Home » শিল্প-সংস্কৃতি » উগ্রজাতীয়তার কবলে হলিউড

উগ্রজাতীয়তার কবলে হলিউড

ফ্লোরা সরকার ::

আমরা যখন ইতালীয় ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ অথবা ভারতের ‘হিরক রাজার দেশে’ অথবা  বাংলাদেশের ‘জীবন থেকে নেয়া’ দেখি তখন কি মনে হয় না, ছবিগুলোর ঘটনা, চরিত্র ইত্যাদির সঙ্গে যার যার নিজ নিজ দেশের সাথে কোথায় যেন মিলে যাচ্ছে? বাংলাদেশের একজন দর্শককে যেমন লাইফ ইজ বিউটিফুল বুঝতে অসুবিধা হয় না, ঠিক তেমনি ইতালীয় বা ভিন্ন ভাষার একজন দর্শকে হিরক রাজার দেশে বা জীবন থেকে নেয়া (ইংরেজি সাবটাইটলযুক্ত) বুঝে নিতেও কোনো অসুবিধা হয় না। ইরানের ‘দ্য ব্ল্যাকবোর্ড’ অথবা ‘দ্য সিক্রেট ব্যালট’ যখন দেখি এবং সেই ব্ল্যাকবোর্ড নিয়ে কয়েকজন শিক্ষক যখন সারা ছবি জুড়ে মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য হয়রান হয়ে ঘুরে বেড়ান অথবা ‘দ্য সিক্রেট ব্যালট’ ছবিতে দেশের নির্বাচন নিয়ে যে ঠাট্টা-মস্করা করা হয়, তা কি আমাদের মতো দেশের সঙ্গে মিলে যায় না? শুধু মিলেই যায় না, ছবিগুলো তখন আমরা আমাদেরই মনে করি। মনে হয়, আমাদের মনের কথা, আমাদের বাস্তবতা, অন্য ভাষায় দেখছি, শুনছি আর অনুভব করছি। এর নামই আন্তর্জাতিক ভাষা। সিনেমা থেকে শুরু করে সব শিল্পকর্মের ভাষা তাই আন্তর্জাতিক হয়ে থাকে। শিল্প-সাহিত্যের এই আন্তর্জাতিকতার কারণে অতীতেও যেমন শিল্পকর্ম হয়েছে, আজও হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হতে থাকবে। সীমান্ত না মানা এসব কাজকে তাই কেউ দেশের সীমারেখা দিয়ে বেঁধে রাখতে পারেনা। কিন্তু এবারের অস্কার প্রতিযোগিতায় ‘এ সেপারেশন’ খ্যাত ইরানের চিত্রপরিচালক আজগার ফারহাদির ছবি ‘দ্য সেলসম্যান’ যখন মনোনীত হলো এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে গেলো, তখন শিল্পের এই আন্তর্জাতিকতার প্রশ্নটা আবার সামনে চলে আসলো। হলিউড শুধু সিনেমার বিশ্ববাজারের জন্য বিখ্যাত নয়, প্রতিবছর এখানকার একাডেমি থেকে বিদেশি ভাষার জন্য প্রতিযোগিতা বিভাগে যে এ্যওয়ার্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়, সে কারণেও  হলিউড প্রশংসাযোগ্য। ট্রাম্পের এই নিষেধাজ্ঞা সেই প্রশংসার উপর যেন একটা আঘাত এনে দিলো। তবে আজগার ফারহাদির ঘটনাই প্রথম নয়, এর আগেও এই ধরণের ঘটনা ঘটেছে।

সময়- ২০১৩ সাল, স্থান- লস এঞ্জেলেস এয়ারপোর্ট; প্যালেস্টাইনের নির্মাতা এমাদ বার্নাট নির্মিত, অস্কার মনোনীত ছবি ‘ফাইভ ব্রোকেন ক্যামেরাস’ এর জন্য যখন তিনি তার স্ত্রী এবং আট বছরের ছেলেকে নিয়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছালেন, তখন তাকে আটকে রাখা হলো প্রায় দেড় ঘন্টা। শেষে বিখ্যাত প্রামান্যচিত্র নির্মাতা মাইকেল মুরের সহায়তায় বার্নাট মুক্ত হলেন এবং আমেরিকা প্রবেশের অনুমতি পেলেন। এই বিষয়ে মাইকেল মুর পরে হিটফ্লিক্সকে জানান, ‘বার্নাট যখন সাহায্য চেয়ে আমাকে টেক্স করলো, আসলে তখন যেটা হয়েছিলো, সেটা হলো, এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস অফিসারদের মাথায়ই ঢুকছিলো না যে, একজন প্যালেস্টাইনি কি করে অস্কারে মনোনীত হয়।’ এই হলো আমেরিকার ইমিগ্রেশন অফিসারদের বুদ্ধির দৌঁরাত্ম। মুর কিছুটা কটাক্ষ করে পরে বলেন, ‘আসলে নিমন্ত্রনপত্রের লেখাটা বোধহয় ঠিক মতো লেখা হয়নি, লেখা হলে এরকম বিতাড়িত হবার ভয় এমাদ বার্নাটকে পেতে হতোনা।’ তবে এই বিষয়ে বার্নাটের খুব বেশি উদ্বেগ ছিলো না। বার্নাট বলেন, ‘বিষয়টা কিছুটা বিব্রতকর। কিন্তু প্যালেস্টাইনে প্রায় প্রতিদিন আমাদের এইরকম বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। ওয়েস্টবাংকে ৫শ’ ইসরাইলি চেকপোস্ট, রোডবলক সহ আরও নানারকমের বাঁধাবিঘ্ন অতিক্রম করে প্রতিদিন আমাদের চলাফেরা করতে হয়, এটা তো একটা ছোট্ট ঘটনা মাত্র।’

ঘটনা ছোট হলেও এসব ঘটনাই পরে বড় আকার ধারণ করে। যেমন এবারের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার ব্যপ্তি। তবে  ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে পরিচালক ফারহাদি, অস্কারে মনোনীত হলেও নিজেই ঘোষণা দিলেন যে, আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য অস্কার অনুষ্ঠানে যাবেন না। ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র তারানেহ আলীদুস্তি ফারহাদির আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনিও যাবেন না এবারের অনুষ্ঠানে। ফারহাদি আরও বলেছেন, তাকে যদি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে যাওয়াও হয়, তবু তিনি যাবেন না। কেন যাবেন না?  ভ্যারাইটিতে (২৯ জানুয়ারি, ২০১৭) সে কারণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ফারহাদি বলেছেন, ‘একটা দেশের নিরাপত্তার জন্য মিথ্যা অজুহাতে, অন্য দেশের নাগরিকদের উপর সেই দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে যে অপমানিত বা হীন করা হয়, শত্রু তা তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়, এগুলো ইতিহাসে নতুন কিছু নয়, আমি আশা করবো- আমার দেশসহ আরও যে ছয়টা দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, সেসব দেশ এবং আমেরিকার জনগণের মাঝে এই নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করবেনা।…… এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, বিষয়টা শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ। আমার দেশেও এমন কট্টরপন্থী অনেক আছে। বিগত বেশ কযেক বছর ধরে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই ধারের দেশগুলোতেই, এসব কট্টরপন্থীরা, বিভিন্ন জাতি এবং সংস্কৃতির পার্থক্যের জায়গায় অবাস্তব এবং ভয়াবহ বিরোধী মত গড়ে তুলছে। বিরোধ সৃষ্টি করে শত্রুতা, শত্রু তা সৃষ্টি করে ভয়।  চরমপন্থা এবং মৌলবাদের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া এই ধরণের ভয় অত্যন্ত ফলপ্রসু ও কার্যকর একটা অস্ত্র।’ অর্থাৎ মানুষ তখন খুব সহজেই সবকিছু বিশ্বাস করে ফেলে। কে শত্রু , কে বন্ধু তার এক গোলকধাঁধাঁর ভেতর ঘুরপাক খায়।

তবে শিল্পীরা সব সময় সচেতন নাগরিক। শিল্পের কাজ মানুষের মাঝে সচেতনা সৃষ্টি করা এবং সেই সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়া। শিল্পের ইতিহাসে দেখা গেছে, যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ক্ষেত্রে শিল্পীরা প্রথমে এগিয়ে আসেন। কবি নাজিম হিকমতকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্যে পাবলো পিকাসো, পল রবিনসন, জ্যঁ পল সার্ত্রেসহ আরো অনেক দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিক ১৯৪৯ সালে আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন করে কীভাবে প্যারিসে প্রচার-প্রচারনা শুরু করেন এবং তাকে কারামুক্ত করেন। জাফার পানাহীর  ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটনা ঘটছে। জাফর পানাহীকে গৃহবন্দী করার পর থেকে তার নিজের দেশের শিল্পীসাহিত্যিকসহ আন্তর্জতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের সেলিব্রিটিদের নিয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের বর্তমান নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ গত ৮ জানুয়ারি গোল্ডেন গ্লোব অনুষ্ঠানে যে অসাধারণ বক্তৃতা দেন- তা এখন ইউটিউবে সবার হাতে হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মেরিল প্রথমেই হলিউডের কিছু বিখ্যাত শিল্পীদের নাম উল্লেখ করেন- যারা বিভিন্ন দেশ থেকে এসে হলিউডকে সমৃদ্ধশালী করেছেন। এবং যাদের ছাড়া হলিউড একেবারেই অচল। এখন এসব শিল্পীকে যদি হঠাৎ করে দেশছাড়া করা হয় তাহলে হলিউডে ফুটবল খেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকবেনা। মেরিল রসিকতা করে বলেন, ফুটবল অবশ্য মার্শাল আর্ট তবে আর্ট (অর্থাৎ নির্ভেজাল শিল্প) নয় কিন্তু। তার ছোট্ট- নাতিদীর্ঘ বক্তৃতায় শুধু শ্লেষ ছাড়া আর কিছু ছিলোনা। একজন শিল্পী যখন সকল শিল্পীর হয়ে কথা বলেন, তখন তার উদারতার মাত্রা বুঝে নিতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয়না। সেই সাথে ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও আন্তর্জাতিক একটা রূপ প্রস্ফুটিত হতে দেখা যায়। মেরিলের বক্তৃতা সেদিকেও একটা ইঙ্গিত দেয়। আমরা আশা করবো, শিল্পের যে আন্তর্জাতিক রূপের কথা আমরা জানি, হলিউড তা বজায় রাখতে সচেষ্ট হবে। আজগার ফারহাদি, এমাদ বার্নাটের মতো নির্মাতারা যেন বার বার হয়রানির শিকার না হন। যদি এভাবে নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকে তাহলে মেরিলের ভাষায় বলতে হয়  “অসম্মান শুধু অসম্মানকে ডেকে আনে, সন্ত্রাস ডেকে আনে আরেক সন্ত্রাসকে”।