Home » বিশেষ নিবন্ধ » আইনের শাসন না আইনকে শাসন

আইনের শাসন না আইনকে শাসন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

”The foundation for our financial centre were the rule of law, an independent judiciary and a stable, competent and honest government that persuaded sound macro economic policies with budget surpluses almost every year. This led to strong and stable Singapore dollar” (source: From Third World To First: The Singapore Story 1966-2000; Author: Lee Xuan Eu, pages 91-92).

একজন স্বৈরশাসক, যিনি তার দেশকে মাত্র সাড়ে তিন দশকে শনৈ শনৈ উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছেন, উন্নয়নের মডেল প্রতিষ্ঠা করেছেন বিশ্বে, সে বিষয়ে ওপরের প্যারার সংক্ষিপ্ত বয়ান তার তাঁর রচিত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ থেকে উদ্বৃত করা হয়েছে। আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান ইউ তার দেশকে অর্থনৈতিক মানে যে জায়গায় নিয়ে গেছেন, তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। দেশের প্রতিটি স্তরে তার সরকার সুশাসন নিশ্চিত করেছিল।

শাসক হিসেবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি কতটা আপোষহীন ছিলেন, যে কোন কৌতুহলী পাঠক সেটি বর্ণনা পাবেন একই গ্রন্থের Keeping the Government clean অধ্যায়ে। এখানে তিনি জানাচ্ছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন যুদ্ধের কথা। তার নীতি ছিল বড় দুর্নীতিবাজদের প্রতি ক্ষমাহীন থাকলে ছোটগুলো জায়গা পাবে না। দুর্নীতি দমনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Corrupt Practice Investigation Bureau (CPIB) এই প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কতটা শক্তিশালী, সেটির বর্ণনা দিচ্ছেন এই অধ্যায়ে।

তাঁর মন্ত্রীসভার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য তে চেং ওয়ান ছিলেন জাতীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। ১৯৮৬ সালে এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগে বলা হয়, প্রচলিত আইন ভেঙ্গে মন্ত্রী একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিতে চার লাখ সিঙ্গাপুর ডলার ঘুষ নিয়েছেন। তে চেং ওয়ান যথারীতি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং সিপিআইবি’র তদন্ত কর্মকর্তার কাজে বাধা দেন। কেবিনেট সচিব প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউকে জানান মন্ত্রী ওয়ান তাঁর সাক্ষাত চান। লি তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত মন্ত্রীকে তিনি সাক্ষাত দেবেন না।

তদন্ত চলাকালে সপ্তাহখানেকের মধ্যে মন্ত্রী ওয়ান আত্মহত্যা করেন ও প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নোটে লেখেন, “আমি গত দুই সপ্তাহ ধরে খুবই বিষন্ন বোধ করছিলাম। দুর্ভাগ্যজনক এ ঘটনার দায় আমি স্বীকার করছি। সম্পুর্ন দায়ভার মাথা পেতে নিচ্ছি। প্রাচ্যদেশীয় একজন ভদ্রলোক হিসেবে মনে করছি, পাপের প্রায়শ্চিত করার এটি সবচেয়ে উত্তম উপায়” । ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। দুর্নীতি ও আত্মহত্যা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারনায় আত্মঘাতী ওয়ান এর পরিবার চিরতরে সিঙ্গাপুর ত্যাগ করেন। ঘটনাটির পর্যবেক্ষনে লি কুয়ান লেখেন, আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরী করেছি, যেখানে জনমত সরকারী প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিকে বিপদজনক হিসেবে গণ্য করে। এজন্যই অভিযুক্ত মন্ত্রী অসম্মান ও সামাজিক ঘৃনার চাইতে মৃত্যুকেই শ্রেয়তর জ্ঞান করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এসবের মধ্য দিয়ে তারা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম ছিলেন যে, দল-গোষ্ঠি বা ব্যক্তির প্রতি পক্ষপাত করে শাসন চালিত হয় না। সেখানকার শাসন আইনের প্রতি অন্ধ। আইনানুগ ও ন্যায়ানুগ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেই তারা উন্নততর রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন ও এই উন্নয়ন কেন্দ্রে অবশ্যই মানুষ ছিল এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহনও ছিল। অপরাধ করে বংশ পরিচয়, পারিবারিক কিংবা দলীয় পরিচয় দিয়ে সিঙ্গাপুরে আজও নিস্তার পাওয়ার কোন উপায় নেই।

সিঙ্গাপুর নিয়ে এত কথা বলার কারন হচ্ছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান শাসকরা উন্নয়নের বয়ান করতে গিয়ে আকছার সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার সাথে তুলনা করতে ভালবাসেন এবং ঐ মানে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখান দেশবাসীকে। এজন্য তারা ওই দুই দেশের স্বৈরশাসনের উদাহরনের পুণরাবৃত্তি করে থাকেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরের মানে পৌঁছতে কিভাবে আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন সে বিষয়টি উহ্য রাখছেন। কারন শাসকরা ইতিমধ্যেই আইনকে শাসনের মাধ্যমে আইনের শাসন বদলে দিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতির একের পর এক উদাহরন তৈরী করছেন।

যে কোন একটি উপায় অবলম্বন করে নির্বাচনে জয়ী হয়ে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রে এরকম উন্নয়নের বোল-চাল দেয়ায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে- আইনের শাসনের চাইতে আইনকে শাসনের পদ্ধতিগত পথটিকে নির্দেশ করা হচ্ছে। এজন্যই তারা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে পার্টিজান হিসেবে রূপান্তরিত করেছেন। সত্য-মিথ্যের মিশেলে মিথ তৈরী করে সেটিকেই সত্য হিসেবে চালানোর চেষ্টা করছেন। এই অর্ধসত্যের স্থায়ীত্বশীলতা দিতেও আইন করা হয়েছে, যাতে ইতিহাসের রুঢ় সত্যের মুখোমুখী হতে না হয়।

এই দেশে আইনের শাসন নিয়ে, বিচারহীনতা নিয়ে এন্তার কথা হয়। বলা হয়, আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে আইনের শাসন। এখন দেশে আইনের অভাব নেই। সাদা-কালো, নিবর্তণমূলক, অধিকার হরণকারী-অজস্র আইনের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তবে ব্যক্তি বিশেষ, গোষ্ঠি বা দল-মতের প্রতি প্রায়োগিক ক্ষেত্র একেকরকম। অন্তিম হিসেবে, আইনের প্রয়োজনে জনগন, জনগনের প্রয়োজনে আইন নয়। নিত্য-নতুন এইসব আইনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য শাসকদের সুরক্ষা ও দায়মুক্তি এবং জনমনে ভয়-আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাখা।

রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলিকে লক্ষ্য ও সক্ষমতা নিয়ে দাঁড়াতে না দিলে তার দলীয় মেরুকরণ ঘটে। প্রতিষ্ঠানগুলি সংবিধান ও আইনের প্রতি নিবিষ্ট না থেকে ক্ষমতাসীন দল বা ক্ষমতাবানদের প্রতি পক্ষপাত শুরু করে। ফলে ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা দল সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে। এজন্যই আইন প্রয়োগে সৃষ্ট বৈষম্যের মূল ভুক্তভোগী জনগন বিচারহীনতায় ধুঁকতে থাকে এবং এর মধ্য দিয়ে যে প্রবণতাটি স্থায়ী হতে শুরু করে, তা হচ্ছে আইনকে কর্তৃত্ব ও শাসনের মধ্যে নিয়ে আসা এবং যথেচ্ছ ব্যবহার করা।

শুধু সরকার সমর্থক নয়, যারা আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় বলিয়ান তারাও আইনের সুবিধাগুলোকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাচ্ছেন। বহুকাল ধরে চলে আসা এ কালচার এখন আরো ব্যাপকতর। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোট ছাড়া নির্বাচিত ১৫৩ জন এবং প্রায় ভোটারবিহীন ১৪৭ জন সরকার গঠন করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শক্তি প্রয়োগের নীতিতে চলছেন। যে কারনে আগেই অপরাধী সাব্যস্ত করে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ এবং গুম-খুনের মাধ্যমে বিচারকাজ সম্পন্ন করে ফেলায় উৎসাহ যোগানো হচ্ছে।

ক্ষমতা কাঠামোর সমর্থক বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, সাংবাদিক সবার পক্ষ থেকে এরকম ইঙ্গিত আসছে যে, উন্নয়ন চাইলে, উন্নয়নের সকল সূচকে অর্জন চাইলে, প্রবৃদ্ধির হার উর্ধ্বগামী চাইলে- এরকম কর্তৃত্ববাদ মেনে নেয়া ভাল। এজন্যই শক্তি প্রয়োগের নীতিকে মান্য করার আদর্শিক পরামর্শ রাখ-ঢাক ছাড়াই দেয়া হচ্ছে। মনোভঙ্গিটি এরকম যে, সিঙ্গাপুরের স্বৈরশাসকের মত একাধিক্রমে চালাচ্ছেন বলে দেশ কথিত উন্নয়ন বন্যায় ভাসছে। সুতরাং উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়ানোর জন্য গণতন্ত্র সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত তো করাই উচিত!

আপাতত: দেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন চেহারায় একধরনের জৌলুষ, চাকচিক্য রয়েছে। শহর-নগর, গ্রাম-গঞ্জে এই চেহারার মালিন্য কম, কিন্তু খোলসটা সরে গেলেই ক্ষমতার রাজনীতি ও উন্নয়ন চেহারায় আসল রূপটি ফুটে উঠছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতি, টক শো’র শব্দগুলো ঘাঁটলে বোঝা যাবে দিনকে দিন কোথায় নামছে এই দেশ। হালে বিএনপি সুর খানিকটা নরম করলেও চড়াও ক্ষমতাসীনরা। বিএনপি এতটাই নরম যে, একটি মিছিল করতে হলেও পুলিশের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। নাশকতার অভিযোগে অনুমতি না দিলে কিচ্ছুটি যেন করার নেই। আইনের শাসন এভাবেই দলঘনিষ্ট হয়ে পড়েছে।

উন্নয়ন মিথ প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাষ্ট্র-সমাজে দলীয় কর্তৃত্বপরায়নতা মূলধারায় নিয়ে আসা হয়েছে। গণতান্ত্রিক আবহ দুরে থাক, যে কোন নির্বাচনে জয়ের বিষয়টি একক ও প্রতিদ্বন্দ্বীতহীন  করতে সব কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল ট্রেন্ড হচ্ছে, নির্বাচনে জয়ের জন্য ভোটের খুব একটা প্রয়োজন নেই। ভোটে জিততে শুধু প্রয়োজন ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন। সবশেষ অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচন এর একটি প্রমান যে, সংবিধানের মূল স্পিরিট উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে ক্ষমতাবানরা এখন আর ভোট নির্ভর নন।

এই কাঠামোর অনুপস্থিতি যে দায়মুক্তির অপশাসনের সংস্কৃতিকে বেগবান করছে, তা জনগনের সামাজিক কণ্ঠস্বরকে ক্ষীণ করে দিয়েছে। ফলে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন নেমে আসার পরেও সামাজিক প্রতিবাদের শক্তিশালী ধারাটি ছিল অনুপস্থিত। রাষ্ট্র-সমাজের যে পক্ষটি ক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে সুবিধাপ্রাপ্ত, সেই কথিত বিবেকবানরাও সাম্প্রদায়িকতা সংঘাত ও বিপর্যয়ে উচ্চকিত নন। এর ফলে ধামাচাপা দেয়ার অপসংস্কৃতি উৎসাহিত হয়েছে, যেমনটি ঘটেছে অতীত অনেক অপরাধের ক্ষেত্রে। দেশের নির্বাচন কাঠামোয় এই পরিবর্তন শুধু পদ্ধতিকে বিপন্ন করেনি, সুশাসনের সকল সম্ভাবনাকে তিরোহিত করেছে।

পরিস্থিতি সংখ্যালঘু জনগনের তো বটেই, সংখ্যাগুরুদেরও সাংবিধানিক অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অনুৎসাহিত করছে। গেল বছরের শেষার্ধে গোবিন্দগঞ্জ থেকে নাসিরনগরে যা ঘটেছে, তা সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং প্রশাসনিক সুশাসনেরও পরিপন্থী। এই বৈপরীত্য ঠেলে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠিকে সুরক্ষা দিতে হলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রকে ন্যায্যতার পথে হাটাতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে- শাসনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের কাছে এর গুরুত্ব হারিয়ে গেছে। এজন্য গণতন্ত্র চর্চার অন্তত: একটি উপায় পাঁচ বছর পরে গণ-মতামত প্রকাশের সুযোগও সীমিত করে দেয়া হয়েছে।