Home » প্রচ্ছদ কথা » প্রধানমন্ত্রী কার পক্ষে অবস্থান নেবেন- মন্ত্রী নাকি জনগনের?

প্রধানমন্ত্রী কার পক্ষে অবস্থান নেবেন- মন্ত্রী নাকি জনগনের?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে, তারপরেও তিনজন মন্ত্রীর বাণী দিয়ে শুরু করা যাক। মন্ত্রী শাহজাহান খান বলেছেন, “ক্ষুব্দ চালকরা জেল-জুলুম মাথায় নিয়ে কাজ করতে চায় না”। মন্ত্রী আনিসুল হক ধর্মঘটকে ‘দুঃখজনক’ মনে করে বলেছেন, “জনগনকে কষ্ট না দিয়ে আদালতে বক্তব্য দিন”। এই ধর্মঘট আদালত অবমাননা কিনা, সে প্রশ্নে তিনি মনে করেন এটি আদালতের বিবেচ্য বিষয়। মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বললেন, “ধর্মঘট অযৌক্তিক। প্রত্যাহার করা উচিত”।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সত্যি হলে জানবেন, একজন মন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে বসে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং সরকার সমর্থক পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এর মধ্য দিয়ে তারা রাষ্ট্র-জনগনকে জিম্মি করছেন- দোষী সাব্যস্ত হওয়া আদালতে দন্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি মওকুফ করানোর জন্য! এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী কি তার মন্ত্রীদের পক্ষে অবস্থান নেবেন, নাকি জনগনের পক্ষে?

সরকারের নৌ-মন্ত্রী শাহজাহান খান সারাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলির শীর্ষ ফোরাম ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনে’র কার্যকরী সভাপতি। বাস ও ট্রাক শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি সরকারের প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা। গণমাধ্যম জানিয়েছে, যে বৈঠকটি ধর্মঘট আহবানের জন্য মন্ত্রীর সরকারের বাসভবনে অনুষ্টিত হয়েছে সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় খুবই চাতুর্যের সাথে। দায় এড়াতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি। কারন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সরকারের কর্তারা।

জনগন জানে না, গণমাধ্যমে দেয়া নৌমন্ত্রীর বক্তব্য আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি-না? নিশ্চয়ই সেটি আদালত বিবেচনায় নেবে। নৌমন্ত্রী বলছেন, “সংক্ষুব্দ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করতেই পারে। আপনিও করেন, আমিও করি। ঠিক একইভাবে ওরাও (শ্রমিক) ক্ষোভ প্রকাশ করছে। চালকরা মনে করছেন, তারা মৃত্যুদন্ডাদেশ বা যাবজ্জীবন রায় মাথায় নিয়ে গাড়ি চালাবেন না। তাই তারা স্বেচ্ছায় গাড়ি চালাচ্ছেন না। এটাকে ধর্মঘট নয়, স্বেচ্ছায় অবসর বলা যেতে পারে”।

এটি হচ্ছে সরকারের মন্ত্রীর বক্তব্য। এটি কি তাহলে সরকারের ভেতরের সরকার। তার ভাষায়, ‘স্বেচ্ছা অবসরে’ থাকা শ্রমিকরা দেশজুড়ে তান্ডব চালাচ্ছে। চড়াও হচ্ছে পুলিশ-র‌্যাবের ওপর। জনগনের কথা তো আসছেই না। তাহলে ধরে নিতে হবে সরকারের মন্ত্রী, সরকার সমর্থক শ্রমিক নেতারা দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবেন? তারা কি বিচারিক আদালতের রায়ও বদলে দেবেন?

নৌমন্ত্রী ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর এহেন আচরনে দুঃখ পেয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গণমাধ্যমকে বলেছেন,“তাদের (তার সহকর্মীরা, নাকি পরিবহন শ্রমিকরা) উদ্দেশ্যে বলতে চাই, জনগনকে কষ্ট না দিয়ে আপনারা আদালতে এসে আপনাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। আপনাদের বক্তব্য যদি যুক্তিসঙ্গত হয়, তবে তা দেখা হবে। যুক্তিসঙ্গত না হলে দেখা হবে না”।

কি সুন্দর বক্তব্য! যিনি এধরনের কাজে সব সময় সিরিয়াস, তিনি কিনা ধর্মঘটের নামে অবরোধ, ধ্বংসযজ্ঞের মত ব্যাপারে এতটাই যুক্তিবাদী! অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তার সহকর্মীদের এবং সমর্থক নেতাদের এরকম কর্মকান্ড অযৌক্তিক বলছেন এবং মনে করছেন, ধর্মঘট প্রত্যাহার করা উচিত।

লঞ্চ দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়েরকৃত মামলাগুলির প্রায় কোন অনুসন্ধান বা তদন্ত হয় না। কারন সরকারের কর্তারাই শ্রমিক নেতা এবং অন্যরা সরকারের সক্রিয় সমর্র্থক।  নানা ঘটনা ধামাচাপা দিতে, বিরোধীদলের কর্মসূচি ভেস্তে দিতে ক্ষমতাসীনরা ব্যবহার করা হয়েছে পরিবহন শ্রমিকদের। এজন্যই ক্ষমতাসীনদের আস্কারায় তারা এতই বেপরোয়া যে, ‘দুর্ঘটনা’র নামে মানুষ খুন করে ‘দায়মুক্তি’ দাবি করছে।

গেল ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র তিনদিনে সড়কের মড়কে নিহত ৫৭ জন। জানুয়ারিতে নিহত ৪১৬ জন। সরকারী হিসেব মতে বছরে গড়ে মারা  গেছে আড়াই হাজার। যাত্রী কল্যান সমিতির দাবি- এই সংখ্যা ৮ হাজার। সংখ্যা হয়ে উঠেছে বিবেচ্য। কিন্তু সড়কে চালকের বেপরোয়াত্বের কারনে একজন মানুষও নিহত হলে তার দায় সরকারের। কিন্তু দায় নেয়ার বদলে এখন আদালতের রায় বদলাতে দেশ জুড়ে নামিয়ে আনা হয় ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্য!

মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদকে সড়কে যে চালক মেরে ফেলেছিল, তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ এবং গাড়িটি ছিল ফিটনেসবিহীন। এর পর ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে শিক্ষাগতসহ কিছু যোগ্যতা নির্ধারন করলেও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের নিয়ে গড়ে তোলা মন্ত্রীর ক্ষমতাবলয়ের প্রভাব এতটাই যে, পরিবহন সেক্টরে সরকার প্রায় কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে না।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আদালতের রায়ের সাথে নাকি জনগনের সম্পর্ক নেই। তিনি কি বলতে চেয়েছেন, ইতিপূর্বে আদালত যে সব যুগান্তকারী রায় দিয়েছে, শাস্তি দিয়েছেন ঘাতকদের তার সাথে জনগন সম্পর্কহীন? কারন মি. কাদের মনে করছেন, “আদালত রায় দিয়েছে, জনগন দেয়নি”। আদালতের দেয়া রায় ও কার্যকর করা জনগনের প্রার্থিত এবং প্রত্যাশিত। সে কারনে এ রায় জনসম্পর্কিত। কিন্ত প্রাক্তন ছাত্রনেতা, রাজনীতিক ওবায়দুল কাদের জানেন, জনগন যখন রায় দেয়, তখন তার পরিনাম কি হয়! ইতিহাসের অজস্র উদাহরন নিশ্চয়ই তাকে স্মরন করিয়ে দিতে হবে না।