Home » আন্তর্জাতিক » ফারাক্কা : ভারতে আবারও তীব্র প্রতিবাদ

ফারাক্কা : ভারতে আবারও তীব্র প্রতিবাদ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ফারাক্কা বাঁধ এখন ভারতের জন্যে, বিশেষ করে এর বিহার অঞ্চলের অভিশাপ। বাঁধটি বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রতিবেশকে ধ্বংস করে মরুভূমিতে পরিণত করছে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলছে, আবার বিহারসহ উজানে সৃষ্টি করছে ভয়াবহ বন্যা আর নদী ভাঙ্গনের। বাঁধটি চালু হওয়ার প্রথম থেকেই বাংলাদেশের মানুষ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। আর এখন সোচ্চার হয়েছে বিহারের মানুষ। অবশ্য এটা ঠিক, এই বাঁধ যে পশ্চিমবঙ্গের জন্যও ভয়াবহ ক্ষতির কারণ, তা প্রথম থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। এই প্রকল্পের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার বাঁধটির নির্মাণের বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে তাকে সরে যেতে হয়েছিল।

কিন্তু এখন ভারতে বাঁধটির বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে অনেক মানুষ। পরিবেশবাদীদের সাথে যোগ দিয়েছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারসহ আরো অনেক সুপরিচিত মুখ।

প্রতিবাদকারীর আরেকজন হচ্ছেন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার বিজয়ী রাজেন্দ্র সিং। তাকে ভারতের ‘ওয়াটারম্যান’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। তিনি ‘ফারাক্কা বাঁধ গুঁড়িয়ে দেওয়া’র প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফরাক্কা হলো বিহারের কাছে অশুভ। এটা একটা অভিশাপ- যাকে সরানোর প্রয়োজন। কারণ, যতক্ষণ তা না হচ্ছে, ততক্ষণ এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে রাজেন্দ্র বলেন, এতদিন ফারাক্কার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো নিয়েই আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি, পরিবেশগত থেকে শুরু করে এর সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক, আধ্যাত্মিক দিকগুলোও খতিয়ে দেখা দরকার।

আরেক বিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠক্কর জানান, ফারাক্কা বাঁধের কার্যকারিতা বলতে কিছুই নেই। সেচ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ- কোনো কাজেই আসছে না ফারাক্কা। তার প্রস্তাব, গোটা বিষয়টি (ফারাক্কার প্রয়োজনীয়তা) খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। তিনি যোগ করেন, সাধারণত, প্রত্যেক বাঁধের গুরুত্বের খতিয়ান ২০ বছর অন্তর খতিয়ে দেখা উচিত। কিন্তু, ৪২ বছর হয়ে গেলেও, ফরাক্কা নিয়ে কোনো পর্যালোচনা হয়নি। তার দাবি, ফারাক্কা যতদিন থাকবে, ততদিন গঙ্গার গতি থমকে যাবেই। ফলে, বিহারে ভয়াবহ বন্যা হবে।

এদিকে, গঙ্গা পুনঃজীবীকরণ নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রস্তাব দিয়েছে, বিহারের বন্যা পরিস্থিতি সামলাতে ফারাক্কা বাঁধ লাগোয়া জলাধারের চরায় ড্রেজিং করতে।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও চুপ কওে বসে নেই। তিনি ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য কেন্দ্র সরকারের কাছে প্রবল দাবি জানিয়ে বলেছেন, এর কোনো উপযোগিতা নেই, সেইসাথে এটা প্রতিবছর রাজ্যে বন্যা সৃষ্টি করে। তিনি প্রস্তাবিত ‘বক্সা’র জলাধার এবং উত্তরপ্রদেশগামী ‘এলাহাবাদ-হলদিয়া’ পানিপথেরও তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আগের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম। বিষয়টা আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও বলেছিলাম। তাকে বলেছি, ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা নদীতে ব্যাপক পলি জমাচ্ছে, প্রতি বছর বিহারে প্রবল বন্যা সৃষ্টি করছে’। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক বিশেষজ্ঞ ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতির দিকটি উল্লেখ করেছেন।

এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মূল ইঞ্জিনিয়ার এই বাঁধ নির্মাণের সাথে জড়িত ছিলেন তিনিও এর বিরোধিতা করেছিলেন- যাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, ওই বাধ নির্মানের বিরোধিতার জন্যে। তিনি লোক সংবাদ (গণ-সংলাপ)  অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি প্রতিটি প্লাটফর্মে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে দাবি জানিয়েছি। কারণ এটা গঙ্গা নদীতে পলি জমিয়ে দিচ্ছে, শক্তিশালী নদীটির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে’। তিনি বলেন, আগের মনমোহন সিং সরকারের আমলে রাজ্য পানিসম্পদমন্ত্রী পবন বনশালকে বাঁধের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখানো হয়েছিল, বিহার এবং অন্যান্য উজানের রাজ্যে এটা কেমন সমস্যার সৃষ্টি করছে।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার বলেন, ‘গত বছরের বন্যার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন আমার সাথে কথা বলেছিলাম, তখন তাকে জানিয়েছিলাম, ফারাক্কা বাঁধ কেমন সমস্যা সৃষ্টি করছে। পরে এক সভায় তাকে এর অপকারের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলাম।’ তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধ কল্যাণকর কিছুই করছে না। সমীক্ষাতেও এমনটা দেখা গেছে।

এই বাঁধের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ওই রাজ্যের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তবে অন্যরা কী বললো, তাতে আমি মনোযোগ দিচ্ছি না। কারণ বিহারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং আমরা এর বিরোধী।

নীতিশ কুমার বক্সারে এলাহাবাদ-হলদিয়া জাতীয় নৌপথ নম্বর ১-এর জলাধার নির্মাণের প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘গঙ্গার পরিষ্কারকরণ তখনই সম্ভব হবে, যখন এর প্রবাহ থাকবে বাধাহীন।