Home » বিশেষ নিবন্ধ » রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস গুম-খুন আর অবরোধের ছবি – ‘আবলুকা’

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস গুম-খুন আর অবরোধের ছবি – ‘আবলুকা’

ফ্লোরা সরকার ::

একটা দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষেরা যত বেশি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হতে থাকে, রাষ্ট্র তত নির্বিঘ্নে শাসন ও শোষণ করার সুযোগ পেয়ে যায়। রাজনীতির কাজ শুধু নিজেদের সঙ্গে নিজেদের মোকাবিলা করা নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে মোকাবিলা করা। তাতে করে রাষ্ট্র থেকে শোষণের বদলে সুশাসন পাওয়া যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভেতর পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে বিচ্ছিন্নতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এবং এসব বিচ্ছিন্নতা যখন যারযার মতামতকে শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করতে থাকে, তখন সেটা একধরনের ‘মৌলবাদী’ রাজনীতির রূপ পরিগ্রহ করে। এই ধরণের মৌলবাদিতা এক ধরণের বদ্ধমূল ভ্রান্তিজনিত রোগের উদ্ভব ঘটায়- যা নিরাময় অযোগ্য হয়ে পড়ে। এসব রোগ যত বেশি বাড়তে এবং ছড়াতে থাকে, রাষ্ট্র সেই সুযোগে তত বেশি শোষণ করার সুযোগ পেতে থাকে। রাষ্ট্রের শোষণ যত বাড়তে থাকে এই রোগের প্রকোপ তত বাড়তে থাকে। গত আলোচনায় আমরা দেখেছি এমিন আলপার পরিচালিত “বিয়ন্ড দ্য হিল” ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নির্ভর এক ছবি, যেখানে দেখেছি নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস আর সন্দেহ কীভাবে অজানা শত্রুর উদ্ভব ঘটায়, তার পরবর্তী ছবি “আবলুকা” বা “ফ্রেনিজ’’  আমাদের তার থেকেও আরও ভয়াবহ চিত্র দেখায়, যা নাগরিকদের ভেতর ও  উপরে বর্ণিত বদ্ধমূল ভ্রান্তিজনিত রোগের উদ্ভব এবং বিস্তার ঘটায়। আজ আমরা এই ছবিটা নিয়ে আলোচনা করবো এবং বলাই বাহুল্য ২০১৫ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি স্পেশাল জুরি বিভাগে পুরষ্কৃত হয়।

মূল তুর্কি ভাষায় “আবলুকা” অর্থ অবরোধ। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক গোলযোগগুলো এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ মানুষ দেখতে পাচ্ছেনা। অনেকটা কাফকার “দ্য ক্যাসেল” উপন্যাসের সেই দূর্গের মতো, যেখানে কোনো এক অনির্ণেয় শক্তি, গল্পের নায়ক কে লক্ষ্য করে তাচ্ছিল্যের সাথে, কখনো মুচকি হেসে প্রশ্রয়ও দেয় তারপর তাকে মর্মান্তিক ভাবে আঘাত করে। যে পথ ধরেই গল্পের নায়ক যাত্রা করুক না কেনো, তাকে আবার সিসিফাসের মতো ঘুরে আসতে হয় আরম্ভে। সারাটা উপন্যাস আমাদের এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রাখে,  আবলুকা ছবির দ্বিতীয় অংশ ঠিক এভাবেই আমাদের শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় রাখে। আবলুকা ছবিটা তখন শুধু একটা দেশের ভেতরকার অবরোধ অবস্থা দেখিনা, তার সাথে মধ্যপ্রাচ্যসহ আরও অনেক দেশের অবরোধ দেখতে পাই, যে অবরোধ থেকে মানুষ অর্থাৎ সেসব দেশের নাগরিকেরা বের হয়ে আসতে পারছেনা।

ছবির মূল চরিত্র কাদের  (মোহাম্মদ ওজগুর) প্রায় বিশ বছর জেল খাটার পর, আরও দুই বছর বাকি থাকলেও প্যারলে মুক্তি পায়। ছবির শুরুতে জেল থেকে মুক্তি পাবার দৃশ্য আমরা দেখি। প্যারলে তাকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয়া হয়। কাদেরকে যে শর্তযুক্ত কাজটা দেয়া হয়, তা হলো শহরের আবর্জনা কুড়িয়ে তোলা। কিন্তু তার প্রকৃত কাজ হলো সরকারের হয়ে গোয়েন্দাগিরি বা নজরদারির কাজ করা। আবর্জনার ভেতর কোনো রাসায়নিক বস্তু পাওয়া যায় কিনা- যা বোমা তৈরি কাজে লাগে- সেসব তথ্যসহ তার আশেপাশে থাকা সন্দেহজনক মানুষগুলোর খবর সরকারকে জানাবার দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। যে কারণে তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে, প্রশিক্ষন শেষে, সে যখন বাসে করে তার ছোট ভাই আহমেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, পথের মাঝে চেকপোস্টে গাড়ি থামিয়ে বাসের যাত্রিদের আইডি কার্ডসহ সবকিছু তদন্ত করা দেখে কাদের বেশ অবাক হয়। কেননা, বিশ বছর আগে জেলে যাবার আগে সে শহরের এরকম চিত্র দেখে নাই। এটা যেন নতুন কোনো এক শহরে সে ঢুকছে, যে শহর সে কখনো দেখে নাই। যেখানে জায়গায় জায়গায় চেকিং হয়। আর চেকিং মানেই সন্দেহ, অবিশ্বাস, ভয় ইত্যাদি।

দুই ভাইয়ের মধ্যে দেখা না হবার এই দীর্ঘ বিরতি এবং সেই বিরতির পর প্রথম মিলনের দৃশ্যটা আমাদের অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়। কেননা, কাদের যতটা উত্তেজনা নিয়ে তার ভাইয়ের কাছে ছুটে যায়, যে ভাইয়ের বয়স এখন তিরিশের কাছাকছি, এতোদিন পর বড় ভাইকে দেখে আহমেদের ভেতর সেই উত্তেজনা আমরা দেখিনা। বরং এক ধরণের শীতলতা তার ভেতর দেখা যায়। রাতের খাবারের পর, দুই ভাইয়ের কথোপকথন আরও স্পষ্ট করে দেয়। কাদের যতটা আগ্রহ নিয়ে আহমেদকে উপদেশবানী শোনায়, আহমেদের ভেতর আগ্রহ দূরে থাক, খাওয়ার পরপরই উঠতে পারলে যেন সে বেঁচে যায়। দুই ভাই কাছাকাছি দুইবাড়িতে থাকে। কাদের থাকে আহমেদের বন্ধু আলী এবং তার বউ মেরালের বাড়ির উপর তলায়। আহমেদ থাকে কাছেই অন্য বাড়িতে। আহমেদের এই অনীহা কাদের বেশ ভালোভাবেই অনুভব করে এবং এক রাতে ভাইকে বলে, “এটা ভেবোনা যে তোমার কথা আমি ভাবতাম না। জেলে থাকতে প্রায়ই তোমার কথা আমার মনে পড়তো।…. মনে রেখো, আমরা দুজন ছাড়া, আমাদের কিন্তু আর কেউ নেই”। সংলাপটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসলে দুই ভাইয়ের কোনো শৈশব স্মৃতি নেই, যেসব স্মৃতি ভাইদের বন্ধন আরও দৃঢ় করে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝেও সেই বন্ধন থাকা চাই, যে বন্ধন নাগরিকদের বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে দৃঢ় করে। কিন্তু ছবিতে আমরা দেখি, দুই ভাইয়ের এই দীর্ঘদিনের দুরত্ব তাদের ভেতর এতোটাই দূরত্ব তৈরি করে ফেলে যে, কাছাকাছি আসা দূরে থাক বরং সন্দেহের পর্যায়ে নিয়ে যায়। যে কোনো দেশে রাজনৈতিক মতাদর্শিক দূরত্ব এভাবেই পারস্পরিক সন্দেহের বীজ বপন করে চলে। কাদের সন্দেহ করতে থাকে আলীর বউ মেরালের সঙ্গে আহমেদের কোনো অবৈধ সম্পর্ক হয়তো গড়ে উঠেছে কিনা। মাঝে মাঝে একারনেই কাদের দোতলার কাঠের মেঝেতে কান পেতে তাদের ফিসফাস শব্দগুলো শোনার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, কাদের মনে করে আলী এবং মেরাল হয়তো কোনো সন্ত্রাসী কাজে নিয়োজিত আছে। সেই কাজের সাথে তাই ভাইও সম্পৃক্ত থাকতে পারে।

অন্যদিকে, আহমেদ যে কাজ করে সেটা হলো, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কুকুরগুলো মেরে ফেলার কাজ। কাজটা তার একেবারেই ভালো লাগেনা কিন্তু বেঁচে থাকার তাগিদে তাকে করতে হয়। এই কাজে তার অনিচ্ছার চুড়ান্ত প্রকাশ একটা দৃশ্যের মাত্র একটা শটে পরিচালক আমাদের দেখিয়ে দেন। যে বন্দুক দিয়ে দিনের বেলায় সে কুকুর মারতে যায়, একদিন রাতে সেই বন্দুক দিয়ে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ট্রিগারে টিপ দেয়ার মুহূর্তে কাদের এবং আলী এসে পড়ায় তা আর সম্ভব হয়না। তবে নিজের হাতে আহত করা একটা কুকুরকে সে বাড়িতে নিয়ে আসে। যে কুকুরের পরিচর্যার মধ্যে দিয়ে সে যেন এক ধরণের প্রায়শ্চিত্ত পালন করে- যা একদিক থেকে আনন্দের এবং অন্য দিক থেকে তার একাকিত্ব কাটানোর কৌশলও বটে। আহমেদ একাই থাকে, কেননা, তার বউ এবং বাচ্চা তাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক আগেই।  এই কুকুর মারার বিষয়টা পরিচালক অত্যন্ত কৌশলে অন্যকিছুর ইঙ্গিত আমাদের দিয়ে দেন; হতে পারে সেটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নির্মূলের কাজ অথব খুন-গুমের কাহিনী। রাষ্ট্র এভাবেই তার অপছন্দের মানুষগুলোকে গুম করে দেয়।

ছবির গতি যত এগিয়ে যায়, শহরে পুলিশ টহলের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এবং বাড়তে বাড়তে সেটা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যে দুই ভাই দুইভাবে নিজেদের আড়াল করতে থাকে। একদিকে, আহমেদ মনে করতে থাকে তার বাড়িতে কুকুর আছে জানতে পারলে কর্তৃপক্ষ তাকে মেরে ফেলতে পারে, তাই ঘরের ভেতরেই সে আরেকটা ঘর বানায়, যাতে কুকুরের শব্দ বাইরে না পৌঁছায়। অন্যদিকে, কাদের নিরাপত্তাহীনতার উপর রিপোর্টের পর রিপোর্ট টাইপ করতে থাকে কর্তৃপক্ষকে দেয়ার জন্য, যেসব রিপোর্ট কোনো মূল্যই পায়না তার বসের কাছে। সারা দেশের অশান্ত চিত্র মেটাফরিক্যালি আরও চমৎকার করে পরিচালক দেখান। পুরো ছবি জুড়ে টিভির খবরে শুধু সন্ত্রাসী কর্মকান্ড আমরা দেখি। এমনকি রাতের রাস্তাগুলোও যেন একেকটা ধ্বংসস্তুপ, এখানে সেখানে শুধু আগুন জ্বলতে দেখা যায়, বোমা ফাটতে শোনা যায়। দীর্ঘ বেলের শব্দ, ঘন ঘন ট্যাং আওয়াজের যাতায়াত, গাড়ির শব্দে দালান কেঁপে কেঁপে ওঠা, তীব্র আলো ইত্যাদি সব মিলিয়ে এমন এক আবহ ছবির গতির সাথে বাড়তে থাকে যে, শুধু চরিত্রগুলোই না, দর্শকের ভেতরেও এক ধরণের শ্বাসরোধকের মতো অবস্থা হয়, যে অবরোধ অবস্থা থেকে সবাই পরিত্রান পেতে চায়। যদিও সেই পরিত্রান শেষ পর্যন্ত দুই ভাইয়ের মৃত্যু দিয়ে (রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষই তাদের মেরে ফেলে) শেষ হয়। ছবিটি তাই দেখতে দেখতে দর্শক নিজেদের কথা ভাবতে থাকে এবং ছবিটি আর তুর্কি কোনো ছবি হয়ে থাকেনা, সেটা হয়ে দাঁড়ায় বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য এবং তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের ছবি।