Home » বিশেষ নিবন্ধ » মৌসুমী শিল্প-সাহিত্য আর অর্থ সংস্কৃতি

মৌসুমী শিল্প-সাহিত্য আর অর্থ সংস্কৃতি

ফ্লোরা সরকার ::

প্রাণীকুল এবং মানুষ্যকুল দুই কুলের সাথে সব থেকে বড় মিল হলো দুই কুলের মাঝেই পেটের ক্ষুধা একটা সাধারণ প্রকৃতিক নিয়ম। উভয় কুলই খাবার খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যমে বেঁচে থাকে বা বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়। এখন কথা হলো, শুধু খাবার খেয়ে বেঁচে থাকাটাই যদি মানুষের উদ্দেশ্য এবং একই সাথে কাজ হতো তাহলে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে কোনো তফাৎ আমরা করতে পারতাম না। এবং মানুষকে সকল জীবের সেরা জীব হিসেবে বলা তো দূরেই থাক। মানুষের মাঝে কিছু বিশেষত্ব আছে বলেই সে অন্যান্য প্রাণী থেকে বেশ আলাদা। তার মানে মানুষের ভেতর শুধু পেটের ক্ষুধা নেই, আরও ক্ষুধা তার ভেতর আছে, যে ক্ষুধার কারণে সে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা। এবং সেটা হলো মানসিক বা মনের ক্ষুধা। মানুষ শুধু খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম, কাজ ইত্যাদির মধ্যে দিয়েই বেঁচে থাকতে চায়না, এসবের অতিরিক্ত আরও কিছু সে চায়, যা তাকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায় এবং তাকেই আমরা বলছি মানসিক ক্ষুধা। প্রেরণা সম্পর্কে অভিনেতা উৎপল দত্তের চমৎকার একটা সংজ্ঞা আছে -‘প্রেরণা একটি নিবিড় অনুভূতি, প্রথম প্রেমের উন্মেষের মতন ; বারোয়ারি মন্ডপের বস্তু সে নয়’ (গদ্য সংগ্রহ, উৎপল দত্ত)। মানুষ তার মানসিক ক্ষুধা নিবারনের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকার সেই প্রেরণা অনুভব করে যা প্রথম প্রেমের উন্মেষের মতো ; শারীরিক ক্ষুধার বারোয়ারি মন্ডপের বস্তু দিয়ে সেই ক্ষুধা সে মেটাতে পারেনা এবং এই কারণেই যে কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে শিল্প-সাহিত্যের এতো প্রয়োজন পরে। মানুষ যখন তার সেই মানসিক ক্ষুধা মেটাতে পারে, তখন শুধু সে বেঁচে থাকার প্রেরণাই পায়না, একই সাথে বেঁচে থাকাটাতে তার অর্থপূর্ণ মনে হয়।

পৃথিবীর সব থেকে কঠিনতম কাজ নিজের বা নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখা। কোনো ব্যক্তি-মানুষ বা সমাজ কখনোই সম্পূর্ণ ভাবে নিজেকে বা নিজেদের দেখতে পায়না। যদি পারতো তাহলে, কোনো সমাজে অত্যাচার, অনাচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি কিছুই হতোনা। মানুষ যখন তার নিজের জীবনকে প্রতিবিম্ব হিসেবে দেখতে পায় তখন তার ভুলগুলো সে ভালো ভাবে ধরতে পারে এবং সবাই না হলেও কেউ কেউ শুধরে নেয়ার চেষ্টা করে। কেউ সেই প্রতিবিম্ব আঁকেন তুলির আঁচড়ে, কেউ কলমের আঁচড়ে বা কেউ সিনেমা বা টিভি পর্দায় ক্যামেরার কলম দিয়ে। শিল্প-সাহিত্যের কাজ হলো নিজেকে বা নিজেদের মেলে ধরা। নিজেদের সঠিক প্রতিবিম্ব পাঠক বা দর্শকের সামনে সঠিক ভাবে মেলে ধরা। আমাদের দেশে শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে বর্তমান সময়ে, এই মেলে ধরার কাজটা কীভাবে, কতটুকু সংঘঠিত হচ্ছে বা আদৌও হচ্ছে কিনা সেটা একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ লিখলেই যেমন লেখা হয়না তেমনি টিভি বা সিনেমা পর্দায় কিছু ভেসে উঠলেই তা দেখার যোগ্য নাও হতে পারে। আজকের এই বিষয়গুলো একটু তলিয়ে দেখার চেষ্টা করবো।

আমরা যদি আমাদের শিল্প-সাহিত্যের দিকে তাকাই তাহলে কি দেখতে পাই ? বিগত প্রায় দশ-পনের বছর ধরে একই ধারায় আমাদের শিল্পকর্মের কাজগুলো সংঘঠিত হচ্ছে। বিশেষ বিশেষ উৎসবকে সামনে রেখে এর কাজগুলো হচ্ছে। যেমন, ঈদ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ভ্যালেনটাইনস ডে ইত্যাদি বিশেষ দিনগুলোকে সামনে রেখে টিভিতে বিশেষ নাটক, গান, নাচ, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখতে পাই। ভাবটা এমন, বিশেষ এসব দিন ছাড়া ভালো নাটক নির্মাণ বা ভালো কোনো অনুষ্ঠানের আয়জনের কোনো প্রযোজন নেই। আরও পরিতাপের বিষয় হলো, এই সবকিছু ( নাটক, গান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি ) যেন শুধুই টিভিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। টেলিভিশন ছাড়া শিল্পকর্ম করার আর কোনো জায়গা নেই এবং টিভি পর্দায় দেখা দিলেই সে শিল্পী এবং না দেখা দিলে সে শিল্পী নয়। বাইরের মঞ্চ বা উন্মুক্ত জায়গাগুলোও যে শিল্পচর্চ্চার চমৎকার খেত্র হতে পারে তা কারোর মাথাতেই যেন থাকেনা। এর মাঝে সেই টিভিও যখন শুধু বিশেষ উৎসবের টিভি হয়ে যায় তখন মনে হয় উৎসবের বাইরে আমাদের কোনো শিল্পকর্ম নেই। বছরের বাকি দিন ভালো নাটক বা গান না হলেও কোনো অসুবিধা নেই। আসলে যেটা হয়, সেটা হলো উৎসবের সময় বানিজ্য বেড়ে যায়। অন্যান্য সময়ের চেয়ে সেই সময়ে দর্শক সংখ্যা বেড়ে যায়। দর্শক সংখ্যা বাড়া মানেই বানিজ্য বাড়া। দর্শক সংখ্যা বাড়ে কেনো ? কারণ উৎসবের ছুটি ছাড়াও, আরও যে একটা বিষয় দর্শকের ভেতর কাজ করে তা হলো, দর্শক ইতিমধ্যেই জেনে গেছে শুধুমাত্র উৎসবের দিনগুলোতেই কিছু অন্তত ভালো নাটক, গান বা অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ থাকে, যা বছরের অন্যান্য দিনে থাকে না। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের শিল্পকর্ম শুধুই বিশেষ মৌসুম কেন্দ্রীক হয়ে পড়ছে। অথচ শিল্পকর্ম কোনো বিশেষ বিশেষ সময়ের জন্যে না। তা সারা বছরের জন্যে। আমাদের সিনেমা শিল্প আলোচনার বাইরে রাখা হলো। কারণ এই বিভাগের অবস্থা এতোটাই করুণ যে আলোচনা করারও জায়গা নেই। এবারে দেখা যাক, সাহিত্যের খেত্রে কি হচ্ছে।

বইমেলা শুধুই এখন ‘একুশের বইমেলা’। ফেব্রুয়ারি মাসটা যেন শুধু বই প্রকাশের এক প্রতীকী মাস হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। বইমেলার আয়োজন দেখলে মনে হয়, শুধু এই একমাসেই সারা বছরের বই প্রকাশ করা হবে এবং পাঠকও শুধু এই এক মাসই বই পড়বে, বছরের বাকি দিন বইয়ে হাত না দিলেও চলবে। এখানেও মৌসুমী প্রকাশকদের ভিড়ে প্রকৃত প্রকাশকেরা জায়গা করে নিতে পারছেনা। বাংলা একাডেমি থেকে স্থান বাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল এলাকা জুড়ে বইমেলার আয়তন বাড়ানো হয়েছে ঠিক, কিন্তু বাড়ে নাই ভালো বইয়ের সংখ্যা।  বই শুধু প্রকাশের মধ্যে দিয়েই তার কাজ শেষ করেনা। সেই বই পাঠযোগ্য কিনা সেটাই সব থেকে বড় প্রশ্ন। আমরা অনেক সময় পাঠককে দোষারোপ করে বলি যে, আজকাল কেউ বই পড়েনা। কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। যে মানষটা শুধু পড়তে এবং লিখতে শিখেছে, সেই মানুষ ভালো-মন্দ দুটোই বুঝতে শিখেছে। এবং একটা ভালো গল্প বা উপন্যাস বা কবিতা সাধ্য নেই কারো তা পড়া থেকে কাউকে বিরত রাখা। আমরা ভুলে যাই, ভালো গল্প বা উপন্যাস বিজ্ঞাপনের চাইতে, পাঠক থেকে পাঠকের কাছে দ্রুত ছড়িয়ে যায়। একটা গল্প যখন একজন পাঠকের মন ছুঁয়ে যায় সে তখন সেই ভালো লাগাটাকে শেয়ার করতে চায় অন্যের সাথে। এই শেয়ারের মধ্যে দিয়ে সেই গল্পের পাঠকের সীমানা বাড়তে থাকে। তাছাড়া বই পাইরেসির বিষয়টা এতো মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে পাঠক দেশি বই রেখে ( দাম বেশি হবার কারণে ), পার্শ্ববর্তী দেশের সস্তা পাইরেট বই কিনতে বেশি আগ্রহি।

একটা দেশের শিল্প-সাহিত্যের উন্নয়নের উপর নির্ভর করে সেই দেশের সাংস্কৃতিক মানোন্নয়ন। যদিও সংস্কৃতির সংজ্ঞা বিশাল তবু আলোচনার সুবিধার্থে এখানে শুধুমাত্র শিল্প-সাহিত্যের উপর সীমিত রাখা হয়েছে। একটা উন্নত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে অন্যান্য বিষয়ের সাথে একটা পরিশীলিত সাংস্কৃতিক পরিবেশের বড় প্রয়োজন। আমাদের এখানে যেভাবে সিনেমা, নাটক, গান, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি নির্মিত এবং রচিত হচ্ছে, তা প্রধানত অর্থ  বা টাকা কেন্দ্রীক। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে টাকার প্রশ্নটাও জড়িত থাকে কিন্তু তার অর্থ এই না যে, কোনো রকমে একটা সিনেমা বা নাটক বানিয়ে আমরা শুধু লাভের অংকটার দিকেই তাকিয়ে থাকবো। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে অন্যান্য কাজের এখানেই বিশেষ পার্থক্য। কারণ, শিল্পকর্ম পণ্য হলেও, বানিজ্যিক পণ্য নয়। বানিজ্যিক পণ্য নয় বলেই সে, শারীরিক ক্ষুধা নয় মানসিক ক্ষুধা মেটানোর পথে চলে। মানুষের এই মানসিক ক্ষুধা থেকেই মূলত শিল্পকর্মের উদ্ভব। তা না হলে আমরা গুহা চিত্র পেতাম না, মুখে মুখে গান বা কবিতা রচিত হতোনা। শুধু টাকার দিকে তাকিয়ে যখন শিল্পকর্ম রচিত হয় তখন তা আরেক ধরণের সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলে আর তা হলো “ অর্থ সংস্কৃতি ”। সবকিছু তখন শুধু অর্থ দিয়েই মাপা হয়; যা বর্তমানে হচ্ছে। এই কারণে একটা সিনেমার গল্প বা কাহিনীর চেয়ে তার নির্মাণ খরচ, নায়ক-নায়িকার গ্ল্যামার, সেট, শুটিং স্পট ইত্যাদি বেশি আকর্ষনীয় হয়ে উঠে। নায়ক বা নায়িকার চরিত্রের চেয়ে তার পোশাক বেশি জরুরী হয়ে উঠে। গায়কির চেয়ে গায়ক বা গায়িকার গানের ঢং (অঙ্গ সঞ্চালন), পোশাক, স্টুডিওর জাঁকজমক ইত্যাদি বেশি জরুরী হয়ে উঠে। অর্থ সংস্কৃতি দিয়ে আর যেটাই গড়ে তোলা যাকনা কেনো, কোনো সুস্থসংস্কৃতি নির্মাণ সম্ভব নয়। এসব তখনই হয়, মানুষ যখন শিল্পের চেয়ে বিশেষ মৌসুম আর টাকাকে মাথায় রেখে কিছু লিখে বা নির্মাণ করে। আমরা যদি এভাবে বিশেষ মৌসুমে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের চর্চ্চাকে এইভাবে অব্যহত রাখি, তাহলে তা দিয়ে হয়তো অর্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলা যাবে কিন্তু সুস্থ সংস্কৃতি কোনো ভাবেই নয় এবং মানসিক ক্ষুধা নিবারণ তো নয়ই। শেষে বলবো- শিল্পকর্ম বহমান নদীর মতো বয়ে চলে, কোনো বিশেষ মৌসুমে এসে শেষ হয়ে যায়না।