Home » প্রচ্ছদ কথা » খুন-জখম : এখন শুধুই নিজেরা বনাম নিজেরা

খুন-জখম : এখন শুধুই নিজেরা বনাম নিজেরা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

সাংবাদিক হত্যায় কে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর কে রাণার আপ, সে কূটতর্কে না গিয়ে বলা হোক- সাংবাদিকরা হত্যা- নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি, সাংবাদিকদের মধ্যেকার অনৈক্য, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের দলদাস ভূমিকা এবং পেশাগত মানের নিম্নগামিতা, সর্বোপরি আইনের শাসনহীনতায়। অস্বীকার করি কি করে, এই দেশে এখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক, সম্পাদকের বিরুদ্ধে সম্পাদক, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম। হালের স্বরাষ্টমন্ত্রীর আবিস্কার ‘ধাক্কা-ধাক্কি’ তত্ত্ব। এই তত্ত্বের মূল বিষয় হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সাংবাদিকদের নির্যাতন করে না, মাঝে-মধ্যে ‘ধাক্কা’ লেগে যায়।  সেজন্যই তাদের ভাবনায়- কথায় সাংবাদিক হত্যায় কেউ চ্যাম্পিয়ন আর কেউ রানার আপ।

প্রতিপক্ষবিহীন ক্ষমতাসীন দল, ছাত্র-যুব-শ্রমিক সংগঠন। গজিয়ে উঠেছে অজস্র ভূঁইফোড় সংগঠন। শহরে-নগরে, গ্রামে-গঞ্জে জায়গা পেলেই দখল করে কোন না কোন লীগের সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়। বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে সকল জনপদ। প্রতিপক্ষ না থাকায় মাঠ পর্যায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সংঘাত-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাদের হাতে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে মাতৃগর্ভের শিশু, মারা পড়ছে সাংবাদিক, পথচারীসহ নিরীহ মানুষ। সংঘর্ষের মূূলে থাকছে নির্বাচনী বিরোধ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, দখল, ভাগাভাগি ইত্যাদি।

গণমাধ্যম জানাচ্ছে, মাত্র তিনদিনে পাঁচ জেলায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। জেলাগুলি হচ্ছে- খুলনা, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নড়াইল ও শেরপুর। গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে সাংবাদিক, খবর শুনে মারা গেছে তার নানী। নড়াইলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি খুন হয়েছেন নির্বাচনকালীন বিরোধের জেরে। শেরপুরে কলেজ অধ্যক্ষ ও আওয়ামী লীগ নেতা এবং ঈশ্বরদীতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের চার কর্মী গুলিবিদ্ধ ও অস্ত্রের আঘাতে জখম হয়েছেন। খুলনার ফুলতলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে যুবলীগ নেতা।

চাঁদপুরের হাইমচরের উপজেলা সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ছাত্রদের দিয়ে পদ্মা সেতু বানিয়ে তাদের পিঠের ওপর দিয়ে জুতা পায়ে হেঁটে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বহিস্কার করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেয়া হবে। বলেননি- কি আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আশা করি, মধ্যযুগীয় সামন্ত প্রভুদের মত আচরন করা লোকদের জন্য দল ও আইন শীগগিরই ব্যবস্থা নেবে। তবে মাত্র তিনদিনের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, দলের নেতা-কর্মীরা এখন কতটা বেপরোয়া!

গত ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষে খুন হয় ৩ জন, জখম হয় ২২জন। আগের দিন মঠবাড়িয়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকে কুপিয়ে আহত করা হয়। বছর শুরুর আগের রাতে খুলনায় আওয়ামী লীগ নেতা ও সিটি কাউন্সিলরকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মারা যান পুজোর ফুল নিতে আসা এক নারী। নগরীর কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসা এ সংঘর্ষের মূল কারণ বলে গণমাধ্যমগুলির অনুসন্ধানে উঠে আসছে।

গত বছর জুলাইয়ে খুলনা ও কুমিল্লায় অভ্যন্তরীন কোন্দলে ছাত্রলীগের তিন নেতা-কর্মী খুন হন। পরের সাড়ে তিনমাস তারা সংঘর্ষবিহীন কাটালেও নভেম্বরের দিকে আবার গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ১৯ নভেম্বর ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে লাঞ্চিত হন। পরদিন নিজ বাসায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

২০১৭ সাল শুরু হওয়ার দিনে গণমাধ্যমে প্রধান শিরোনামগুলিই ছিল ‘বাসায় ঢুকে সংসদ সদস্যকে হত্যা’; ‘খুলনায় আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার চেষ্টা, গুলিতে গৃহবধু নিহত’; এরকমই আতঙ্ক ছড়ানো সব খবর নিয়ে স্বাগত জানাতে হয়েছে নতুন বছরকে। স্বাভাবিকভাবেই উৎকন্ঠিত মানুষ। দিনে-দুপুরে, রাত-বিরেতে নিজেদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে ‘ট্রিগারহ্যাপী’ হয়ে উঠছে। মারছে নিরীহদের, নিজেদের তো বটেই।

লক্ষ্য করুন, পর পর দু’দিনের জাতীয় সংবাদপত্রগুলির শিরোনাম, ‘ক্ষমতাসীন দলের সংঘর্ষ: হানাহানি ও খুন-জখমের ঘটনা’; ‘আবার হানাহানিতে আ. লীগ গুলিবিদ্ধ সাংবাদিকের মৃত্যু’; ‘ঘরের আগুনে পুড়ছে আওয়ামী লীগ’; ‘ক্ষমতাসীন দল বেপরোয়া’; ‘শাসক দলে কেন এতো খুনোখুনি’; এর কারণ হিসেবে বিভিন্ন সূত্র, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের বরাতে দেয়া বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ক্ষমতায় দেশজুড়ে চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী। দলের অনেক মন্ত্রী, এমপি, জেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র ও দলীয় পদধারী নেতারা মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসকদের মত আচরন করছেন।

এসব ভাষ্য- বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে পারছে না ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অপরাধ দমন বা কমে না আসার কারন হচ্ছে, খুন বা সংঘর্ষের সাথে যারা যুক্ত, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া, তারা আইন ও বিচারের আওতায় আসছে না। ফলে ক্ষমতাসীন দলের যে কোন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বদ্ধমূল ধারনা তারা যা খুশি তাই করে পার পেয়ে যেতে পারি। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তাদের দলীয় সংঘর্ষের বলি হচ্ছে নিরীহ সাধারনরা।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির মধ্যে ১৩ টি সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ১ জন, আহত হয়েছে ১৯০ জন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ঘটনা ৮৮ টি। খুন হয়েছে ৮৩ জন, আহত ১০৫২ জন। ছাত্রলীগ বনাম ছাত্রলীগ, যুবলীগ বনাম যুবলীগ, ছাত্রলীগ বনাম ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ৩৫ টি। নিহত ৪, আহত ২০৬ জন।

আগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দলকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রস্তুত করার ঘোষণার পর যেন বেড়ে চলেছে অভ্যন্তরীন কোন্দল, হানাহানি ও সংঘর্ষ। ২০১৬ সালে ছয় দফায় অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় খুন হয়েছিলেন ১১৬ জন, যার মধ্যে ৭১ জন আওয়ামী নেতা-কর্মী।  তার আগের দু’বছর ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ক্ষমতাসীন এই দলের অভ্যন্তরীন সংঘর্ষে খুন হয়েছে ৬৭ জন নেতা-কর্মী।

এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন দল। দৃশ্যত: তারা আইনের উর্ধে অবস্থান করছেন। প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে রক্ত ঝরাচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নেয়ার বদলে দর্শক বনে যাচ্ছে। এর কারনও ওপেন সিক্রেট। পুলিশের সামনে আগ্নেয়াস্র বহনের ছবি প্রকাশিত হলেও ভাষ্য আসে: পুলিশ খবর নিচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্রটি কি বৈধ নাকি অবৈধ! মানে দাঁড়াচ্ছে প্রচলিত আইন ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

সবকিছুর প্রতি ক্ষমতাসীনদের সীমাহীন অবজ্ঞা। বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি ক্ষমতাসীনদের অবজ্ঞা ক্ষমতায় থাকতে না হয় জনগন দেখতে অভ্যস্ত। যারা সরকারের সমালোচনা করেন, মার্কিন লেখক এইচ এল মেনকেনের ভাষায়- চিন্তাশীল মানুষই সরকারের সবচেয়ে বড় শত্রু । এদের প্রতি এবং জনগনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বিষয়েও সকলে অভ্যস্ততা অর্জন করেছেন। কিন্তু আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা মনে করিয়ে দিচ্ছে, ক্ষমতাসীন হলেই তারা জবাবদিহিতার উর্ধে চলে যান। অন্য দিকে একটি দল নিজের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে না, সেজন্য কি নিরীহ জনসাধারন প্রাণ দিতেই থাকবে?

ময়মনসিংেহের গফরগাওয়ের বাদল মিয়া (৫৮) একজন রেলকর্মী, মারা গেলেন রেলে কাটা পড়ে। এরকম মৃত্যু বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে, শহর-বন্দরে আকছার ঘটে থাকে। যে দেশে স্বাভাবিক মৃত্যু গ্যারান্টি প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে বাদল মিয়াদের মৃত্যু কি বিশেষ কোন অর্থ বয়ে আনে! কিন্তু এই বাদল মিয়ার মৃত্যু অর্থহীন নয়, কোন বিচারেই নয়। এক মা ও তার শিশু সন্তানকে রেলে কাটা পড়া থেকে বাঁচাতে নিজেই রেলে কাটা পড়লেন। এই মহত্তম মৃত্যু আমাদের ফিরিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনার কাছে। যারা আমাদের বর্তমানের জন্য তাদের ভবিষ্যত উৎসর্গ করেছিলেন। অথবা মনে করিয়ে দেয়, গ্রীক পূরাণের প্রমিথিউসকে, আগুন আবিষ্কার করতে গিয়ে যিনি পুড়ে মরে, মানুষকে আগুন জ্বালানো শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।