Home » অর্থনীতি » কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহ

কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গত বছর রেকর্ড সৃষ্টি করলেও সে অনুপাতে বাড়েনি রেমিট্যান্স প্রবাহ। গত পাচ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ সর্বনিম্নে নেমেছে। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিদেশে বেকার শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি, মজুরি কমে যাওয়াসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ভুয়া এজেন্টদের মাধ্যমে ও অবৈধ পন্থায় টাকা পাঠানো। বাংলাদেশ ব্যাংকও রেমিট্যান্স প্রবাহের নিম্নগতির কারণ হিসেবে এগুলোকে দায়ী করছে। বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স কমায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ধারাবাহিক পতন ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থায় অর্থনৈতিক স্থবিরতা, পাউন্ড, ইউরো, রিঙ্গিত ও সিঙ্গাপুর ডলারসহ অন্যান্য দেশের মুদ্রার মান হ্রাস, ডলারের বিনিময় হার হ্রাস, প্রবাসী আয়ের উৎস দেশগুলোতে আইন-কানুন কঠোর হওয়া এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে মানি ট্রান্সফার কোম্পানির ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেওয়ায় প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর। এছাড়া অবৈধ পথে হুন্ডি আসা বেড়ে যাওয়াও রেমিট্যান্স হ্রাসের কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

২০১৬ সালেই বিদেশে চাকুরিরত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে- আলোচ্য বছরে আগের বছরের (২০১৫) তুলনায় রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমেছে ১৭১ কোটি ডলার বা ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে মোট রেমিটেন্স এসেছে ১৩৬১ কোটি মার্কিন ডলার। অথচ ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিলো ১৫৩২ কোটি ডলার। তবে ২০১৭ সালে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বিদেশে বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে কথা বলা। সম্প্রতি বিদেশে বাংলাদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজের জন্য জামানত ফি কমানো হয়েছে। তথ্যে দেখা গেছে, কেবল ডিসেম্বর মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৯৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। আর তার আগের মাস নভেম্বরে এসেছে ৯৫ কোটি ১৩ লাখ ডলার। শরণার্থী ও অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন রামরুর তথ্য মতে, ২০১৬ সালে মোট সাড়ে ৭ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছে। এই সংখ্যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি। গত বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিলো সাড়ে ৫ লাখ।

চলতি বছরের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিতে দেশে ৯৩ কোটি ৬২ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা; যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে ২০ কোটি ডলার। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ১১৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণ। এছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে জনশক্তি রফতানিতে ভাটা ও হুন্ডি বা অবৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ কম গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারিতে দেশে ৯৩ কোটি ৬২ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এর আগের মাস জানুয়ারিতে পাঠিয়েছিল ১০০ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে ৭ কোটি ৩২ লাখ ডলার। এদিকে, ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। বিশেষায়িত একটি ব্যাংকের মাধ্যমে ৯৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৬৭ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ১ কোটি ৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা  বলছেন, হুন্ডির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমছে। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও অবস্থার কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চলমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকায় প্রবাসী আয় কমেছে। অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচক ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। তবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আয়ে পিছিয়ে পড়ছে দেশ। ফলে কয়েক বছর ধরেই মোট দেশজ উৎপাদন ও আয়ে (জিডিপি) এ সূচকটির অবদানও কমছে। বর্তমানে জিডিপিতে এ সূচকের অবদান ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। অথচ ২০০৮-০৯ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত এর অবদান ৯ শতাংশের বেশি ছিল। শুধু জিডিপিতেই নয়, শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশগুলোর তালিকায়ও অবনমন হয়েছে বাংলাদেশের। ২০১২ সালে শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে ছিল; কিন্তু বর্তমানে একধাপ অবনতি হয়ে অষ্টমে উঠেছে। এজন্য পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে জনশক্তি রফতানিতে ভাটা; অবৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি; মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিভিন্ন মুদ্রার দর পতন; আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা । বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি হিসাবের ভারসাম্য বজায় রাখা; বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে বৈদেশিক লেনেদনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ধাক্কা লাগতে পারে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, জনশক্তি যে হারে বাড়ার কথা, সেভাবে বাড়ছে না। সরকার নানা দেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও এর দৃশ্যমান ফল দেখা যাচ্ছে না। উল্টো বিভিন্ন কারণে কিছু লোক দেশে ফেরত আসছে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় প্রবাসীদের বেতন ও মজুরি কমেছে। প্রবাসীদের জীবনযাত্রার ব্যয় আগের চেয়ে বেড়েছে। তৃতীয়ত, ডলারসহ বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে বাংলাদেশের টাকার মান শক্তিশালী হওয়া। চতুর্থত, অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বাড়ছে। এক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে না। এতে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে চাপ তৈরি হবে। এমনিতেই আমাদের রফতানির চেয়ে আমদানি ব্যয় বেশি।

প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত হওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশীরা অবৈধ উপায়ে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন বলে অভিযোগ মিলছে। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে হুন্ডির তৎপরতা বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, বর্তমানে অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে ২২ শতাংশ রেমিট্যান্স আসছে। বিবিএসের বিভিন্ন সময়ের জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গেল ৩ বছরে হুন্ডি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৩ সালে প্রবাসী আয়ের মাত্র ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হুন্ডির মাধ্যমে আসত। এখন আসছে ২২ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে হুন্ডি হওয়ায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ছোট আকারের রেমিট্যান্সের অধিকাংশই আসছে এ উপায়ে। হুন্ডিকারীরা কৌশলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সাইনবোর্ড টানিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন। এরপর মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের মাধ্যমে তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে সুবিধাভোগীর কাছে। হুন্ডিকারীরাই মূলত কৌশলে এ কাজ করছেন। এজন্য রেমিট্যান্স আহরণে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা যায় কিনা, সে বিষয়টি নিয়ে কাজ কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।