Home » অর্থনীতি » তীব্র সামাজিক সংকট : একাংশের হাতে কেন্দ্রীভূত বিশাল সম্পদ

তীব্র সামাজিক সংকট : একাংশের হাতে কেন্দ্রীভূত বিশাল সম্পদ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ধন-বৈষম্য । কিন্তু তা যদি একটা সীমা অতিক্রম করে যায়, তাহলে তা যে কোন  সমাজব্যবস্থার জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এ বৈষম্য বাড়তে বাড়তে বর্তমানে তা বিপদরেখা অতিক্রম করেছে। বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্য বৃদ্ধির হারটাও মারাত্মক বিপদের সংকেত দিচ্ছে। নব্বইয়ের দশকেই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল সুইজি বলেছিলেন, ঐতিহ্যগতভাবে লগ্নির প্রসার প্রকৃত অর্থনীতির সমৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে।…কিন্তু এখন আর তা নয়। এখন পুঁজির মালিক লগ্নি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবে, প্রকৃত উৎপাদনশীল সম্পদে নয়। অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকেই অর্থনীতির এই ধরনের বিকৃত প্রক্রিয়া এবং সেই কারণে উদ্ভূত ফাটকা পুঁজির ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বলেছিলেন।

সম্প্রতি প্রকাশিত অক্সফামের প্রতিবেদনে ধনী-গরিবের বৈষম্যের বেশ কিছু উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিরাজমান বৈষম্য ক্রমান্বয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। বলা হয়েছে, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের বড় কোম্পানির সূচক হলো এফটিএসই ১০০। এসব বড় কোম্পানির একজন প্রধান নির্বাহী এক বছরে যা আয় করেন, তা বাংলাদেশের পোশাক কারখানার ১০ হাজার শ্রমিকের এক বছরের আয়ের সমান। আবার ভিয়েতনামের একজন গরিব মানুষের ১০ বছরের আয়, ওই দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির এক দিনের আয়ের সমান। আগামী ২০ বছরে ৫০০ ধনী তাদের উত্তরাধিকারীদের হাতে ২ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ তুলে দেবেন। এর পরিমাণ ১৩০ কোটি মানুষের দেশ ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের  (জিডিপি) চেয়ে বেশি। ১৯৮৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০ শতাংশ গরিব মানুষের আয় প্রতিবছর গড়ে ৩ ডলার করে বেড়েছে। অন্যদিকে, ওই সময়ে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর আয় ১৮২ গুণ বেড়েছে। আর ১ শতাংশ ধনী গোষ্ঠীর হাতে যে সম্পদ আছে, তা বিশ্বের বাকি সব মানুষের সম্পদের চেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্রমাগত বৈষম্য বৃদ্ধির কারণে অপরাধ বাড়ছে, নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে; দারিদ্র্যবিমোচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। এর ফলে হতাশা ও আতঙ্কে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

প্রশ্ন হলো, বৈষম্য যেখানে বেড়েই চলে, উচ্চবিত্তের উলম্ফন, নিম্নবিত্ত যেখানে নামছেই, সেই অর্থনীতির কার্যক্রমে নীতি- নৈতিকতা কোথায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর সমাজের উপরে থাকা ১০ শতাংশ মানুষের আয়ে বৃহৎ উলম্ফন ঘটেছে। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আপাতত বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। তাদের যুক্তি, অনুন্নয়নের অন্ধকার থেকে একটি দেশ যখন উন্নয়নের আলোর দিকে পা বাড়ায়, তখন অসাম্য বা বৈষম্য খানিকটা বাড়েই। তাই উন্নয়নের স্বার্থেই এই বৈষম্য মেনে নিতে হয়। প্রশ্ন হলো, এই মেনে নেয়াটা আর কতকাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ৪৫ বছর অতিক্রান্ত। স্বাধীনতার সময় যত গড়িয়ে চলছে, বাংলাদেশে বৈষম্য ততই বাড়ছে। এই বৈষম্য এখন সমাজ দেহের সর্বত্র ভয়ঙ্করভাবে ফুটে উঠে, তীব্র আর্থ-সামাজিক সঙ্কট সৃষ্টি করছে। এক শ্রেণী মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া বিশাল সম্পদরাজিই আজকের বাংলাদেশের মৌলিক সঙ্কট।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক সময়ের সফল গবেষক, বতমান যুক্তরাজ্যের অলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস আর ওসমানী সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ব্যাকগ্রাউন্ড ওয়ার্ক করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশে স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রতি দশকেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। উন্নয়নের গতি সচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে আয় বৈষম্যও। গত চার দশকে বৈষম্যের এ অনুপাত দ্বিগুণ হয়েছে। আয় বৈষম্য দেখাতে গিয়ে তিনি ‘পালমা অনুপাত’’ ব্যবহার করেছেন। আয় বৈষম্য পরিমাপে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয় ‘জিনি সহগ’। তবে এর দ্বারা আয় বৈষম্যের ব্যাপকতার সঠিক চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই পালমা অনুপাত ব্যবহার করা হয়েছে। পালমা অনুপাত-এর ক্ষেত্রে- একটি দেশের উচ্চবিত্ত মানুষের ১০ শতাংশের আয় ও নিম্নবিত্ত ৪০ শতাংশের আয়ের অনুপাত ব্যবহার করা হয়। এ অনুপাত যত বেশি হবে, আয় বৈষম্য তত বাড়বে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবর্তী পর্যায়ের ৫০ শতাংশ মানুষের আয়ের অনুপাত মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকে। তাই পালমা অনুপাত নির্ণয়ে তাদের অংশ বিবেচনা করা হয় না। তবে বৈষম্য পরিমাপে বিশ্বব্যাপীই জিনি সহগের ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। আশির দশকে বাংলাদেশে এ হার ছিল দশমিক ৩৭; ২০১০ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় দশমিক ৪৬। অর্থাৎ গিনি কো-ইফিশিয়েন্ট অনুযায়ীও আমাদের আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

ড. ওসমানী দেখিয়েছেন, আশির দশকে বাংলাদেশে পালমা অনুপাত ছিল ১ দশমিক ৬৬। ২০১০-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১১। নব্বইয়ের দশকে এ অনুপাত ছিল ২ দশমিক শূন্য ৮ ও দুই হাজার-এর দশকে ২ দশমিক ৫৬। অর্থাৎ প্রতি দশকেই আয় বৈষম্য বেড়েছে। আর চার দশকে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যদিও এ সময়ে অথনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে। আশির দশকে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৭২, নব্বইয়ের দশকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮, দুই হাজার-এর দশকে ৫ দশমিক ৮২ ও ২০১০ এর দশকে ৬ দশমিক ১৩। চারদিকে তাকিয়েও বলা যায়, বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে আয় বৈষম্য আরো  বেশি। কারণ উচ্চবিত্তের ১০ শতাংশ মানুষ কখনই তাদের আয়ের সঠিক হিসাব দেয় না। তাদের অনেকেই অবৈধভাবে জমি দখল করে এবং বিদেশে অর্থ পাচার করে। কিন্তু এসব হিসাব কোথাও থাকে না। তারা যে হিসাব দেয়, তা খুবই নগণ্য। তাই সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে পালমা অনুপাতে আয় বৈষম্য আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

সম্পদ যত বাড়ছে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বা দ্বন্দ্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি যে কোনো বিচারেই বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু যে সব ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- বিত্তবান ও বিত্তহীনের ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। প্রতিবছর যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে তার বেশির ভাগ সুফল যাচ্ছে সামান্য কিছু সংখ্যক ভাগ্যবান ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারে’র (পিপিআরসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিত্তবান-বিত্তহীনের ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে এবং বর্তমানে তা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবছর যে আয় হয় তার ৪৬ দশমিক ২ শতাংশই চলে যায় উপরের দিকে অবস্থানরত ১০ শতাংশ বিত্তবান মানুষের হাতে। আর একেবারে নিম্ন অবস্থানে থাকা ৪০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের হাতে যায় মাত্র ১৩ শতাংশ। সবচেয়ে বিত্তবান ১০ শতাংশ মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ৪ হাজার ৯৬২ মার্কিন ডলার। সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশের মাথাপিছু গড় আয় মাত্র ৩৫৯ মার্কিন ডলার। মাঝের ৪০ শতাংশের মাথাপিছু আয় ৮৬৭ মার্কিন ডলার। এই পরিসংখ্যানে আয় বৈষম্যের যে চিত্র ফুটে ওঠে তা লক্ষণীয়। শহর এবং গ্রামের বিত্তবান মানুষের মধ্যেও আয় বৈষম্য দেখা হয়। রাজধানীর ১০ শতাংশ উচ্চবিত্ত মানুষের গড় আয় ১১ হাজার ৭৯১ মার্কিন ডলার। আয় বৈষম্যের এই চিত্র যে কোনোভাবেই উদ্বেগের সৃষ্টি করে।