Home » আন্তর্জাতিক » ট্রাম্পের অভিবাসননীতি : ঝুকি-শংকায় লক্ষ কোটি মানুষ

ট্রাম্পের অভিবাসননীতি : ঝুকি-শংকায় লক্ষ কোটি মানুষ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর বিশ্লেষন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে যেসব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, তা ফলতে শুরু করে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সেগুলো বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে তিনি যে আদেশ জারি করেছেন, তা ভয়ঙ্কর পরিণতি বয়ে আনতে পারে। তিনি যেন কারেন-জাল দিয়ে সবাইকে আটকিয়ে বহিষ্কার করতে চান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৫ জানুয়ারি অভিবাসন ও সীমান্তনীতি নিয়ে যে দুটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন তাতে কোটি কোটি অভিবাসী ও আমেরিকান নাগরিক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

আদেশ দুটিতে অভিবাসন বাধ্যবাধকতা ব্যাপক পরিসরে কার্যকর করার কথা বলায় কোটি কোটি অবৈধ নাগরিক, এমনকি যাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ নেই, তাদের ওপরও প্রযোজ্য হবে। আদেশ দুটিতে অভিবাসীদের তথাকথিত ‘আশ্রয় প্রদানকারী নগরী’ এবং রাজ্যগুলোকে শাস্তি প্রদান, অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে শাস্তিমূলক বহিষ্কার-প্রক্রিয়া অবলম্বন এবং আটক রাখার মেয়াদ আরো বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আদেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে ইচ্ছুকদের প্রবেশে বাধাদানের জন্য কড়াকড়িভাবে সীমান্তনীতি কার্যকর করতে বলা হয়েছে। এছাড়া লিন্ডন বি. জনসনের আমল থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু আইন মেনে চলছিল, সেটা লঙ্ঘন করে অভিবাসীদের ফিরে যেতে বাধ্য করা হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইউএস প্রোগ্রামের সহ-পরিচালক অ্যালিসন পার্কার বলেছেন, ‘এক বড় ধাক্কা দিয়েই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতি তুচ্ছ- কিংবা কোনো ধরনের- অপরাধমূলক কাজ না করা কোটি কোটি মানুষকে মারাত্মক বিপদে ফেলে দিতে পারেন, মার্কিন নাগরিক পরিবারগুলোকে বিপর্যয়ে ঠেলে দেয়া হতে পারে। এই আদেশ অতিরিক্ত অন্তর্ভূক্তিমূলক ধর-পাকড়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে- যা যুক্তরাষ্ট্র ও শংকিত, আতংকিতও সন্ত্রস্ত্র সম্প্রদায়গুলোর সাথে দীর্ঘ দিন ধরে সম্পর্ক রক্ষাকারী মানুষজনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

‘অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ আনা যেতে পারে, এমন কর্ম সম্পাদানকারী’ যে কাউকে দূর করার অগ্রাধিকার প্রদানের ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি ব্যাপক মানবাধিকার উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

ট্রাম্পের নীতির ফলে আইনসম্মত অধিবাসীসহ দোষী সাব্যস্ত নয় এবং যাদের সর্বোচ্চ অপরাধ তারা কেবল অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করেছে- এমন লাখ লাখ মানুষকে ঢালাওভাবে ঝুঁকিতে ফেলে দেবে। বাস্তবে এটা অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে যুক্তরাষ্ট্রে বেআইনিভাবে প্রবেশকারী এক কোটি ১০ লাখ মানুষের অর্ধেকের বেশিসহ অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশকারী যে কাউকে বহিস্কার করার সুযোগ এনে দেবে।

ট্রাম্পের আদেশে ঢালাওভাবে ও নির্যাতনমূলক মার্কিন অভিবাসন আটকব্যবস্থার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো, ফেডারেল সংস্থাগুলোর আটক করার সামর্থ্য দ্রুত বৃদ্ধি এবং বহিষ্কার-প্রক্রিয়ার ফলাফল ঝুলে আছে- এমন প্রায় সব নাগরিকের আটক করার কথা বলা হয়েছে। অভিবাসন আটক-প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের ফলে মানুষজন কেমন বিপজ্জনকভাবে আটক থাকে এবং তা তাদের ন্যায্য বহিষ্কার শুনানির অধিকারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে- সে ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে নথিপত্র আছে।

আরেকটি নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প এমন সীমান্ত আইন কার্যকর করার কথা বলেছেন, যা মানুষজনের আশ্রয় গ্রহণের অধিকারকে ঝুঁকিগ্রস্ত করবে। এসব নীতি যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশকারী মানুষদের বহিষ্কার এবং অপরাধমূলক কাজের বিচার-প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য পরিচিত কার্যক্রমের প্রয়োগ বাড়িয়ে দেবে। ওই আইনের ফলে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সুরক্ষা কামনাকারী আশ্রয়প্রার্থী এবং যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ দিন ধরে বাস করছে, যাদের অনেকের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, এবং সেইসাথে নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে আসা শিশুসহ বিভিন্ন মানুষের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্প আরো ঘোষণা করেছেন, অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের কর্তৃত্ব দিতে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর সাথেও সমঝোতায় পৌঁছাবে তার প্রশাসন। যেসব নগরী ও রাজ্য ফেডারেল অভিবাসন আইন কার্যকর সীমিত করার জন্য ‘আশ্রয় দানকারী’ নীতি প্রণয়ন করেছে, তিনি তাদেরকে ফেডারেল তহবিল স্থগিত করার নীতিও গ্রহণ করতে যাচ্ছেন।

এ ধরনের ব্যবস্থার ফলে সমাজগুলোকে অপরাধের সাথে অভিবাসনকে গুলিয়ে ফেলবে বলে ট্রাম্পের দাবিটিকে ভ্রান্ত এবং সেইসাথে বিপজ্জনক হিসেবে দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ক্রমবর্ধমান অভিবাসনের ফলে অপরাধ বাড়ে বলে যে কথাটি বলা হয়ে থাকে, বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, তা স্রেফ মিথ, তাতে কোনো সত্যতা নেই।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসন আইন প্রয়োগে স্থানীয় পুলিশকে সম্পৃক্ত করার ফলে অনেক দেশে অভিবাসীরা ধর্ষণের মতো সহিংস অপরাধের মতো ঘটনার শিকারও হন। অনেকে এ কারণে পুলিশের কাছে এসব অপরাধের কথা বলতেও ভয় পান। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ কেউ অভিবাসীদের মর্যাদা-নির্বিশেষে অপরাধের ব্যাপারে রিপোর্ট করার জন্য সমাজের সদস্যদের উৎসাহিত  করার নীতির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে এই বিশ্বাসে যে, প্রত্যেকের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করার এটাই সর্বোত্তম উপায়। তবে ট্রাম্প যার সমালোচনা করেছেন। অপরাধের সাথে অভিবাসনকে গুলিয়ে ফেলার নীতি ও রাজনৈতিক বাগাড়ম্বড়তা বিদ্বেষপূর্ণ সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে ইন্ধন বাড়ানোর ঝুঁকিও সৃষ্টি করে।

পার্কার বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকানদের ‘‘প্রথম” করার জন্য এসব পদক্ষেপ জরুরি! কিন্তু বাস্তবে এসব পদক্ষেপ পরিবারগুলোকে একত্রে রাখা এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখার মার্কিন নাগরিকদের স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কংগ্রেস এবং আদালত এবং সেইসাথে জনসাধারণের উচিত এসব পদক্ষেপ প্রতিরোধ করা এবং সবার অধিকারের জন্য দাঁড়ানো।