Home » বিশেষ নিবন্ধ » এরশাদ থেকে নুর হোসেন : গডফাদাররা কখনই ধরা পরেনা

এরশাদ থেকে নুর হোসেন : গডফাদাররা কখনই ধরা পরেনা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. খুলনার সিরিয়াল কিলার এরশাদ শিকদারের নাম মনে আছে তো! ঘাটের কুলি থেকে সিটি কাউন্সিলর, দোর্দন্ড প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ এরশাদ শিকদার। অবশেষে ক্ষমতাধররা রুষ্ট হলে আইন তার নাগাল পেয়ে যায়; বিচারে তার ফাঁসি হয়েছিল। কারা এরশাদ শিকদারকে সৃষ্টি করেছিল এবং তার গডফাদারই কে বা কারা, আইন তার নাগাল পায়নি। বলা হয়, আইনের হাত অনেক লম্বা, কিন্তু আইনের শাসনহীনতার এই দেশে ক্ষমতাসীনরা আইনকে শাসন করেন কিংবা নিয়ন্ত্রন করে থাকেন। এ কারনেই অপরাধ সংঘটনের নেপথ্য ব্যক্তিরা থাকেন নিরাপদ, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

সম্প্রতি নারায়নগঞ্জে সাত খুনের মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নুর হোসেনের সাথে এরশাদ শিকদারের প্রোফাইল চমৎকারভাবে মিলে যায়। ট্রাকের হেলপার থেকে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, জাতীয় পার্টির নেতা। পরবর্তীতে বিএনপি হয়ে আওয়ামী লীগে। দল পাল্টানোর সাথে সাথে তার গডফাদারও পাল্টে গেছে। সকলে জানে, তার সবশেষ গডফাদার কে?  নুর হোসেনের ভাষায়, “তিনি আমার বাপ লাগেন”।

সামরিক শাসন বা কথিত গণতান্ত্রিক শাসনে এই রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায় প্রতিটি জেলা-উপজেলায়, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে এখন শত শত এরশাদ শিকদার বা নুর হোসেনরা সদম্ভ বিচরনরত। একদা অজ্ঞাত-অখ্যাত, লেখাপড়াবিহীন এসব মানুষ কোটি কোটি টাকার মালিক। নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনীতির হাত ধরে ইউপি, উপজেলা, জেলা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য এমনকি মন্ত্রীও হয়ে যাচ্ছেন। এদের প্রত্যেকের এক বা একাধিক গডফাদার থাকে – যারা ক্ষমতাসীন দলের নেতা বা অত্যন্ত প্রভাবশালী আমলাও হতে পারেন। এই সন্ত্রাসী ও টাউট শ্রেনী দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির নেয়ামক হয়ে উঠেছে।

দুই. এই দেশের সাধারন মানুষ কত অল্পেই না সন্তুষ্ট! একটি মামলার বিচারেই তারা অনেক খুশি। এর অন্যতম কারন হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার বিপরীতে এটি পরম প্রাপ্তি। আরো বড় মেসেজ, অপরাধী যেই হোক, শাস্তি হতে পারে। আরো বড় প্রাপ্তি, র‌্যাবের মত দায়মুক্ত একটি এলিট ফোর্সের ১৬ সদস্যর মৃত্যুদন্ড। এককালের রক্ষীবাহিনীর মত এই বাহিনীর জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা সংঘটনে অভিযোগের আঙুল তাদের দিকে। এরকম একটি বাহিনীর সদস্যদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যাপারে দেশে তো বটেই আন্তর্জাতিক মহলগুলিও সচকিত। দেশের পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রোনিক মিডিয়াগুলির রিপোর্ট, সম্পাদকীয়, টক শো-সব জায়গায় দাবি করা হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলাম।

দায়িত্ব গ্রহনের দু’বছর পূর্তিতে আমরা প্রধান বিচারপতির এমত বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারি যে, ‘অপরাধী যত বড় হোক দায়মুক্তি পাবে না’। তার সোজা-সাপ্টা কথায় জানতে পারি, সুপ্রীম কোর্টের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপের ফলে নারায়নগঞ্জে সাত হত্যা মামলার দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। মনে পড়ছে, অভিযুক্ত তিন সামরিক অফিসারকে গ্রেফতার করতে কালক্ষেপন ছিল লক্ষ্যণীয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসন গ্রেফতারে বাধ্য হয়েছিল। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি অতিরিক্ত এর্টনী জেনারেল শক্ত সওয়াল কেন করতে পারলেন না, সেজন্য তাকে চাকরি হারাতে হয়েছিল। এই রিটে ড. কামাল হোসেন কেন ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়িয়ে র‌্যাবের কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের নির্দেশনা আনলেন, সেজন্য সরকার প্রধান সে সেময় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।

এজন্যই আম-জনতা একধরনের বৈপরীত্য অনুভব করেন। মানুষ প্রধান অপরাধের দায়মুক্তিতে বিশ্বাস করে না। অথচ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এমপি, যিনি একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং স্বৈরাচারী হিসেবে গণ আন্দোলনে পতিত, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলার আসামী। এরশাদের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে আছে কেন? রায় দেয়ার তারিখ নির্ধারনের পরেও বিচারক বদল হয় কেন? একটি হত্যা মামলায় এতবার বিচারক বদলের পরেও জনসাধারন কি আশ্বস্ত থাকবে, অপরাধী যত বড় হোক দায়মুক্তি পাবে না?

আমি অপটিমিষ্টিক মানুষ হলেও এতটা নই, হয়তো এ কারনে যে, অসংখ্য খুন, গুম, ধর্ষণের ঘটনায় বিচার ঝুলে আছে, কোন কোন ক্ষেত্রে অনন্তকাল ধরে। হিমাগারে চলে গেছে অনেক মামলার ভাগ্য। শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, দায়মুক্তি, তদন্ত অনুসন্ধানে পক্ষপাত বা গাফিলতি এবং আইনের ফাঁক-ফোঁকড়ের সুবিধে নিয়ে কত যে খুনি-অপরাধী পার পেয়ে গেছে কিংবা যাচ্ছে, তার হিসেব কে রাখে! এমনকি ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত খুনিরা সরকারের পরামর্শ বা সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্ত হয়ে গেছে।

তিন. নারায়নগঞ্জের সাতখুন মামলার বিচারে স্পষ্ট যারা এই অপহরণ, খুন ও লাশ গুমের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে প্রমানিত হয়েছে আদালত তাদের মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। অপরাধ সংঘটনে সহযোগিরাও নানা মেয়াদে দন্ডাদেশ পেয়েছে। স্বস্তি পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল। এই মামলার প্রধান আসামী নুর হোসেন, যিনি কিছুকাল আগের প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ ও কোটিপতি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সম্মানিত সভাপতি ও সিটি কাউন্সিলর, তার শাস্তি নিশ্চিত হওযায় ইমেজ ফিরিয়ে আনতে এটি ভালভাবে ব্যবহার করা যাবে। তারা আরও সন্তুষ্ট এটা ভেবে যে, এই মামলার পুলিশী তদন্তকালে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে না আসাও নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন।

কাশিমপুর জেলের কনডেম সেলে বসে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নুর হোসেন এখন নিশ্চয়ই স্লো-মোশন মুভির মত অতীত দেখতে পাচ্ছেন। তবে এখনও ক্ষীণ আশা নিশ্চয়ই করছেন, হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্টের আপিল-রিভিউ আর সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষা পর্যন্ত তো থাকছেই! হয়তো তার আফসোস হচ্ছে গডফাদারকে নিয়ে। তদন্তকালে গডফাদারের মুখোশ খুলে দেবার সুযোগ যে তাকে দেয়া হয়নি। ভারত থেকে ফেরত আনার পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনও মনে করেনি পুলিশ। জানে সে, এরকম সব সম্ভাবনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এজন্য একটি প্রশ্ন  ঘুরে-ফিরে আসতেই থাকবে- সাত খুনের মাষ্টারমাইন্ড নুর হোসেন, নাকি ধরাছোঁয়ার বাইরের কেউ?  আইন কি তার  নাগাল পেয়েছে?

পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবরে জানতে বা মনে করতে পারি, সাত খুনের ঘটনার দুইদিন পর ২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে এমপি শামীম ওসমানকে ফোন করেন নুর হোসেন। সেই ফোনের রেকর্ড রয়েছে পুলিশের হাতে। তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে পত্রিকা জানায়, শামীম ওসমানকে ফোন করেছিল নুর হোসেন।

শামীম বলেছিলেন, ‘খবরটা পৌছাই দিছিলাম, পাইছিলা’? নুরঃ ‘পাইছি ভাই’। শামীমঃ ‘তুমি অতো চিন্তা কোরনা’। নুর হোসেন কান্নাজড়িত কন্ঠে, ‘ভাই আমি লেখাপড়া করি নাই। আমার অনেক ভুল আছে। আপনি আমার বাপ লাগেন, আপনারে আমি অনেক ভালবাসি, ভাই। আপনি আমারে একটু যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন’। শামীমঃ ‘এখন আর কোন সমস্যা হবে না’। ‘গৌর দা’ বলে এক লোকের সাথে নুর হোসেনকে দেখা করতে বলেন। কথোপকথনের এই পর্যায় শামীম ওসমান জানতে চান, কোন সিল (সম্ভবত: ভিসা) আছে কিনা? উত্তরে নুর হোসেন বলেন, ‘আছে, আছে, সিল আছে, কিন্তু যামু ক্যামনে? যেভাবে বলল এ্যালার্ট (রেড এ্যালার্ট)’। শামীম বলেন, তুমি আগাইতে থাকো। নুরঃ ‘ভাই তাহলে একটু খবর নেন, আমি আবার ফোন দেই’। এই পর্যায়ে শামীম ওসমান বলেন,‘তুমি কোন অপরাধ  করো নাই। আমি জানি, ঘটনা অন্য কেউ ঘটাইয়া এক ঢিলে দুই পাখি মারতেছে’।

মামলার সাথে সম্পর্কিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আলাপচারিতার ফোন রেকর্ড সাতখুন মামলার অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারতো। রহস্যময় কারনে তদন্তকারীরা এই সূত্রকে কোন গুরুত্বই দেননি। এরকম বক্তব্যের রেকর্ড পাওয়ার পরেও পুলিশের গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়টি এখন রহস্যই থেকে যাবে। এমনকি নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ না করার বিষয়টিও। এ বিষয়ে নারায়নগঞ্জের তৎকালীন এসপি মিডিয়াকে বলেছিলেন, নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন নেই!

চার. সাত খুনের ঘটনা ‘অর্গানাইজড ক্রাইমের’ মডেল ধরলে কতগুলি প্রশ্ন সামনে চলে আসবে। তদন্ত বা অনুসন্ধান পর্যায়ে সে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। অপহরণ এবং খুন হয়েছিলেন সাতজন। টার্গেট ছিল একজন-কাউন্সিলর নজরুল। হত্যা করিয়েছে নুর হোসেন। নজরুল-নুর হোসেন, দু’জনই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং তাদের গডফাদার একই ব্যক্তি। কথিত ছয় কোটি টাকা ও র‌্যাবের সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টিও কি পরিকল্পনার অংশ? এর সাথে পূর্বাপর বিষয়গুলো সামনে না আনার কারন কি এটাই ছিল যে, বেরিয়ে পড়বে মূল হোতার নাম-পরিচয়?

এই অপহরণ, হত্যার পেছনে সিদ্ধিরগঞ্জ-নারায়নগঞ্জের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ধারাবাহিক ইতিহাস এবং সন্ত্রাসের নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনায় আনা হয়নি। কারন সাত অপহরণ ও হত্যাকান্ডের ঘটনা গডফাদার ও তার পরিবারকে নতুন জীবন দান করেছে। নজরুল-নুর হোসেনের মত পথের কাঁটা বিদেয় করে দিয়ে গডফাদার ধুঁয়ে-মুছে জুনিয়র ক্যাডারদের মাধ্যমে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিয়েছে। সুতরাং ঘটনা পরিকল্পিত বা কাকতালীয় যাই হোক, একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

২০১৪ সালের আগষ্টে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বিশেষ একজন ব্যক্তি বলেছিলেন, নারায়নগঞ্জ কখনও অপরাধমুক্ত হবে না। কারন এখানে ফি-বছর শত শত কোটি টাকা চাঁদাবাজির মাধ্যমে আয় করা হয়। সরকার পাল্টালে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রনও পাল্টায়।  যেমন এখানকার বর্তমান গডফাদার ২০০১ সালে দলবলসহ দুবাই পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং ফিরে এসেছেন ২০০৯ সালের গোড়ায়। ওই সময়ে চারদলীয় জোটের নেতা ছিলেন গডফাদার। তার মতে, গডফাদারদের জন্য হুমকি হয়ে উঠলেই তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। সাতখুনেরও আয়োজন করা হয় ক্রমাগত হুমকি হয়ে ওঠা নজরুল, নুর হোসেনকে সরিয়ে দিতে। এর সাথে র‌্যাবকে যুক্ত করা হয় টাকার লোভ দেখিয়ে।

এ সব বিষয়গুলি নারায়নগঞ্জে তো বটেই, সারাদেশেও ওপেন সিক্রেট। ক্ষমতাসীন দল ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব বিষয় আমলে নিয়েছেন, এরকম দৃশ্যমানতা কোথাও নেই। সাতটি মানুষ খুন ও লাশ গুমের চেষ্টার ন্যায়বিচার হয়েছে। কিন্তু অপরাধের শেকড়শুদ্ধ উৎপাটনে তদন্ত ও অনুসন্ধান পর্যায়ে কোন আগ্রহ না থাকায় নারায়নগঞ্জের অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রকটি আড়ালেই থেকে গেছে। ফলে ন্যায়বিচারের যে প্রসারমানতা আরো বিস্তৃত হতে পারতো সেটি সম্ভাবনা হিসেবেই থেকে গেল।