Home » আন্তর্জাতিক » ভারতীয় দৃষ্টিতে বাংলাদেশ-ভারত প্রতিরক্ষা চুক্তি

ভারতীয় দৃষ্টিতে বাংলাদেশ-ভারত প্রতিরক্ষা চুক্তি

জয়িতা ভট্টাচার্য ::

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭ থেকে ১০ এপ্রিল ভারত সফরকালে বেশ কয়েকটি চুক্তিতে সই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুই দেশের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিটিই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ হওয়া দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক এই চুক্তির ফলে আরো গভীর হবে।

চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা না হলেও মিডিয়ায় প্রকাশিত কিছু কিছু তথ্যের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, চুক্তিটির মেয়াদ হবে ২৫ বছর। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির মধ্যে ক্রয় বাণিজ্য, প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া এবং সন্ত্রাসদমন বিষয়ক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের সূচনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে। ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি যুদ্ধ করে। কিন্তু বিপরীতক্রমে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ভারতের সাথে দেশের সম্পর্ক নিয়ে সংশয়ে ছিল বলে ধারণা করা হয়।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত সফর বিনিময়ও হচ্ছে। দুই দেশ প্রশিক্ষণ বিনিময় করছে; যৌথ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে, দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ৬ষ্ট রাউন্ডের ‘অপারেশন সম্প্রীতিও’ হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি উৎসাহব্যঞ্জক।

চুক্তিটি নিয়ে বাংলাদেশের অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং রাজনৈতিক নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তিগুলো হচ্ছে- এটা দেশের স্বার্থবিরুদ্ধ এবং এতে করে দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাছাড়া এই ভয়ও আছে যে, এর ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার এবং বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী চীন মর্মাহত হবে। চুক্তিটি নিয়ে এছাড়াও ভয়ের কারণ হলো, এর ফলে সার্বভৌমত্বে আঘাত দিয়ে, বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার করে ভারতীয় সৈন্যরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে চলাচল করতে পারবে। বিদ্যমান সামরিক সহযোগিতার দিকে ইঙ্গিত করে কয়েকজন বিশ্লেষক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন পর্যন্ত তুলেছেন। অধিকন্তু, ভারতীয় অস্ত্রের মান নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে।

এসব সংশয় সৃষ্টির বেশির ভাগ কারণ হলো ‘দাদাগিরি সিনড্রোম’; ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এতে বেশ ভুগেছে। ভারতকে প্রায়ই এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মানদন্ড দিয়ে বিচার করা হয়। এ ধরনের ভাবাবেগের সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশীরা প্রায়ই ’৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাছ থেকে আটক সব অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং চুক্তিটির ব্যাপারে তাদের আপত্তির ভিত্তি হিসেবেও এই ঘটনাকে ব্যবহার করে।

অবশ্য পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে; বাংলাদেশ সব ব্যাপারে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে। দেশটি অনেক ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই পথিকৃতে পরিণত হয়েছে। মানব উন্নয়নে দেশটি রোল মডেল হয়েছে; বিপুল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হাসিল করেছে, বিশ্বে দেশটি সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির অন্যতম। সশস্ত্র বাহিনীর সামর্থ্য ভালোভাবেই স্বীকৃত, শান্তিরক্ষায় আন্তর্জাতিক সাফল্য পেয়েছে। দেশটির এই শক্তি ও সামর্থ্যরে প্রতি স্বীকৃতি দেওয়ার এটাই সময়।

বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ। আর এর রয়েছে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও বিদেশনীতি । দেশটির চীন-নীতি প্রধানত ভারতের সাথে ভারসাম্য বিধানের জন্য বলে যে যুক্তি দেওয়া হয় তা ধোপে টেকে না এবং তা যুক্তিযুক্ত ও যতার্থও নয়। সার্বভৌম দেশের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক প্রণয়নের বেলায় তা হতে হবে- যেকোনো পক্ষপাতহীনতার  ভিত্তিতে এবং অবাধে, নিজস্ব নীতির আলোকে ।

অবশ্য মিডিয়ার ওপরও কিছু দায়দায়িত্ব বর্তায়। চুক্তিটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বেশির ভাগ আপত্তির সৃষ্টি হয়েছে কিছু মিডিয়া প্রতিবেদন ও ভূমিকার কারণে। ওইসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে চীনা প্রভাবের ভারসাম্য বিধানের উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে বাংলাদেশ দুটি চীনা সাবমেরিন কেনার পর। বাংলাদেশের জনগণ তাদের জাতিকে নিয়ে চরমভাবে গর্বিত। ফলে এ ধরনের প্রতিবেদন তাদের মর্যাদায় আঘাত হেনেছে, ভারতবিরোধী বাগাড়ম্বড়তায় রসদ জুগিয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে আবেগ উস্কে দিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিরোধিতাকারী অংশটি এ ধরনের ভাবাবেগকে কৌশলে ব্যবহার করছে।

এ ধরনের চুক্তির সুবিধাগুলো উপলব্ধি করার সময় এসেছে। প্রথমত, একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সামরিক সহযোগিতার পরিমন্ডলে গ্রহণ করা উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকা নিশ্চিত করবে। আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ভর করে বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের মানসিকতার ওপর।

দ্বিতীয়ত, দুই দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতি ঘনিষ্ঠতার আলোকে বলা যায়, সন্ত্রাসপ্রতিরোধের মতো অনেক অভিন্ন চ্যালেঞ্জ আছে তাদের সামনে। আর এগুলো যৌথভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। এ কারণে সশস্ত্র বাহিনী দুটির মধ্যে আরো ভালো সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন। যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়া সশস্ত্র বাহিনী দুটির মধ্যে সামর্থ্যরে সামঞ্জস্য বয়ে আনবে, অভিন্ন হুমকি ব্যবস্থাপনা এবং চ্যালেঞ্জগুলো আরো ভালোভাবে মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে।

তাছাড়া ভারতের অস্ত্র বাজার থেকেও বাংলাদেশ বিপুল ও ব্যপকভাবে উপকৃত হবে। বিশ্বে ভারত বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক, তবে শিগগিরই দেশটি প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশে পরিণত হবে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া ইনিশিয়েটিভের’ কারণে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি এখন ভারতে তাদের অস্ত্র উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পের বিকাশ ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগ গ্রহণ করা। কারণ এর মাধ্যমে দেশের খুব কাছ থেকেই সেরা প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে পারবে। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ও নৈকট্যের কারণে দেশটির প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে এসব প্রযুক্তি ও অস্ত্রের সাথে পরিচিত হওয়া অনেক সহজ হবে। এটা ‘‘কৌশলগত নিজস্বতা ও স্বকীয়তার’’ জন্য ও অস্ত্রের উৎস বৈচিত্র্যময় করতেও সহায়ক হবে। প্রযুক্তি হস্তান্তরে সুযোগ থাকায় এটা অস্ত্র তৈরিতে অগ্রগতি হাসিলেও বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশ নিজেকে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ হিসেবে উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনকারীতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

বর্তমান সরকারের উচিত প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির বিষয়টি ভারতের অংশীদারীত্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই দেখা এবং বিচার করা। এই প্রকল্পে বাংলাদেশ হলো ভারতের প্রধান অংশীদার। এই লক্ষ্য হাসিলে সবার সহযোগিতা প্রয়োজনীয়। চুক্তিটি উভয় দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আরো ঘনিষ্ঠ করবে, শান্তিতে অবদান রাখবে।

(লেখক : ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো। আর নিবন্ধটি ভারতের আউটলুক-এ প্রকাশিত)