Home » আন্তর্জাতিক » অভ্যন্তরীন প্রতিরোধের মুখে ট্রাম্প : বিশ্বজুরে উদ্বেগ

অভ্যন্তরীন প্রতিরোধের মুখে ট্রাম্প : বিশ্বজুরে উদ্বেগ

সি রাজা মোহন ::

আমেরিকান জাতীয়তাবাদের প্রতি জোরালো আবেদন জানিয়ে এবং ‘আমেরিকা প্রথম’ ধ্বনি দিয়ে আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন, উম্মুক্ত সীমান্ত এবং বিপুল আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি আমেরিকার দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান প্রতিশ্রুতির অবসানের ঘোষণা দিলেন।

ট্রাম্পের আমেরিকা গুটিয়ে নেয়ায় এবং বিশ্বে তার ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করার প্রেক্ষাপটে ভারতকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার বর্তমান অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার অনেক নেতিবাচক পরিণতি সীমিত করতে হবে। একই সাথে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ওয়াশিংটনের সাথে কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সুযোগগুলো ভারতকে অবশ্যই লুফে নিতে হবে।

আমেরিকার সংরক্ষণবাদের দিকে ঝুঁকে পড়াটা নিশ্চিত করে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা অবশ্যই আমাদের চাকরিগুলো ফিরিয়ে আনবো। আমরা অবশ্যই আমাদের সীমান্তগুলো ফিরিয়ে আনবো।’ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ নিয়ে নাটকীয় অবস্থান প্রকাশ করে ট্রাম্প আবারো জোর দিয়ে বলেছেন, পৃথিবী-পৃষ্ঠ থেকে ‘চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসকে’ মুছে ফেলার জন্য রাশিয়া এবং অন্যান্য সভ্য দেশের সাথে তিনি কাজ করবেন।

ট্রাম্পের কাছ থেকে আসা এসবের থিমের কোনোটিই অবাক করা কিছু নয়। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারকালে ট্রাম্প এসব ইস্যুর কথা বারবার বলেছেন। ট্রাম্পের অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ওয়াশিংটনে প্রবল ও স্থায়ী বিরোধের মুখে অনেকেই আশা করেছিলেন, ট্রাম্প তার অবস্থান পরিশীলিত ও সংশোধন করবেন। কিন্তু পেছনে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নেয়া আমেরিকার অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিক্রমণ পরিবর্তন করার উচ্চাভিলাষী ধারা গঠনে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।

আমেরিকার ব্যাপারে ট্রাম্পের নতুন ভিশন ভারতে রাজনৈতিক এবং সেই সাথে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন করে গুরুতর চিন্তাভাবনা করার অবকাশ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় এলিটরা অন্য জাতিগুলোকে দমন করার জন্য বিশ্বায়নকে ব্যবহার করা কিংবা গণতন্ত্রের মতো রাজনৈতিক মূল্যবোধ প্রচারের নামে হস্তক্ষেপ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করছিল। তাদেরকে এখন এই দু’টির কোনোটিই না থাকা ট্রাম্পের সাথে কাজ করতে হবে।

ট্রাম্প তীব্রভাবে বিশ্বায়ন এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থায় আমেরিকার দীর্ঘদিনের লালিত নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা বিদেশি শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি, অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীকে ভর্তুকি দিয়েছি, অথচ আমাদের সামরিক বাহিনীর দু:খজনক শূন্য হওয়াকে অনুমোদন করেছি। আমরা অন্য জাতির সীমান্তকে রক্ষা করেছি, কিন্তু আমাদের নিজেদের সীমান্তকে রক্ষা করতে অস্বীকার করেছি।’

তার এই নতুন ভিশন বিশ্বজুড়ে অনেক দেশের শাসকদের মেরুদন্ডে  শীতল অনুভূতি প্রবাহিত হয়েছে। তিনি ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে ‘বাণিজ্য, কর, অভিবাসন, পররাষ্ট্র ইত্যাদি প্রশ্নে প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে আমেরিকান শ্রমিকদের কল্যাণের দিকটি লক্ষ রেখে। আমাদের সীমান্তকে অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে, অন্যান্য দেশ যাতে আমাদের পণ্য বানিয়ে লুটপাট করতে না পারে, আমাদের কোম্পানি চুরি করতে না পারে, আমাদের চাকরি ধ্বংস করতে না পারে।’

ট্রাম্প নতুন আমেরিকার জন্য দু’টি সরল নিয়মকে চিহ্নিত করেছেন: ‘আমেরিকান ক্রয় করো, আমেরিকান ভাড়া করো।’

ভারতকে কেবল আরো সংরক্ষণবাদী আমেরিকার জন্যই প্রস্তুতি নিলে চলবে না, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রচারের নামে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য দেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা, রক্তপাত ঝরানো ও সম্পদ লুণ্ঠনের পরিকল্পনা না করার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে হবে। ‘আমরা আর আমাদের জীবন ধারা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেব না, বরং একে একটি উদাহরণ হিসেবে উজ্জ্বল হতে দেব।’

নির্বাচনী প্রচারণার সময় এবং তারপর থেকে ট্রাম্প ন্যাটোর মতো আমেরিকার পুরনো জোটগুলোকে ছুঁড়ে ফেলেছেন। ক্ষমতা নেবার রাতে তিনি বলেছেন, ‘আমরা পুরনো মিত্রদের শক্তি বাড়াবো, নতুন নতুন জোট গড়বো, চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সভ্য দুনিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করবো। এসবের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবো।’ এটা নজিরবিহীন একটি প্রক্রিয়া। এতে বিশ্বজুড়ে বন্ধু ও অংশীদারদের প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

ট্রাম্প এখানে নিজেকে ‘মুক্ত বিশ্বের’ কিংবা ‘পাশ্চাত্যের’ নেতা হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করেননি। এর বদলে তিনি ‘সভ্য দুনিয়াকে’ ঐক্যবদ্ধ করার কথা বলেছেন, যাতে সুস্পষ্টভাবে রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ট্রাম্প সব সময় জোর দিয়ে বলে আসছেন, আইএসআইএস এবং অন্যান্য চরমপন্থী গ্রুপের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া হতে পারে অংশীদার।

আট বছর ধরে ওবামা ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ’ পরিভাষাটি ব্যবহার করছেন না। তিনি পছন্দ করছিলেন ‘সহিংস চরমপন্থী’ পরিভাষাটি। পরিভাষাগত এই একটি পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকি এবং তা দমন করার জন্য অংশীদারদের প্রকৃতির ব্যাপারে ট্রাম্পের আমেরিকার ভাবনায় নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনাটি ফুটিয়ে তুলেছে।

যেকোনো মানদন্ডেই  ট্রাম্পের দেয়া ভাষণ যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বে এর ভূমিকা নিয়ে আমেরিকান এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান বিশ্বাসের সাহসী ও দ্ব্যর্থহীন প্রকাশ ঘটিয়েছে। বিশ্বায়নের ব্যয়, উন্মুক্ত সীমান্ত এবং হস্তক্ষেপমুখী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তার প্রশ্ন উত্থাপনে বিপুলসংখ্যক ভোটারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে।

ক্ষীণ সম্ভাবনাও আছে যে, ট্রাম্প হয়তো আমেরিকার আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা নতুন করে গড়ে নিতে পারবেন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নতুন করে সংগঠিত করতে পারবেন। অবাধ বাণিজ্য সীমিতকরণ, আমেরিকার অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং আরো সংযত পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হাসিল প্রশ্নে দ্বিদলীয় জোট গঠনের অবকাশ নিশ্চিতভাবেই তার আছে।

তবে নিশ্চিতভাবেই ট্রাম্পের ভিশন এস্টাবলিশমেন্টের কাছ থেকে ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়বে। কিন্তু তারপর আমেরিকার জনগণের জন্য ফলপ্রসূ কাজ করার জন্য এস্টাবলিশমেন্টের সাথে লড়াই করার জন্য নিজেকে একজন বহিরাগত হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। এর ফলে আগামী চার বছরে আমেরিকার ভবিষ্যৎ অভিমুখের জন্য প্রচন্ড রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ তৈরি হবে।

বহিরাগতদের জন্য ট্রাম্পের আমেরিকাকে বোঝার জন্য সম্ভবত একটিমাত্র পথনির্দেশনা রয়েছে: ভবিষ্যতের জন্য অতীত ভালো গাইড নয়।

(লেখক : পরিচালক, কার্নেগি ভারত এবং দি ইন্ডয়িান এক্সপ্রেস পত্রিকার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সম্পাদক)