Home » অর্থনীতি » সরকারী তথ্যের সাথে মিল নেই আসল বাজারদরের

সরকারী তথ্যের সাথে মিল নেই আসল বাজারদরের

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

খাদ্যের সংকট নয়, খাদ্য কেনার ক্ষমতা লোপ পেলেই দুর্ভিক্ষ ঘটতে পারে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এ উপমহাদেশে সংঘটিত দুটি দুর্ভিক্ষের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন, সে সময় খাদ্যের সংকট নয়, বন্টন ব্যবস্থার ত্রুটি এবং খাদ্য কেনার ক্ষমতা না থাকায় বিপুলসংখ্যাক মানুষ খাবার না খেতে পেরে মারা গেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্যের কোনো সংকট নেই, রয়েছে খাদ্য কেনার সক্ষমতার অভাব। তবে পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয় যে, দুভিক্ষ ঘটতে পারে। তারপরও দ্রব্যমূল্য বেড়ে এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছে- যেখানে মানুষ তার খাদ্য তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছে। বাড়ি ভাড়া থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষকে এটি করতে হচ্ছে। নিত্যপণ্য দিন দিন মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় সবকিছুই যেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

বিদায়ী ২০১৬ সালে দেশে সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। ব্যয়বৃদ্ধির এই হার আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, এ সময়ে পণ্যমূল্য ও সেবা সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। পরিবারের মোট ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে পণ্য বা সেবার ওজনের ভিত্তিতে জীবনযাত্রা ব্যয়ের এই হিসাব নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে কর্মকান্ড পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। গত বছর সব ধরনের চাল ও ডালের দাম ছাড়াও গরুর দুধ, মাংস, আদা, রসুন, চিনি, লবণ, দেশি থান কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি, গেঞ্জি, তোয়ালে এবং গামছার দাম বেড়েছে। বছরজুড়েই অনিশ্চয়তা ছিল সেবা সার্ভিসের মধ্যে গ্যাস ও পানি নিয়ে। একদিকে শহরে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তার আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে বাসা ভাড়া পরিশোধে। সেই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় সেবা সার্ভিসের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যাতায়াতের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছেই।

সরকার প্রদত্ত মূল্যস্ফীতির তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই বাজারের। প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়তির দিকে থাকলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কীভাবে কে ছে বা কমে, তা কারো বোধগম্য নয়। শুধু চালের দামই প্রকারভেদে কেজিপ্রতি ৩-৫ টাকা বেড়েছে। শুধু খাদ্যপণ্যের দাম নয়, ওষুধের দামও বাড়তির দিকে। গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে, বেড়েছে বাড়ি ভাড়া। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪৫০-৪৮০ টাকা কেজি দরে। মাছের দাম বাড়তি, বেড়েছে গরীবের আমিষের উৎস বয়লার মুরগীর দামও। ভোজ্য তেলের দামও কোনো কারণ ছাড়াই বেড়েছে। চিনির বর্ধিত দাম এখনো বহাল রয়েছে। এসবের কোনো উল্লেখ নেই সরকার প্রদত্ত মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির একটি বড় কারণ রাজনৈতিক অর্থনীতি। অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে একটি কায়েমী স্বার্থান্ধ চক্র গড়ে উঠেছে, যার কারণে সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগ সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাত্ত্বিকভাবে রাজনৈতিক অর্থনীতি বলতে আমরা রাজনীতি ও অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে বুঝে থাকি। অন্য কথায়, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া অর্থনৈতিক দুষ্কর্ম পরিচালিত হতে পারে না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ন্যক্কারজনক ও ঘৃণ্য অপতৎপরতায় লিপ্ত হতে পারছে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া কখনোই আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, মধস্বত্বভোগী বা খুচরা বিক্রেতারা কোনো ফন্দি বাস্তবায়ন করতে পারে না।

সাধারণ মানুষ আজ কোনদিকে যাবে তা ভেবে দিশেহারা। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের তো দৈনন্দিন জীবন রক্ষা করাই দায়; মুটেমজুর, কামার-কুমার, কৃষি ও দিনমজুর তদুপরি ছিন্নমূল মানুষের কথা তো লেখাই বাহুল্য। ভালো নেই কৃষকরাও। বারবার বাম্পার ফলন ফলিয়েও বাজারে গিয়ে প্রতারিত হতে হচ্ছে তাদের। তারা না পাচ্ছেন ধানের দাম, না চালের। না পাট বা অন্যান্য ফসলের- যেমন শাকসবজি, তরিতরকারি। প্রায় সব স্থানেই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম প্রবল। মিল ও চাতাল মালিকদের খপ্পরে পড়ে কৃষক একদিকে যেমন ধান-চালের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে বাজারে গিয়ে উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে খোরাকির চাল। গত কয়েক মাসে মোটা চালসহ সবরকম চালের দাম বেড়েছে। মাঝখানে একবার সরকার সীমিত পরিমাণে চাল রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্থগিত করে সিদ্ধান্ত। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তসহ বিরূপ আবহাওয়া, ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চালের বাজারে।

শাকসবজি, আটা, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিমের দামেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না। বর্তমানে বাজারে এমনকি আদা-রসুন-পেঁয়াজ ও অন্যান্য মশলার দামও বাড়ছে। বার্ড ফ্লুর প্রকোপে ছোটবড় অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছর ধরেই ডিম ও ব্রয়লারের বাজারে পরিলক্ষিত হচ্ছে ব্যাপক অস্থিরতা। গবাদিপশু ও দুধের ক্ষেত্রেও তাই। মাছও দুর্মূল্য-সহজলভ্য না হওয়ায়। ফলে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে প্রবল হয়ে দেখা দিচ্ছে প্রোটিন ঘাটতি। চাল ও আটার দাম বাড়ায় এখন শর্করার ঘাটতিও অনিবার্য। ফলে দু‘বেলা দু’মুঠো খেয়ে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই বর্তমানে রীতিমতো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমিত পরিমাণে ন্যায্যমূল্যে চাল ও আটা বিক্রির ব্যবস্থা করেছে। তবে এ সুযোগ পৌঁছায় না সর্বত্র। কেবল রাজধানী ও নগরজীবনেই সীমাবদ্ধ। গ্রামাঞ্চলে ভিজিএফ, কাবিখা, কাবিটাজাতীয় কিছু সামাজিক কর্মসূচি চালু থাকলেও সেসব সর্বত্রগামী-এমন কথা বলা যাবে না; এরও একটা দলীয় বিবেচনা আছে। ফলে গণমানুষের দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তা বাড়ছেই। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নিজেদের কৃষি ও কৃষকবান্ধব বলে পরিচয় দেয়। দেশব্যাপী দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচিতেও তাদের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আছে। তবে কৃষকদের ধান-চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণসহ সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর ব্যাপারে তেমন উদ্যোগ-আয়োজন চোখে পড়ে না। গত কয়েক বছরে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি তো দূরের কথা, গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে পুরনোগুলোই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনিবার্য বাড়ছে বেকারত্ব। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। মাঝখানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে টিসিবিকে সক্রিয় করে তোলার কথা শোনা গেলেও আশব্যঞ্জক অগ্রগতি নেই।

বিশ্লেষকদের দাবি, দেশে কোন পণ্যের চাহিদা কী সে হিসাব নেই সরকারের কাছে। নেই আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থার হালনাগাদ তথ্যও। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় রেখে সারা বছর বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও সরকার গড়ে তোলেনি। জরাগ্রস্ত সরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও নখদন্তহীন। পাস হয়নি প্রতিযোগিতা আইন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে পণ্যের চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সরকারের কাছে থাকতে হবে। আগাম ব্যবস্থা নিয়ে নিশ্চিত করতে হবে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পর তৎপরতা দেখালে চলবে না, এজন্য বছরজুড়েই পণ্যের দামের ওপর নজরদারি রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে কোন পণ্যের চাহিদা কত, উৎপাদন কত হবে, কী পরিমাণ আমদানি করতে হবে, কোন দেশে কোন পণ্য পাওয়া যাবে, দাম কেমন হবে- এসব বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য নেই সরকারের কোনো সংস্থার কাছে। ব্যবসায়ীরা যে যার মতো আমদানি করছেন। কখনো দরকারের চেয়ে বেশি আমদানি করে লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা, আবার কখনো কম আমদানি করে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলে তারা নিজেরাই নির্ধারণ করে দিচ্ছেন খাদ্যপণ্যের স্থানীয় বাজার দর। আর সেই দরই সরকার মেনে নিচ্ছে। তাই ভোক্তা অধিকার আইন করে, পরিবেশক প্রথা চালু করে, মোবাইল কোর্ট বসিয়েও খুচরা পর্যায়ে দাম ঠিক রাখা যাচ্ছে না। মোটকথা, সরকারের সদ্বিচ্ছার অভাবই হচ্ছে  এর মূল কারন।