Home » প্রচ্ছদ কথা » ভাষা আন্দোলন : মওলানা ভাসানীর ভূমিকা

ভাষা আন্দোলন : মওলানা ভাসানীর ভূমিকা

শাহ আহমদ রেজা ::

দেশে ইতিহাস বিকৃতির সুচিন্তিত অভিযান চালানোর অভিযোগ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলেই বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের মাসে আংশিকভাবে হলেও সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি অসত্য তথ্য সংশোধন করাকে আমরা জাতীয় দায়িত্ব মনে করি। প্রাসঙ্গিক একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯৫৭ সালের জুলাই পর্যন্ত দলটির সভাপতি হিসেবে তিনি পূর্ব বাংলার তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের কেন্দ্রে ও পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে সরকার গঠন করেছে (সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬)। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্বায়ত্তশাসনের যে পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছিল, মওলানা ভাসানী ছিলেন তার প্রধান নির্মাতা। স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাকও তিনিই প্রথম দিয়েছিলেন। ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানানোর পর তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ৩০ নভেম্বর সুরা কাফেরুনের আয়াত উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর আজকের বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব বাংলার ওপর শোষণ, বঞ্চনা ও অবিচারের সূচনা হলে প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের মাধ্যমে তিনি স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে ক্রমাগত তীব্রতর করেছিলেন। স্বায়ত্তশাসনের বিকল্প হিসেবে পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সংগঠিত করার মাধ্যমে মওলানা ভাসানী সমগ্র পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন। স্বাধীনতামুখী সে অবস্থান থেকে জনগণকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ব্যর্থ হয়েছিল এমনকি এক পাকিস্তানভিত্তিক সমঝোতার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টাও।

১৯৪৮ সাল থেকে বিকশিত ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে মওলানা ভাসানীর ছিল বলিষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্কের প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল বিবৃতিতে বা জনসভার ভাষণে নয়, পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পার্লামেন্ট ‘ব্যবস্থাপক সভায়’ও তিনি বাংলা ব্যবহারের দাবিতে সোচ্চার থেকেছেন। যেমন প্রাদেশিক ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশনে মওলানা ভাসানী ইংরেজির পরিবর্তে বাংলা ভাষা ব্যবহার করার দাবি জানিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে পার্লামেন্টের ভেতরে তিনি অবশ্য আর কথা বলার বা দাবি জানানোর সুযোগ পাননি। কারণ, স্বল্প সময়ের মধ্যে মুসলিম লীগ সরকার মিথ্যা অভিযোগে ব্যবস্থাপক সভায় তাঁর সদস্যপদ বাতিল করিয়েছিল।

ওদিকে, পাকিস্তানের জাতির পিতা ও গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা দেয়ার পর থেকে পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানও ঢাকা সফরে এসে কথিত ‘প্রাদেশিকতার’ কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে অত্যন্ত ‘অশোভন’ আখ্যা দিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মীমাংসা হইয়া গিয়াছে।’ (১৮ নভেম্বর, ১৯৪৮) তখনও পর্যন্ত আসাম মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত মওলানা ভাসানী প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত মন্তব্য ও পূর্ব বাংলাবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। এভাবে বিরোধিতার মধ্য দিয়েই তাঁর সরকারবিরোধী ভূমিকার আরম্ভ হয়েছিল। ফলে তাঁর ওপর নেমে এসেছিল নির্যাতন। তিনি দক্ষিণ টাঙ্গাইল থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাঁর এই নির্বাচনকে বাতিল করে দেয়। সেই সাথে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়ার ওপর আরোপিত হয় নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু সরকারের সঙ্গে আপস করার পরিবর্তে মওলানা ভাসানী আন্দোলনের পথে এগোতে থাকেন, প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম প্রভাবশালী বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আবারও বাংলা ভাষা ও কথিত ‘প্রাদেশিকতার’ সমালোচনা করলে প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী ঢাকায় এক বিরাট বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালেই আরমানিটোলা ময়দানে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভা থেকে রাষ্ট্রভাষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পূর্ব বাংলার দাবি তুলে ধরা হয়। আন্দোলন দমন করার উদ্দেশ্যে ১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর মওলানা  ভাসানীকে গ্রেফতার করে সরকার।

লিয়াকত আলী খানের হত্যাকান্ডের পর প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্তি পেয়ে ঢাকা সফরকালে ঢাকার সন্তান খাজা নাজিমউদ্দিনও উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরোধিতার পাশাপাশি তিনি মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধেও কঠোর বক্তব্য রেখেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতের চর’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য পাকিস্তানের সংহতি নষ্ট করা। জবাবে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, জনগণ মুসলিম লীগের শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে বলে এবং নিজেদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে পড়তে শুরু করেছে বলেই খাজা নাজিমউদ্দিন বেসামাল হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ‘আবোলতাবোল’ অভিযোগ আনছেন।

খাজা নাজিমউদ্দিনের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত ঘোষণার প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকা বার লাইব্রেরি মিলনায়তনে সর্বস্তরের বিশিষ্ট নাগরিকদের এক সভায় গঠিত হয়েছিল ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’। ৪০ সদস্যবিশিষ্ট সে কর্মপরিষদের এক নম্বর সদস্য ছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলা শাখা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি আবুল হাশিম ও আতাউর রহমান খানের মতো প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত নেতাদের পাশাপাশি অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা ও আবদুল মতিনের মতো ছাত্র ও যুবনেতারাও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি ঢাকা নগরীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪ ফেব্রুয়ারি যে ধর্মঘটের এবং সভা ও শোভাযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল কর্মপরিষদের পক্ষ থেকে সে সবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়েছিল। একাধিক বিবৃতি ও ভাষণে মওলানা ভাসানীও কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রাজধানীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সেদিন পাঁচ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে সমবেত হয় এবং দীর্ঘ মিছিল নিয়ে বিক্ষোভ করে। বিকেলে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জনসভায় দেয়া ভাষণে মওলানা ভাসানী পূর্ব বাংলার সঙ্গে মুসলিম লীগ সরকারের বিশ্বাসঘাতকতার কঠোর সমালোচনা করেন এবং রাষ্ট্রভাষার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ১৫০ নম্বর মোঘলটুলিতে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে সেটা ভঙ্গ করা হবে কি হবে না- এই প্রশ্নে দীর্ঘ বিতর্ক চলে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে অলি আহাদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। তাকে সমর্থন জানিয়ে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, যে সরকার গণআন্দোলনকে বানচাল করার জন্য অন্যায়ভাবে আইন প্রয়োগ করে সে সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞাকে মাথা নত করে মেনে নেয়ার অর্থ স্বৈরাচারের কাছে আত্মসমর্পণ করা। মওলানা ভাসানীর এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। ওই সভার এক প্রস্তাবেই ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষিত হয়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে এক মাসের জন্য সব মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে।

চরম উত্তেজনাপূর্ণ সে পরিস্থিতিতে ঢাকার ৯৪ নম্বর নবাবপুরে অবস্থিত আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় অফিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের জরুরি সভা। এতে দীর্ঘ বিতর্কের পর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে বেশি ভোট পড়লেও পরদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই বিক্ষোভ মিছিল বের হয়েছিল। সে মিছিলের ওপরই গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। আগের কর্মসূচি অনুযায়ী মওলানা ভাসানী এ সময় ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রদেশের বিভিন্নস্থানে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সাংগঠনিক সফরে ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার খবর জেনেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন। ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতানের মতে তিনিই জানাজার নামাজে ইমামতি করেছিলেন। অন্যদিকে আরেক ভাষা সৈনিক গাজীউল হক বলেছেন, তিনি মোনাজাত পরিচালনা করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সমর্থক সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ লিখেছিল, ‘মেডিকেল কলেজের সম্মুখে তিনি (অর্থাৎ মওলানা ভাসানী) লক্ষ লোকের একটি গায়েবানা জানাজায় নেতৃত্ব করেন।’ (বশীর আল হেলাল, ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’, পৃ- ৩৭৪-৩৭৭)

২২ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘ঢাকায় যাহা ঘটিয়াছে তাহার নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নাই। কোন সভ্য সরকার এরূপ বর্বরোচিত কান্ড করিতে পারে দুনিয়ার ইতিহাসে তার নজির খুঁজিয়া পাই না।… আমি মোমেনশাহী, পাবনা, কুমিল্লা সফর করিয়া গতরাত্রে ঢাকায় ফিরিয়া যাহা দেখিলাম তাতে আমার কলিজা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। নূরুল আমীন সরকার অবশেষে জাতির ভবিষ্যৎ ছাত্রসমাজকে দমাইবার জন্য চরম পন্থা অবলম্বনে মাতিয়াছে।… আমি দাবী করি, অবিলম্বে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হউক, পুলিশী গুলীর তদন্ত করার জন্য হাইকোর্ট জজ ও জনপ্রতিনিধি নিয়া গঠিত কমিশন নিযুক্ত করা হউক। আমি অপরাধীদের প্রকাশ্য বিচার দাবী করিতেছি। এই ব্যাপারে যাদের গ্রেফতার করা হইয়াছে তাদের মুক্তি দেওয়া এবং যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করা হইয়াছে অবিলম্বে তাহা প্রত্যাহার করা হউক। সর্বোপরি শহীদদের পরিবার-পরিজনকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হউক।…’ (মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)

ভাষা আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে সরকার অসংখ্য ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করেছিল। মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে জারি করেছিল গ্রেফতারি পরোয়ানা। মওলানা ভাসানী আদালতে হাজির হয়ে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন ১০ এপ্রিল (১৯৫২)। কারাগারেও তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। রাষ্ট্রভাষা ও স্বায়ত্তশাসনসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন দাবি পূরণ এবং আন্দোলনকালে গ্রেফতার করা রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি আদায়ের জন্য মওলানা ভাসানী এ সময় নতুন ধরনের অনশন শুরু করেন। সারাদিন তিনি রোজা রাখতেন অর্থাৎ পানাহার করতেন না। অনশন ভাঙতেন সন্ধ্যার পর। তাঁর অনুপ্রেরণায় অন্য অনেক বন্দীও একইভাবে অনশন করতে থাকেন। রাজবন্দী অলি আহাদ ও ধনঞ্জয় দাশ লিখেছেন, মওলানা ভাসানীর পরামর্শে তারা ৩৫ দিন রোজা রেখেছিলেন এবং এর ফলে কারাগারের ভেতরে-বাইরে বন্দীদের মুক্তির জন্য আন্দোলন জোরদার হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে অনেকে মুক্তিও পেয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল। রোজা রাখার ধারাবাহিকতায় ১৮ এপ্রিল থেকে তিনি আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন। এতে তাঁর শরীর খারাপ হতে থাকে, সে খবর প্রকাশিত হলে জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জনমতের চাপে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কারাগারে মওলানা ভাসানী একদিনের অনশন করেছিলেন।

এভাবেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন মওলানা ভাসানী। সেকালের আরো অনেক নেতাও প্রাথমিক পর্যায়ে অংশ নিয়েছিলেন সত্য কিন্তু তাদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যেমন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা গাজীউল হক জানিয়েছেন, ‘মওলানা ভাসানীসহ যে ৪২ জন নেতা এই আন্দোলনের সপক্ষে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রিত্ব ও রাষ্ট্রদূতের পদ নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন।’ (ধানসিঁড়ি সংকলন, চতুর্থ প্রকাশনা, ১৯৮০, পৃ-৫৮) এখানে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও পরবর্তীকালের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা সম্পর্কেও জানানো দরকার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার পর সমগ্র প্রদেশে যখন সরকারের বিরুদ্ধে ধিক্কার উঠেছিল এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন যখন আরো দুর্বার হচ্ছিল তেমন এক পরিস্থিতির মধ্যেও ২৪ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের হায়দরাবাদ থেকে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, ‘… ঘটনা বর্তমানে ঘটিলেও বহু পূর্বেই পূর্ব বংগে ভাষা সম্পর্কে বিতর্ক দেখা দিয়াছে। আমি সেই সময় একটি জনসভায়ও এক বিবৃতিতে বলিয়াছিলাম, যে-আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তদনুসারে উর্দুই হইবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।… বাংলার বুকে অবশ্য উর্দুকে জোর করিয়া চাপাইয়া দেওয়া হইবে না, তবে বিদ্যালয়ে আবশ্যিক দ্বিতীয় ভাষারূপে ইহা পড়ান হইবে এবং যথাসময়ে এই প্রদেশবাসীগণ এই ভাষার সহিত পরিচিত হইয়া উঠিলে প্রদেশের শিক্ষিত সমাজ ও সরকারী কর্মচারীগণ আপনা হইতেই ইহা পড়িতে ও লিখিতে শুরু করিবে। তখন উর্দু তাহাদের নিকট গৌরবজনক মর্যাদাই লাভ করিবে এবং পূর্ব পাকিস্তানীরাও দুই ভাষাভাষী হইবে।…’ (দৈনিক আজাদ, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)

উল্লেখ্য, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এই বক্তব্যের কঠোর বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘সংবাদপত্রে জনাব সোহরাওয়ার্দীর এক বিবৃতি দেখিয়া আমরা অত্যন্ত বিস্মিত হইলাম। উহাতে তিনি পরোক্ষভাবে উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের জন্য ওকালতী করিয়াছেন।… উহাতে তাহার ব্যক্তিগত অভিমতই প্রকাশিত হইয়াছে বলিয়া বুঝিতে হইবে এবং আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিতেছি যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মোছলেম লীগ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গৃহিত না হওয়া পর্যন্ত এবং সরকার কর্তৃক কার্যকরী না করা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালাইবে। আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার দাবী করা হইয়াছে এবং এই প্রতিষ্ঠান গঠিত হওয়ার পর হইতেই আমরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার জন্য আন্দোলন করিয়া আসিতেছি।’ (দৈনিক আজাদ, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)

বলা দরকার, দলের পাশাপাশি মওলানা ভাসানী নিজেও প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষেই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। মূলত আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে তাঁর অব্যাহত দাবি ও চাপের কারণেই ১৯৫৬ সালে রচিত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল।

লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক

ই-মেইল: shahahmadreza@yahoo.com