Home » প্রচ্ছদ কথা » সুন্দরবন বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ

সুন্দরবন বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ

আনু মুহাম্মদ ::

সুন্দরবন নিয়ে সরকারের স্ববিরোধী ভূমিকা বরাবরই প্রকট। প্রধানমন্ত্রী একদিকে আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলনসহ বিভিন্ন উপলক্ষে সুন্দরবন বাঁচানোর কথা বলেন, অন্যদিকে তাঁর সরকার দেশি বিদেশি মুনাফাখোরদের স্বার্থে সুন্দরবনধ্বংসী নানা তৎপরতায় সক্রিয় থাকে। সুন্দরবনের সুরক্ষার জন্য আমরা সরকারের কাছে বার বার দাবী জানিয়েছি ক্ষতিকর সব পরিবহণ এবং প্রকল্প বন্ধ করতে। কিন্তু সরকার সুন্দরবনের গুরুত্ব সম্পর্কে নির্লিপ্ত থেকে তার সুরক্ষার পরিবর্তে নিকটবর্তী নৌ-পথে বৃহৎ নৌ-পরিবহণের অনুমতি দিয়েছে, বিশাল কয়লা পরিবহণের উপর নির্ভরশীল একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ করছে, নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ভূমি দস্যুদেরকে জমি দখলের সুযোগ করে দিয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে সরকারি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের আরও বনজমি দখলের তৎপরতা এখন জোরদার। বিশ্বব্যাংক ও ইউএসএইডের তহবিলেও তৈরি হচ্ছে নানা প্রকল্প।

সরকারের এসব  ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ইতিমধ্যে ইউনেস্কো এবং রামসার সুন্দরবন ঘিরে একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মুনাফামুখি তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নরওয়ে সুন্দরবন ধ্বংসের এই প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলে ভারতের এনটিপিসিতে অর্থযোগান বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থ যোগান না দেবার ঘোষণা দিয়েছে। দেশে সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে নানা প্রতিবাদী কর্মসূচি অব্যাহত আছে।

কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেছেন, ‘সুন্দরবন নিয়ে আন্দোলনকারিরা কেবলমাত্র ভারতের কারণেই এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতা করছে।’ খুবই ভুল কথা। আমরা বার বার বলেছি, যেসব প্রকল্প সুন্দরবনের জন্য ধ্বংসকারি তা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এমনকি যদি বাংলাদেশের কোন কোম্পানিরও হয় আমরা তার প্রবল বিরোধী। তিনি আরও বলেছেন ‘আন্দোলনকারিরা মানুষকে রক্ষা না করে কেবল পশু-পাখি  রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছে।’ যে কোন সুস্থ মানুষই জানেন যে, সুন্দরবন শুধু যে অমূল্য অনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ তাই নয়, এটি রক্ষার সাথে কোটি কোটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা  জড়িত। প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করে। সুন্দরবন না থাকলে বাংলাদেশই অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে যে সুন্দরবন রক্ষা করে, এবং অসাধারণ জীববৈচিত্রের আধার হিসেবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে- সেই সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে এই প্রকল্প। বিভিন্ন প্রকাশনা, গবেষণার মধ্য দিয়ে বিশেষজ্ঞরা  কেনো এই কেন্দ্র বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী, সুন্দরবন ও মানববিধ্বংসী, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্য যুক্তিসহ তুলে ধরেছেন।  এটাও দেখানো হয়েছে যে, ভারতীয় কোম্পানি (এনটিপিসি) নিজদেশের আইন ভঙ্গ করে বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা এই প্রকল্পে চালকশক্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে।

কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র  মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২৫ কিমি এর মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়না। ভারতীয় কোম্পানী বাংলাদেশে সুন্দরবনের ৯-১৪ কিমির মধ্যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে। বাফার জোন বিবেচনা করলে এই দূরত্ব ৪ কিমি। অথচ ভারতেরই ‘ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান অ্যাক্ট ১৯৭২’ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে এবং ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ গাইড লাইন ম্যানুয়াল ২০১০ অনুযায়ী, কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৫ কিমি এর মধ্যে কোন বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জৈব বৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল,  জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্যকোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা অনুমোদন করা হয় না। ভারতীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ‘তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত গাইডলাইন, ১৯৮৭‘ অনুসারেও কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিমি এর মধ্যে কোন কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ স্থাপন করা যায় না। এজন্য গত কয়েকবছরে ভারতের কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ ও তামিলনাড়–তে তিনটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসিকে বাংলাদেশে সুন্দরবনের যতো কাছে পরিবেশ ধ্বংস কারী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে, তার নিজ দেশ ভারতে হলে সেখানকার আইন অনুযায়ী তা তারা করতে পারতো না!

এই ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বলা হচ্ছে যে, এই প্রকল্পে সুপারক্রিটিকাল টেকনলজি ব্যবহার করা হবে, সেজন্য সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। আমাদের প্রশ্ন- প্রথমত, এই প্রযুক্তিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ ক্ষতি কম হয় ঠিক, কিন্তু তাতে সুন্দরবনের ধ্বংসের সামগ্রিক  ক্ষতি কীভাবে কমবে? দ্বিতীয়ত, এই প্রযুক্তি যদি সুন্দরবন ধ্বংস ঠেকানোর মতো এতো নিশ্চিত প্রযুক্তি হয়, তাহলে ভারতীয় কোম্পানি কেনো ভারতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সকল ক্ষতি দূরীভূত করে না? কেনো গত তিন বছরে তাদের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল হয়? তৃতীয়ত, একদিকে বলা হচ্ছে, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব বিষাক্ত ফ্লাই এ্যাশ সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহৃত হবে। আর সারাদেশে সকল সিমেন্ট কারখানা বিজ্ঞাপন দেয়- তাদের সিমেন্টে ফ্লাই এ্যাশ ব্যবহার করা হয় না। এই ধরনের প্রতারণা কেনো?

এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সরকারি ‘উন্নয়ন’ নীতির কারণে সুন্দরবনের ‘ইকলজিকালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ বলে স্বীকৃত অঞ্চলেও শতাধিক বনগ্রাসী-ভূমিগ্রাসী বাণিজ্যিক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটক অবিশ্বাস্য উদ্যোগ নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে ৮টি টাওয়ার বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বিষাক্ত পণ্যবাহী জাহাজ পরিবহণ এখনও অব্যাহত আছে। গত ১৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদীতে আবারো একটি ১ হাজার টন কয়লাবাহী জাহাজ ডুবে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এর আগে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে তেল, কয়লাসহ বিষাক্ত পণ্যবাহী ৩টি জাহাজ  পশুর এবং শ্যালা নদীতে ডুবেছিল। এর পরিণতিতে দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের বিপর্যয় সম্পর্কে হুশিয়ারি দিয়েছেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা। এইসব জাহাজ ডুবির পর, প্রতিটি ক্ষেত্রে, সরকারের ভূমিকা ছিল ন্যাক্কারজনক। এবারের ডুবে যাওয়া কয়লাবাহী জাহাজে কয়লার পরিমাণ ছিলো আগেরগুলির তুলনায় দ্বিগুণ। সরকারের ভূমিকার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বন বাঁচানোর জন্য সাধারণ ধর্মঘট বা হরতালের পূর্ব দৃষ্টান্ত আছে কিনা জানিনা তবে ২৬ জানুয়ারি জাতীয় কমিটি আহুত হরতাল করে এই ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষই তৈরি করছে। সেখানে পুলিশের বর্বর নিযাতন ও হামলা হয়েছে। কিন্তু তাতে প্রতিরোধের চেতনাকে টলানো যায়নি। কারণ এই আন্দোলনের সৈনিকদের কাছে এই সহজ সত্যটি এখন খুব স্পষ্ট যে, সুন্দরবনের যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি সুন্দরবন রক্ষার লড়াইয়ে বিজয়ী হবারও কোনো বিকল্প নেই। তাই ৮ ঘন্টা ধরে পুলিশের লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস, জলকামানের অবিরাম আক্রমণ মোকাবিলা করে, নিজের শরীরে জখম নিয়ে তারা জায়গা ধরে রেখেছে, বাংলাদেশ ধরে রেখেছে। এগুলোতে শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ঠিকই কিন্তু অপ্রতিরোধ্য চেতনা বহুগুণ হয়ে আরও অসংখ্য মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। শুধু শাহবাগ নয় ঢাকার হরতালে বিভিন্ন মিছিলে ও দেশের নানাস্থানে সভা সমাবেশে হামলা-হুমকি-ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়েছে। একদিকে ভয় দেখিয়ে ভাড়া করে রামপালপন্থী মানববন্ধন সাজিয়ে তা প্রচার করা হয়েছে, অন্যদিকে খুলনায় সুন্দরবন রক্ষার সমাবেশে পুলিশ হামলা করেছে, বন্দুক তুলে শাসিয়েছে। কিন্তু সবজায়গাতেই শ্লোগান আরও জোরদার হয়েছে ‘রামপাল চুক্তি ছুঁড়ে ফেল,  বাংলাদেশ রক্ষা কর’। কেননা সুন্দরবন বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ।