধদয়ের মাধ্যমে; কিন্তু ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে দর্শক ভাবতেই থাকে। ছবির একবারে শেষ দৃশ্যের শেষ শটটা ছাড়া কোথাও কোনো আবহ সঙ্গীত শোনা যায়না। নদীর স্রোত বাতাস, মুরগির ডাক, গাছের পাতার শব্দ ইত্যাদি সব মিলিয়ে এক অসাধারণ সঙ্গীতের কাজ করে। এসব প্রকৃতিক আবহ-সঙ্গীতের মতো মেটাফোরিকাল ছবিটা শেষ পর্যন্ত জীবন্ত বাস্তব হয়ে ওঠে। তুরস্কের অভ্যরীণ গোলযোগকে মাথায় রেখে এমিন আলপার ছবিটা নির্মাণ করেছেন বলে ২০১৬ সালের মাঞ্চেন চলচ্চিত্র উৎসবে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের চিন্তা করতে হবে- কি ধরণের সমাজ আমরা চাই? আমরা কি বদ্ধ এবং আদর্শবান একটা সমাজ চাই- যেখানে অভন্ত্যরীণ গোলযোগগুলোকে একেবারে অন্ধের মতো উপেক্ষা করা হয় ? নাকি আমরা তেমন সমাজ চাই, যারা একদিকে নিজেদের একেবারে ধোয়া তুলসি পাতা মনে করেনা; অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলোকে নিজেদের দুর্বলতা হিসেবেও দেখেনা এবং যে সমাজকে সংঘবদ্ধ হবার জন্য কোনো শত্রু বা যত দোষ নন্দ ঘোষের প্রয়োজন পড়েনা? মনে হয়, ছবিটি দেখার পর এসব বিষয় নিয়ে অনেকেই ভাববেন।’ শুধু এই ছবি নয়, তার পরের ছবি ‘ফ্রেনিজ’ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবি রাখে।  পরবর্তী কোনো সময়ে আমরা সেই ছবি নিয়ে আলোচনা করবো।