Home » আন্তর্জাতিক » ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্তর্গত সঙ্কট

ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্তর্গত সঙ্কট

পুলাপ্রে বালাকৃষ্ণান ::

ভারতের অর্থনীতি প্রায়ই মনোযোগ আকর্ষণ করলেও, প্রধানত খাদ্য সঙ্কট এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিভ্রাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, দেশটির গণতন্ত্রের কার্যকারিতা আলোচনার মধ্যে পড়ে না। এটা আত্মতৃপ্তির বিষয়টি প্রতিফলিত করে।

মজার ব্যাপার হলো, দেশটির যে দিকেই তাকানো হোক না কেন, অবহেলা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সমাজের ভেতর ও বাইরে- উভয় ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। এর ফলে পাশ্চাত্য বিশ্বের শাসকেরা যখন মুক্তবাজার কাঠামোর আপাত শ্রেয়তর রীতিনীতি থেকে বিচ্যুতির জন্য ভারতকে তিরস্কার করেন, তখন ভারতের জাতীয়তাবাদী এলিটরা পাশ্চাত্য আধিপত্যের মধ্যে সমস্যাটি শনাক্ত করেন। উভয় পক্ষই ভারতের গণতন্ত্রের মধ্যেই ব্যর্থতার বীজ নিহিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে গুরুত্ব হারান। তারা বুঝতে চান না, সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই ভারতের একমাত্রিক গণতন্ত্র মোটামুটিভাবে একই অবস্থায় রয়ে গেছে।  এই মাত্রাটি হলো- জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠকে দুর্বল সামর্থ্যরে মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর স্বাধীনতাহীনতা : সামর্থ্য হলো ব্যক্তিদের- তাদের দৃষ্টিতে মূল্যবান বিবেচিত পন্থায় জীবন যাপন করতে পারা। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এটাকেই সত্যিকারের স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করেছেন;  এবং এ কারণে সব উন্নয়ন প্রয়াসে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আইডিয়াটা মৌলিক এই দৃষ্টিতে যে, এটা উন্নয়নের সংকীর্ণ অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংজ্ঞার বাইরে নিয়ে যায়। নিজেদের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী জীবনযাপন করতে না পারাটা পরাধীনতা- আমাদের জনসাধারণের বিপুল অংশ যতক্ষণ এমন অবস্থায় থাকবে, ততক্ষণ আমাদের সংবিধানে আমরা যতই ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ঢুকাই না কেন,  রাজ্য বা বাজার যতই আমরা পাই না কেন, তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

ভারতের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের ভিশন যা-ই হোক না কেন, ভারতীয় গণতন্ত্র তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বরং বাস্তবতা হলো, তা আরো খারাপ হয়েছে। অতীতের বছরগুলোতে সে তার নিষ্ক্রিয় চরিত্রে প্রান্তিকতার দিকে সহিংসতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। পাশ্চাত্যে ভারতীয়রা বর্ণবাদী মর্যাদাহানির শিকার হওয়ার খবর আমাদের বসার ঘরে প্রবেশ করলে, ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণী দ্রুত আহত হয়।

ভারত থেকে এই দৃশ্য একটা পুরো শতক পরে এসেছে। আর দলিত তরুণরা কেবল মৃত গরুর চামড়ার অধিকারী হতো। ভারতীয় সমাজ ঐতিহাসিকভাবে তাদেরকে এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল। তাদেরকে এই কাজের মধ্যে আটকে রেখে তাদের মর্যাদাই কেবল প্রত্যাখ্যান করা হয়নি, সেইসাথে তাদের জীবিকাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। যেকোনো সভ্য সমাজে এই অপরাধের অপরাধীরা কেবল আদালতের লম্বা হাতের কাছে ধরাই পড়তো না, প্রকাশ্যে লজ্জিতও হতো।

গুজরাট নিঃসন্দেহে দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্র একটি স্থান। এটাও স্বীকার করে নিতে হবে যে, উত্তর ভারতজুড়ে এটা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল এবং দক্ষিণ ভারতও তা থেকে মুক্ত ছিল না; তামিল নাড়– বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। এটাও ঠিক, দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সাম্প্রতিক সময়ের সৃষ্ট বিষয় নয়। ভারতে তাদের নির্যাতন সঙ্ঘবদ্ধ এবং অনেক গভীরে নিহিত। মধ্য বর্ণের নেতাদের মাধ্যমে অ-কংগ্রেসীয় শাসন দীর্ঘ দিন ধরে রয়েছে তামিল নাড়–, বিহার ও উত্তর প্রদেশে। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এসব রাজ্যে অনেকবারই দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দেখা গেছে। ক্ষমতায় থাকার সময় মধ্য বর্ণভিত্তিক দলগুলো সমাজ পিরামিডের শীর্ষের প্রতি তাদের আক্রমণ নিচের দিকে থাকাদের দমনে চালিত করে।

সমাজবাদী ক্যারিশমা : তাহলে আমরা কী করতে পারি? ক্ষমতার করিডোরের বাইরে থাকাদের দায়িত্ব হলো- ভারতীয় গণতন্ত্রের ধারা গড়ে দেওয়া। তাদের লক্ষ্য হতে হবে- দুর্বল সব গ্রæপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানব উন্নয়নের দিকে নতুন নজর নিবদ্ধ করা। এজন্য শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ার সাথে কোনোভাবেই সঙ্ঘাতময় হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং তেজদীপ্ত বাজারসহ শক্তিশালী অর্থনীতি স্বাধীনতা প্রকাশের একটি বিষয়। বেসরকারি উদ্যোগে বিধিনিষেধ সমাজের প্রান্তিকদের ক্ষমতায়নে কিছুই করতে পারে না। তাদের ক্ষমতায়ন আসতে পারে কেবল তাদের সামর্থ্য বিকাশে প্রত্যক্ষ সরকারি কার্যক্রমের মাধ্যমে।

বস্তুত, সমাজবাদের প্রতি সত্যিকারের প্রতিশ্রুতিই এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কার্ল মার্ক্স সমাজতন্ত্রকে এমন নীতি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন- যেখানে ‘প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে, তার প্রয়োজন অনুযায়ী পাবে।’ কিন্তু এর বদলে ভারত রাষ্ট্রের সরকারি আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্র আবদ্ধ থেকেছে সরকারি খাতে ফলাফল হিসাব না করেই এবং ঐতিহাসিকভাবে অচ্ছ্যুৎ হয়ে থাকাদের জন্য পরিণতি না ভেবেই পণ্য উৎপাদনে। সামাজিক পরিমন্ডলে অর্থনীতি এবং অবাধ বাজারে হস্তক্ষেপের জন্য রাষ্ট্র গর্ব করেছে। ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি সহায়ক এমন প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ায় কাজটি বাস্তবে রূপ নেয়নি। ঐতিহাসিকভাবে অচ্ছ্যুৎদের নিজেদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটা আসলে পিছিয়ে থাকাদের সহায়তা না দেওয়ার নৈতিক অবস্থান গ্রহণের মতোই ব্যবস্থা।

নীতি পরিবর্তন : শেষ পর্যন্ত কর্ম অনুযায়ী ফল পাওয়া গেল। বর্তমান ভারতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দুর্বলভাবে শিক্ষিত ও খারাপ স্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষের বাস। ক্রয় ক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অথনীতি হওয়া সত্তে¡ও এটা একটা উন্নয়ন বিপর্যয়। বঞ্চিতের মাত্রাটি বোঝার জন্য যে কেউ দেশের বেশির ভাগ এলাকায় ভারতীয় রেলওয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে, যেভাবে ‘গান্ধী করেছিলেন’, চড়ে দেখতে পারেন এবং কিভাবে এর সমাধানের নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে, সেটা অনুমান করে নিতে পারেন। ‘অর্থনৈতিক সংস্কারের’ নামে ভারতীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে সিকি শতাব্দী ব্যয় করা হয়েছে। এখন পরবর্তী একটা দশক মানব বঞ্চনার দিকে নজর দিলে তা হবে লাভজনক। ভারতের সবচেয়ে বঞ্চিত নারী ও দলিতদের সামর্থ্য বিকাশের জন্য প্রথমে পরিকল্পনা করে সেদিকে সম্পদ চালিত করতে হবে।

গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার জন্য ব্যক্তির ওপর নজর দেওয়ার চেয়েও আরো বড় কিছু করা প্রয়োজন। প্রত্যেকেই যাতে স্বতন্ত্র থেকেও সমান হতে পারে- সেটা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এখানে জনকল্যাণ সামনে আসতে হবে; অংশগ্রহণকারী সাম্যের ভিত্তিতে ভারতীয়রা যাতে মিলতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এই দেশের মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সংগ্রাম করতে থাকায় স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক, সমাধিস্থলে ব্যাপকভিত্তিক সরকারি পরিষেবার মাধ্যমে একত্রিত করতে হবে। মতবিনিময়ের ব্যাপক ব্যবস্থাই অভিন্ন মানবতা প্রকাশ করে; আমরা সত্যিকারের কী তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা করে দেয়।

ভারতের সরকারি নীতি নির্ধারণে জনসাধারণের অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে মতবিনিময়ের সুযোগ খুবই কম। অনেক দেশই এ ব্যাপারে অনেক কিছু করেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘পুঁজিবাদী’ সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়। সেখানে সরকারি আবাসনে সব ‘বর্ণ’ তথা চীনা, ভারতীয় ও মালয়দের একসাথে থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রায়ই বৈশ্বিক ফোরামে সন্ত্রাসবাদের অগ্রহণযোগ্যতার কথা বলে থাকেন। এমনটা বলার অধিকার তিনি রাখেন। এখন গুজরাটে দলিতদের ওপর আক্রমণ, দেশজুড়ে নারীদের ধর্ষণ এবং উত্তর-প্রদেশে মুসলিমদের ভীতিপ্রদর্শন আমাদের মধ্যেই সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতি থাকার বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এসবের অনেক কিছু তার দিল্লিতে আগমনের আগে থেকেই থাকলেও, তার পর থেকে ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলো সুরক্ষা পেয়ে ওই কাজ করতে উৎসাহিত হচ্ছে- এমনটা বিশ্বাস করার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।

এসব শক্তিকে সংযত করার অক্ষমতায় ভারতীয় গণতন্ত্রকে ক্রমাগত ম্লান হতে দেখা যায়। বার্নান্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আমরা কখনো দিতে পারি না, যদি আমরা অন্যদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দিতে পারি’। দলিতদের নির্যাতনে ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি হয়েছে। তাদেরকে একইরকম মানুষের মর্যাদা অন্তত দেওয়া হয়েছে। তারা কেবল সম্মিলিতভাবে মরা পশুর সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। তারা পানি সরবরাহ বিষাক্ত করেনি। (দ্য হিন্দু অবলম্বনে)